Ma

 5 total views

কী করবে এখন কিসলু? এই দোদুল্যমানতা শিশুকাল হতেই। বয়স আঠারো বছর পার হবার পরও রহস্যের উদ্ঘাটন করতে পারলো না ও। বাবার কথায় বিশ্বাস রেখে মার প্রতি অবিশ্বাস ততোটা দানা বাঁধেনি আজো। বাবার কথা অনুযায়ী সেই দুই বছর বয়সে মা ওদের ছেড়ে চলে গেছে। মা কোথায় গেছে সে সম্পর্কে বাবা যা বলে প্রতিবার তা ও মনে করতে চায় না। বিশ্বাস করবে কিনা তা-ও বুঝতে পারছে না আজো।
বাবার আদর শাসন দুই পাল্লায় রেখে ওজনের চেষ্টা করে কিসলু। শাসনের তথা মারপিটের পাল্লাটা নিচে নামতে থাকলে কিসলু তচনচ করে দেয় কাল্পনিক দাঁড়িপাল্লা।
রোবোটের মতো জীবন যাপন কিসলুর। বাবার নির্দেশনা মোতাবেক কিসলু সবকিছু করে যাচ্ছে। পড়ার সময়, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কোন বইটা পড়বে, কোথায় যাবে, কার সাথে মিশবে ইত্যাদি।
কিসলু কোথাও যেতে চায় একা। কিন্তু ওর বাবা ওকে কোনো সুযোগই দিতে চায় না। বাবা আঠার মতো লেগে থাকে ওর পেছনে; কোনো সময় বাবা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে লোক লাগিয়ে রাখে ওর পেছনে। বালেগ হওয়া সত্ত্বেও ওর কোনো স্বাধীনতা নেই। মার অন্তর্ধানের রহস্য উদ্ঘাটন করতে হলে ওকে স্বাধীন হতে হবে।
কিন্তু কিভাবে স্বাধীন হবে সে? বৃটিশ শাসন থেকে ইন্ডিয়া স্বাধীন হয়েছে
লম্বা অহিংস ও সহিংস আন্দোলনের পর এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে পাকিস্তান থেকে চব্বিশ বছরের সংগ্রাম ও ন’ মাস মুক্তিযুদ্ধের পর। বাবার শাসন থেকে স্বাধীন হবার কী পদ্ধতি ওর জানা নেই। গুগলে অনুসন্ধান করে কিছুই পায় নি ও। কলেজের লাইব্রেরিতে বহু বই পড়েছে; কিন্তু কোথাও কিছু খোঁজে পাচ্ছে না। বন্ধু-বান্ধব না থাকায় কারো সাথে আলোচনাও করতে পারছে না।
বড্ড অসহায় লাগে ওর। বাল্যকালটাই ভালো ছিলো। এসব চিন্তা মাথায় ছিলো না। যত বয়স বাড়ছে ততো মার কথা মনে পড়ছে ওর এবং সেকারণেই ও অন্তর্ধানের রহস্য বের করতে চায়। মার দিকের অর্থাৎ মামা খালা নানা-নানি কেউ ওর আছে কিনা বাবা বলেন না। শুধু কি তাই, দাদা দাদি কাকা বা ফুপুদের কেউ আছে কিনা তাও বলেন না বাবা। এই বিশাল জনসমুদ্রে থেকেও কিসলু একা, ভীষণ একা।
কিসলু ভাবনায় থাকে। ভাবতে ভাবতে হাটতে হাটতে কোথায় কোথায় চলে যায় ও! এখন সে একটি ট্রাফিক শেডে দাঁড়িয়ে আছে। কোনদিকে যাবে বুঝতে পারছে না। মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি ও উস্কুখুস্কু চুল দেখে কেউ একজন পাগলা গারদে ফোন করে দিলো। কিছুক্ষণ পর একটি ভ্যান ওর পাশে এসে দাঁড়ালো। কিসলু ভ্যানটাকে আড়চোখে একবার দেখে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো। চোখের পলক ফেলার আগেই ভ্যান থেকে ইউনিফর্ম পরা চারজন লোক নেমে কিসলুকে ঝাপটে ধরে ভ্যানে তুলে ছেড়ে দিলো গাড়ি।
হতভম্ব ভাব কাটিয়ে পাশে ইউনিফর্ম পরা একজনকে জিজ্ঞেস করলো কিসলু, আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
পাগলা গারদে।
পাগলা গারদে কেনো?
তুমি পাগল তাই।
আমি পাগল, কে বললো আপনাদের?
একজন ফোন দিয়া জানাইছে।
কিসলু চমকে বললো, কী বলছেন আপনি! কে ফোন করলো?
নাম তো বলে নাই!
কিসলু আর কিছু জিজ্ঞেস না করে মাথা নিচু করে বসে রইলো। পাগলা গারদের একটা পাঁচ হাত বাই তিন হাত প্রকোষ্ঠে ঠাঁই হলো কিসলুর। কুকুরকুণ্ডলী হয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়।
আধাঘন্টা পর পাগলা গারদে এসে নাদির আলী ছেলের উপর চড়াও হলেন খুব। কেনো এই ঘটনা ওঁকে জানানো হলো না ফোনে? ওর পরিচিত একজন ফোন করে না জানালে ওকে কোথায় খুঁজে পেতো?
বাসায় এনে দরজায় তালা মেরে বললেন, আপাতত তোমার বাসার বাইরে যাওয়া বন্ধ! প্রয়োজন হলে আমিই তোমাকে বাইরে নিয়ে যাবো। ঘরে প্রচুর খাবার আছে; আরো বা ভিন্ন খাবার প্রয়োজন হলে ফুডপাণ্ডায় কল করে আনিয়ে নিয়ো।
কিসলু বাবাকে একবার দেখে নিচু করে নিলো মাথা। বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘরের জিনিসপত্র দেখায় মন দিলো ও।
ফৃজ থেকে এটাওটা খায় আর খুঁজতে থাকে কী যেনো কিসলু। ঘরের প্রতিটি কোণা, খাটের নিচ খোঁজাখুঁজি শেষ করে খালি হাতে এসে বসলো ব্যালকনিতে। সামনের এক চিলতে মাঠে একটা মোটা বেড়াল এক নেড়ি কুকুরকে দৌড়াতে দেখেও কিসলুর হাসি এলো না। সে ঘরে ঢুকে এদিকওদিক তাকাতে থাকলো। প্রতিটি ওয়াশরুমের উপরে একটি করে স্টোররুম আছে। স্টিলের সিঁড়ি টেনে এনে একটা স্টোরে ঢুকলো ছোট টর্চ লাইট নিয়ে। তৃতীয় স্টোরটা ঘাটাঘাটি করে একটা ছবি পেলো। ছবিটায় তিনজন-বাবা-মা আর ও। ছবিটার উপর টপটপ করে পড়তে থাকলো অশ্রু। ছবিটা নিয়ে নেমে এলো নিচে। একটা কাঁচি নিয়ে বাবার ছবিটা আলাদা করে ছিড়ে কুটিকুটি করে পুড়িয়ে ফেললো মেঝেতে। ছাই জড়ো করে কমোডে ফেলে করে দিলো ফ্লাস।
মা-সংশ্লিষ্ট কিছু পাবার উৎসাহ আরো বেড়ে গেলো কিসলুর। একটা স্টোররুমে একটা শাবল দেখেছিলো ও। ওটা নামিয়ে এনে স্টিলের আলমিরার ভেঙ্গে ফেললো তালা। আলমিরা তন্নতন্ন করে কিছুই পেলো না। একটা সিন্দুক আছে আলমিরার ভেতরে। ওটার তালাও ভেঙ্গে ফেললো কিসলু। সিন্দুক ভর্তি টাকা। দুই হাজার টাকার বান্ডল সবগুলো। একটা একটা করে টাকার বান্ডল নিচে নামালো কিসলু। টাকার বান্ডলগুলোর নিচে একটা কালো বর্ণের নথি পেলো। নথিটা সিন্দুক থেকে বের করে ভাঁজ খুললো ধীরে ধীরে। ভেতরে পেলো একটিমাত্র লেমিনেটেড দলিল। দলিলটা তুলে পড়ে ওর হাত কাঁপতে লাগলো। দুই চোখ ভরে গেলো অশ্রুতে। টপটপ করে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু পড়তে লাগলো দলিলের উপর। এটা একটা নিকাহনামার রেজিস্ট্রিকৃত কপি। এতে ওর মা, নানা-নানির নাম ও ঠিকানা আছে।
কিসলু একবার গলা ছেড়ে ‘মা’ বলে চিৎকার করে নিকাহনামাটা চেপে ধরলো বুকে।
ডখন ভেতরে ঢুকলেন আজিজ আহমেদ।
কিসলু নিকাহনামাটা দেখিয়ে বললো, ড্যাডি, আমার মার নাম ও ঠিকানা পেয়ে গেছি।….

1 thought on “Ma”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *