Mayuri Mitra

 39 total views

নাম পাখির ঘুড়ি মন উড়ি – ড . ময়ূরী মিত্র

আমার যৌবনের প্রারম্ভ
 কলকাতার আকাশে  তখন পাখি উড়ত
 ঘুড়ি ভোকাট্টা হত
আজো কি তাই
ও ভাই ?
এ লেখাটির নাম দিলাম —
                     পাখির  ঘুড়ি
                      মন উড়ি
প্রেম করে ঘর পাতব  এমনটা কোনোদিনই ভাবি নি  আমি | ফলে সে ভীষণ যৌবনবেলায় প্রেমিকের গলা জড়িয়ে আকাশে  বেড়ানোচেড়ানোটাই  মুখ্য হয়ে উঠেছিল আমার |  ভাবতাম —-
যদি বা বাঁধি বাসা
 আকাশেতেই ভালোবাসা  |
সে হবে এক  আকাশবাসা |
তো এই আকাশ আর প্রেমকে  ডালভাতের মতো  মাখতে গিয়ে প্রেমের দুরকম ধরণ ধরে  নিয়েছিলাম  | ঘুড়িপ্রেম আর পাখিপ্রেম | ঘুড়িপ্রেম হলো গিয়ে একটুখানি  —-আকাশে একবার চক্কর  কেটেই  ভোকাট্টা | মানে  দুদশ দিন কেলেঙ্কারি  টাইপ প্রেম  হলো ! ব্যাস ! ,তারপরেই প্রেমিক প্রেমিকা যুগলে লাট খাবে যে যার বাড়িতে   ! প্রেম খতম শেষবেলার ভাতের হাঁড়ির মতো | বুঝতে যে কেন এত দেরি হয় আপনাদের ?
 আরেক হোল পাখিপ্রেম —পাখির মতো অনাদিকাল   আকাশকেই ঘর ভেবে চলা | কোথাও বাঁধা পড়বো না বটে তবে এই বাঁধা না পড়াটা কিন্তু  একজনের সাথেই রয়ে যাবে |  সারাটাজীবন |
 দুনম্বরটা চট করে আসে না | আসেই না | আমারো আসেনি | কিন্তু ঘুড়িপ্রেমিক জুটেছিল বিস্তর | এই বিস্তর জুটে যাওয়াতে একধরনের গরিমা হতো ময়ূরাবতীর |  জোটাতে বড় ব্যস্ত তখন  | একটি রেগুলার আসতো বেথুন কলেজের সামনে |  শয়তানটা   আসার সময় কোনোদিন নির্দিষ্ট করত না | বেশ বুঝতাম — এই অনির্দিষ্ট থাকাটা তার পূর্ব থেকে নির্দিষ্ট  করে রাখা, যাতে দিনের কোনো পিরিয়ডেই মন বসাতে না পারি |
ঘুড়িপ্রেমিকের একটা  জিনিস আমাকে  টানতো খুব  | ক্লাস ফোর ফাইভের  বাক্যরচনার স্টাইলে সাজানো প্রেমবাক্য বা গুলবাক্য | চেষ্টা করেও একটি অসঙ্গত শব্দ পাবেন না সেবাক্যে | ক্রিয়াপদের ব্যবহারও প্রতি বাক্যে একই পরিমানে এবং  চাক্কু  দিয়ে মাখনের স্লাইস কাটার মত  নির্ভুল |  একদিন যদি  বলে —আমি তোমাকে নদীর মতো ভালোবাসি তো  পরের দিন অবশ্যই বলতো দীঘি কি সাগরের মত  | বলবেই |  কলেজের আরো অন্তত চার পাঁচটা মেয়েকে একই কথা বলে যেত  সে দিনের বিভিন্ন সময়ে |
পারস্পরিক ভাবে জানাজানি হবার পর বাকি মেয়েগুলো যখন একে অপরকে গরম চোখে দেখত  আমি তখন বিল্লিছানার  ঘুড়ির সাথে ঘুরতাম  | ভরদুপুরে —-   উত্তরের পুরনো সব গলিতে | খুব বেছে বেছে লাল তরমুজ  কিনত আমার ঘুড়িপ্রেমিক আর সেই মিষ্টি লালজল খেতে খেতে শোনাতো   শহরের পুরোনো বাড়িগুলোর বর বৌয়ের গল্প | প্রতিটি গল্প এক |  বরগুলো খ্যাপা ষাঁড়ের মতো ভালোবাসে গোলগাল ফর্সা বৌগুলোকে ! আর পরপুরুষের চোখ বাঁচাতে বিকেল না পড়তেই বউগুলোকে  মুড়ে ফেলে একরাশ পর্দায় |  গল্পশুনে সোয়ামী সোহাগী বউগুলোর নাম দিয়েছিলাম —-বউপ্রিয়া | বরগুলোকে বলতাম — ভীতু ভাতার | অন্যের পয়সায় তরমুজ শুষতে শুষতে অশ্লীল হতাম মনের সুখে |
ঘুড়িপ্রেমিকের গুলগল্পে  আর আমার মিথ্যে বিমুগধতায় পার হয়ে যেত  বিকেল | ততক্ষণে ফাঁকা তরমুজ ড্রেনে ছুঁড়ে ঘুড়িপ্রেমিক চলত পাড়ার মোড়ের মেয়ে দেখার ডিউটিতে  |  আর আমি একগাল হেসে ঘুড়ির পকেটের  চিরুনি টেনে  আমার পাতলা চুল মাথার সাথে সেটিং করতাম | তারপর সোজা বাড়ি ফেরার বাস | মজার কথা —-আমার কাছে কিচ্ছু লুকতো না সে | ঘুড়িকে বড় সৎ লাগত আমার | মিটিংয়ের পর মনে আনন্দ থাকত অনেকক্ষণ | কেন ? তা কি জানি !
 অনেকদিন এলো না ঘুড়ি  | শুনলাম — তার মা মারা গ্যাছে | সেই প্রথম ছুটতে ছুটতে  গেলাম তার বাড়ি | ঠিকানা নিয়ে ,  অনেক খুঁজে | সেই প্রথম  সেই শেষ | ঘরে ঢুকে দেখি —বগি থালায় জম্পেশ করে  ঘি দিয়ে ভাত মেখে খেতে বসেছে ঘুড়িপ্রেমিক |  পাঁচরকম ভাজাও সাজিয়েছে | মাইরি ! আমায় দেখে ঠোঁট কাঁপালে —শরীরে মাছি বসলে যেমন চামড়াটা কেবল নড়ে |  তারপর গর্বে বললে —আমাদের উত্তর কলকাতার বনেদি বংশে এই মেনু হবিশ্যির  | অবাক হয়ে দেখেই যাচ্ছি | পলক ফেলছি না —–ঘুড়ির মুখে শোক |  চোখে  সুগন্ধী অন্ন গেলনের  তৃপ্তি | ধুস ! কে যায়  আর সেই  মিথ্যাচারীর  কাছে ?
আর দেখুন ভাই —-মযুরাবতীর তখন হেব্বি  ঠাট !  আর কি ছোঁয়  সে মরাকাঠ |
ফোট শালা !
পারিস তো  সুতো কাট |
বিনে মানজায় উড়ে দেখা |

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *