MAHITOSH GAYEN

 173 total views

ধারাবাহিক গল্প-
“ভোরের স্বপ্নে গান্ধীজি”
মহীতোষ গায়েন
(আজ পর্ব-২)
পূর্বপাঠ:
এখন এই হচ্ছে রাজনীতি ও সংগঠনের সিস্টেম,যে যত নিষ্ঠা সহকারে মন প্রাণ দিয়ে সংগঠন ও দল করবে তারই হবে বেহাল দশা, আর যত ধান্দাবাজ,ফেরেববাজ তৈল মর্দনকারী,মিথ‍্যাচারীরা তরতর করে উপরে উঠে যাবে,ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি পাবে তারাই,তবে হাল ছাড়িস না,একদিন দেখবি তোরই,তোদেরই জয় হবে,স্বপ্ন সফল হবে,দুরের অশ্বত্থ গাছের ডালে কয়েকটি কাকের চিৎকারে স্বপ্নভঙ্গ হয়,আর অয়ন্তিকার ডাকে ঘুম ভেঙে উঠে সে শুনতে পায় রেডিওতে বাজা গান”চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়।”
#পর্ব-২
চিরদিন কারো সমান যায়না,কথাটি ধ্রুব সত‍্য।একটি সময়ে মধুমঙ্গলের হওয়ার কথা ছিল জুতোর দোকানদার,আজ সে কলেজের অধ‍্যাপক,মাধ‍্যমিক পরীক্ষায় অঙ্কে ১৩ পেয়েছিল বলে প্রধান শিক্ষক তাকে আর ছাত্রাবাসে রাখেনি,বাবার হাত ধরে চলে এসেছিল বাড়িতে,তার ঠাঁই হয় আশ্রমে,আশ্রমের গুরুদেব তার মা,বাবারও গুরুদেব,সেই গুরুদেব একাধারে ব্রক্ষ্মচারী,স্থানীয় স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক,তার কাছ থেকেই সে বীজগণিত এর মিডিলটার্ম ফ‍্যাক্ট ও গ্রাফ শিখেছিল মন্ত্রের মত।যার ফলে মাধ‍্যমিকে অঙ্কে ৫০%নম্বর সে তোলে।মোট ৫৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে কলেজে সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হয়। বাবার আর্থিক দৈন‍্যদশা থাকার জন‍্য টিউশন নিতে পারে নি,যথারীতি রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে সে সফল হয়নি। সফলতার প্রস্তুতি নিতে একা একাই গাঙপারের এক দোচালা খড়ের ঘর ভাড়া নিয়ে নিজেই রান্না করে খেয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকে,একদিন সন্ধ‍্যের পর থেকেই বৃষ্টি,চরাচর আলো করে বিকট শব্দে বাজ পড়ছে।ভাত রান্না করে,কড়াইয়ে আলু সোয়াবিনের তরকারি বসিয়ে ফুটে ওঠার জন‍্য অপেক্ষায় থাকে। ব‍্যর্থতার
গ্লানি,মনে গঞ্জনার তীব্র বিষাদ,উচ্চমাধ্যমিকে অসফল
হওয়ার পর যখন বাড়িতে বসা,একদিন বেড়ার ফাঁক দিয়ে আড়ি পেতে সে শোনে,জামাইবাবু বলছেন,শশবিন্দু, ওর তো কিছু হলো না আমার ভাই ও তোর ভাই-এর জন‍্য একটি জুতোর দোকান করে দে নদীর পাড়ে,ভালো আয় হবে।শোনার পর তীব্র যন্ত্রণা মোচড়াতে থাকে তার শরীর। এই সব ছবি তার শরীরের পটে নিয়ত জমা হতে থাকে। এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে তরকারি স্টোভে চাপিয়ে সে ভারাক্রান্ত মনে ঘুমের দেশে চলে যায়।যখন ঘুম ভাঙে
রাতের তৃতীয় প্রহর শেষ।কড়াইয়ে তরকারি তখন পুড়ে কাঠকয়লা।সেদিনও তার ভোরের স্বপ্নে গান্ধীজি এসেছিলেন,তার অহিংস সত‍্যাগ্রহ ,আইন অমান্য,ভারত ছাড়ো আন্দোলন মধুমঙ্গলের জীবন সংগ্রামের প্রেরণা।
এবার যথারীতি ফর্মফিলাপ করতে গিয়ে নিরুদ্দেশ হয় সে, আবার ফর্ম ফিলাপ না করে কলেজের এক সিনিয়র দাদা কাম বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে ওঠে সে।রাত যায়,দিন আসে,দিন আসে,দিন যায়,এদিকে মা তার ছেলের জ‍ন‍্য,৩ দিন ধরে খাওয়া ঘুম ছেড়ে শোকে পাথর।
বাবা, থানায় রিপোর্ট করে,কাগজে ও রেডিওতে পুত্রের নিরুদ্দেশের খবর ছাপতে মরিয়া।বড়দা মধুর
ক্লাসমেটকে সঙ্গে নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে ।খুঁজতে খুঁজতে গাঙ পেরিয়ে বাদাবন পেরিয়ে তার কলেজের ইউএলএসও লীডার-এর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে দেখতে পায় আদরের ছোট ভাই খোলা দাওয়ায় চাঁদের আলোয় স্নান সেরে আড় মাছের ঝাল দিয়ে পরম তৃপ্তিতে খেয়ে চলেছে…,দাদা আর বন্ধুকে দেখে সে ভূত দেখার মত চমকে ওঠে। রাত গভীর হয়,মায়াবী জোৎস্নায় নির্মল বাতাসের প্রেম আচ্ছন্ন করে সবার নিদ্রিত তনুমনপ্রাণ।রাতের চতুর্থ প্রহরে ঘরের চালে পেঁচা ডেকে ওঠে,দূর থেকে ভেসে আসছে বাদা সম্রাটের চাপা গর্জন,ভোরের স্বপ্নে তখন ইতিহাসের তর্পণ, রেডিওতে বেজে চলেছে-” চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে,উছলে পড়ে আলো,ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধসুধা ঢালো…”
———-(ক্রমশঃ)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *