Md. Akabbor Ali PK

 12 total views

টিকটিকির প্রেম : সঙ্গমের সময় পুরুষ টিকটিকি আলতো কামড় কিংবা মুখ দিয়ে স্ত্রীর দেহে আদর করতে মোটেও ভুল করে না।

#প্রভাষক_একাব্বর_রসায়নবিজ্ঞান।

✓ টিকটিকি নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা :
যে কোন প্রাণীর মল-মূত্রই শরীরের বর্জ্য পদার্থ এবং তাই তা বিষাক্ত। একই ভাবে টিকটিকির মল বিষাক্ত হওয়ার কারনে,খাবারের সাথে পেটে গেলে আপনার পেটে অসুখ,পেট খারাপ,পাতলা পায়খানা, পেটে ব্যথা,বমি ইত্যাদি হতে পারে। তবে এর ফলে মারা যাওয়ার সম্ভবনা নেই।

টিকটিকি ক্ষতিকর প্রাণী না হলেও ছোট বড় বিভিন্ন বয়সের অনেকেই টিকটিকি ভয় পান। টিকটিকিভীতি মূলত সরীসৃপভীতির একটি অংশ যাকে বলা হয় Herpetophobia। এক্ষেত্রে জটিলতা হালকা থেকে তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আতঙ্ক প্যানিক এটাকের কারণ হতে পারে। একারণে
অনেকেই ভুল করে বলে থাকে টিকটিকির মল-মূত্র
খাবারের সাথে খেয়ে কেউ মারা গেছেন। ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।

আবার অনেকে বলে থাকেন টিকটিকির লেজ পুড়িয়ে
নেশা করে,এ কথার‌ও বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। তবে অন্য নেশার মতো এটাও একটা আসক্তি হতে পারে।

✓ টিকটিকির ইতিকথা :
টিকটিকি বা ইংরেজিতে Common House Gecko দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় প্রাপ্ত এক ধরণের সরীসৃপ। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে জাহাজে করে বেশ কিছু টিকটিকি যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে আজ বিস্তৃত হয়েছে।

টিকটিকির বৈজ্ঞানিক নাম- Hemidactylus frenatus (Schlegel, 1836) ‘টিক টিক টিক’
করে ডাকে বলে বাংলায় এদের নামকরণ হয়েছে ‘টিকটিকি’। আনুমানিক ৫০ মিলিয়ন বছর আগে আপার ইওসিন (Upper Eocene) কালে ভারতবর্ষে টিকটিকির আবির্ভাব ঘটে।

✓ টিকটিকি নিয়ে যত কথা :
টিকটিকিরা মূলত নিশাচর। দিনের বেলায় লুকিয়ে থাকে আর রাতের বেলায় খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। টিকটিকি আমাদের বসতবাড়িতে এবং ব্যবহৃত লাইটের আলোয় জমা হওয়া পোকামাকড় ( মশা, মাকড়শা,ছোটখাটো পোকা ইত্যাদি) শিকার করে খায় বলে এদেরকে ইংরেজিতে হাউজ গেকো নামে ডাকা হয়।

টিকটিকির গায়ের রং ধূসর, অতি হালকা গোলাপী অথবা বাদামী। এদের গায়ে ডোরাকাটা দাগ থাকে। এদের কপাল অবতল এবং কানের খোলা অংশ ছোটো ও গোলাকার। এদের দেহের দৈর্ঘ্য ৩-৬ ইঞ্চি। টিকটিকিরা পাঁচ বছরের মত বেঁচে থাকে।

স্কোয়ামাটা বা আইশযুক্ত সরীসৃপদের অন্তর্ভূক্ত হলেও এদের ত্বকে বাস্তবিকপক্ষে আইশ নেই। তবে বড় বড় আইশের মত যে প্যাপিলোজ তল দেখা যায় সেগুলো মূলত চুলের মত স্ফীতি দ্বারা গঠিত। এরকম গঠন টিকটিকির ত্বককে অতিমাত্রায় হাইড্রোফোবিক ও শুষ্ক (প্রায় সব লিজার্ডের ত্বকই শুষ্ক) করে তুলেছে। তাছাড়া এরকম গঠনের ফলে টিকটিকির ত্বক অধিমাত্রায় এন্টিমাইক্রোবায়াল হয়ে উঠেছে।

টিকটিকি পলিফায়োডন্ট (Polyphyodont) প্রাণী অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় পর পর এদের নতুন দাঁত প্রতিস্থাপিত হয়। টিকটিকির ১০০ টির মত দাঁত রয়েছে যা ৩-৪ মাস পর পর প্রতিস্থাপিত হয়ে থাকে।

টিকটিকির চোখে কোনো নেত্রপল্লব বা পাতা নেই। এজন্য এরা এদের চোখ পরিষ্কার করার জন্য জিহ্বা দিয়ে চোখের কর্নিয়া চেটে থাকে।

মজার ব্যপার হচ্ছে টিকটিকির রাত্রিকালীন কালার ভিশন মানুষের চেয়ে ৩৫০ গুন বেশী সংবেদনশীল। এর কারণ হচ্ছে নিশাচর এই টিকটিকিরা বিবর্তনীয় গতিপথে দিবাচর গেকো প্রজাতি হতে উদ্ভূত হয়েছে।

নির্দিষ্ট সময় পরপর অনুকূল আর্দ্রতায় টিকটিকিরা দেহের চামরা বদলে ফেলে। যখন চামরা ওঠা শুরু হয় তখন টিকটিকি এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য এদের উঠে যাওয়া চামরা টেনে তুলে খেতে থাকে ! তরুণ টিকটিকির ক’দিন পরপরই চামরা বদল ঘটে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ঘটে থাকে।

এদের পায়ের আঙুলের পাতা সূক্ষ্ম খাঁজকাটা , বিরাট ক্ষেত্রফলযুক্ত ও তরলহীন হওয়ায় এরা খুব সহজেই ঘরের দেয়ালে বা ছাদে চলাচল করতে পারে। এরা যখন পা ফেলে তখন পায়ের নিচ বায়ুশূন্য হয়ে যায়, ফলে পা খুব সহজে দেয়ালে আটকে যায় এবং এরা অনায়াসে এই আটকে থাকার উপর দেহের ভর দিয়ে চলাফেরা করতে পারে।

টিকটিকি শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী। শীতকালে মূলত এদের কম দেখা যায় এজন্যই। তবে এদের বিভিন্ন শারীরিক কর্মকান্ড পরিবেশের তাপমাত্রার উপর নির্ভরশীল।

টিকটিকিরা অভিপ্যারি অর্থাৎ এরা ডিম পাড়ে।ডিমগুলো ছোট, অনেকটা গোলাকৃতির ও সাদা। আমাদের ট্রোপিক্যাল অঞ্চলে টিকটিকিরা মূলত সারাবছরই সঙ্গম করতে পারে। সঙ্গমের সময় পুরুষ টিকটিকি আলতো কামড় কিংবা মুখ দিয়ে স্ত্রীর দেহে আদর করতে মোটেও ভুল করে না। সঙ্গম শেষে স্ত্রী টিকটিকি সাধারণত ২ টি গোলাকৃতির সাদা ডিম পেড়ে থাকে। যদিও সরীসৃপদের ডিম লম্বাটে কিন্তু টিকটিকির ডিম গোল, তুলনামূলকভাবে শক্ত খোলস নির্মিত। আর ডিমের এই গোলাকৃতির ও শক্ত খোলসের গঠন ডিমকে বেশী আর্দ্রতা নিরোধক করে তুলেছে যা এদের বংশধরদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। শিকারির হাত থেকে ডিমদের রক্ষা করতে স্ত্রী টিকটিকি ডিম দুইটি গর্ত, চেরা বা ফাক ফোকরে পেড়ে থাকে। প্রায় ৪৬-৬২ দিন পরে ডিম ফুটে ৪৬-৬০ মিলিমিটার আকারের বাচ্চা ফুটে বের হয়। ৬ মাস থেকে এক বছরেই এরা প্রজননক্ষম হয়ে ওঠে।

✓ টিকটিকি নিয়ে কিছু কুসংস্কার ও ভুল ধারনা:

১। অধিকাংশ মানুষই মনে করেন টিকটিকি বিষাক্ত এবং এরা মানুষকে কামড়ায়। এই ধারণাটি সম্পুর্ন ভুল। টিকটিকি বিষহীন একটি প্রাণী এবং এরা মানুষ কামড়ায়না। তবে টিকটিকিকে বেশী বিরক্ত করলে কামড়ানোর চেষ্টা করতে পারে এবং এই কামড়ের জোর এতটাই অল্প যে মোটেই কাটাছেড়া ঘটে না।

২। আমাদের দেশে টিকটিকি নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হচ্ছে টিকটিকির রক্তের রং সাদা।
এই ধারণাটিও সম্পুর্ন ভুল ও অবৈজ্ঞানিক। প্রায় সকল মেরুদণ্ডীদের রক্তের রং-ই লাল। তবে কিছু ব্যতিক্রমও আছে। যেমন Prasinohaema নামক সরীসৃপ। এদের রক্তে অতিরিক্ত বিলিভার্ডিন বা বাইল পিগমেন্ট গঠন হওয়ায় এদের রক্তের রং সবুজ। কিন্তু টিকটিকির রক্তের রং লালই।
টিকটিকির রক্তের রং সাদা এই ভুল ধারণাটি আমাদের দেশে প্রবল। স্বাভাবিকভাবে যদি বলা হয় যে টিকটিকির রক্ত লাল তবে কেউই সহজভাবে মেনে নিতে চায় না।
টিকটিকি ধরে, মাথায় আর হার্ট এ পিন ফুটিয়ে দেখতে পারেন যে টিকটিকির রক্ত লাল। ব্যাপারটি বেশ নিষ্ঠুর । কোনো প্রাণীকেই ক্ষতিগ্রস্থ করা ঠিক না।

৩। আমাদের দেশে এখনো অনেক মানুষের ধারণা, মানুষের কোনো কথা শুনে টিকটিকি ডাকার অর্থ হচ্ছে এই কথাটি সত্য অর্থাৎ টিকটিকির ডাক সত্য/ মিথ্যার যাচাইকারী। এটি কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই না।
এই কুসংস্কার টি ছড়ানোর কারণ হচ্ছে টিকটিকির ‘টিক টিক টিক” ডাক যা শুনতে অনেকটা ‘ঠিক ঠিক ঠিক’ এর মতো লাগে। আসলে মানুষের কথা শুনে টিকটিকি ডাকে না, টিকটিকিরা মূলত নিজেদের সাথে যোগাযোগ এবং বিপদে ডেকে থাকে।

আরেকটি কথা হচ্ছে এরা মূলত ৫০০-৪০০০ হার্জ কম্পাংকের শব্দ শুনতে পায়। আর সর্বোচ্চ ৭০০ হার্জ (তীব্রতা লেভেলে ২৪ ডেসিবেল) কম্পাংকে এরা সবচেয়ে ভালো শুনে। কিন্তু আমাদের স্বাভাবিক কথাবার্তার তীব্রতা লেভেল ৬০ ডেসিবেল। স্বাভাবিক মহিলাদের সর্বনিম্ন কথাবার্তা ৮৫ এবং স্বাভাবিক পুরুষের সর্বোচ্চ কথাবার্তা হয় ২৫৫ হার্জ এ। এর দ্বারা এটাই বোঝা যায় যে, টিকটিকি আমাদের কথাবার্তা শুনতেই পায় না।
সত্য মিথ্যার যাচাই করা তো দূরের কথা !

৪। বিপদে টিকটিকি রা লেজ ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। যা পরবর্তিতে আবার নতুনভাবে গজায়। ব্যাপারটাকে অটোটমি বলে। অনেক মানুষের ধারণা এমন কি কিছু বইয়েও লেখা থাকে যে “লেজ ফেলে দিলে টিকটিকির কিছুই হয় না” ধারণাটিও সম্পুর্ন সত্যি নয়। কারণ হচ্ছে, ফেলে যাবার কিছুদিন পর আবার নতুন লেজ গজালেও কোনো টিকটিকিই চায় না তার লেজ খসে পড়ুক। কারণ লেজ টিকটিকির চলনে ভারসাম্য রক্ষা করে। অন্যদিকে এরা লেজে ফ্যাট ও মিনারেল সঞ্চয় করে রাখে আর পুনরায় লেজ গজানো অনেক শক্তির অপচয় ঘটায়। তাছাড়া নতুন গজানো লেজ হুবহু আগের মত না হয়ে বরঞ্চ খাটো ও ভোঁতা হয়। তাই প্রাণত্যাগ ও লেজ বিসর্জন এই দুইয়ের মাঝখানে পড়লে বাধ্য হয়ে অনিচ্ছা স্বত্বেও বেচারা টিকটিকি লেজটাই বিসর্জন দিয়ে দেয়। প্রশ্ন জাগতে পারে যে, লেজই কেনো খসে পড়ে! কারণ হচ্ছে শিকারি প্রাণী কর্তৃক প্রথমে লেজই দৃষ্টিগোচর হওয়ায় এরা আগে লেজের দিক হতে আক্রমণ করে বসে আর তাই লেজে সামান্য স্পর্শ লাগতেই এরা লেজ ফেলে পালায় আর এই লেজ লাফাতে থাকে বলে শিকারির মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে ও এই সুযোগে পালিয়ে যায় টিকটিকি।

✓ টিকটিকি নিয়ে কয়টি মজার তথ্যঃ

১। বাংলা ভাষায় এদের টিকটিকি নাম হলেও উর্দু ও হিন্দিতে চিপকল/ চিপকালী, নেপালি ভাষায় ভিতটি, ওড়িয়া ভাষায় ঝিতিপিতি, মারাঠি ভাষায় পাল, তামিল ভাষায় পাল্লি , তেলেগু ভাষায় বালি, কান্নাদা ভাষায় হাল্লি এবং শ্রীলংকান ভাষায় হুনা নামে ডাকা হয়।

২। অনেক স্থানে মানুষ টিকটিকি পুষে থাকেন।

৩। টিকটিকি অনেক প্রজাতির পোষা সাপের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৪। পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে টিকটিকি মানুষের খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *