Md. Akabbor Ali PK

 42 total views

ডেঙ্গুজ্বর : এডিস মশা কখন কামড়ায়,সতর্ক হ‌উন ।

✓ডেঙ্গুজ্বরে রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা খুব বেশি পরিমাণ কমে গেলে রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যু ঝুঁকি থাকে।

✓যেসব খাবার খেলে প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে পারে জেনে রাখুন।

এডিস মশা কখন কামড়ায়,সতর্ক থাকবেন যেভাবে
ডেঙ্গুরোগের বাহক এডিস মশা। এ মশা কখন কামড়ায় এ নিয়ে অনেকেরই নানা মত আছে।

তবে এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলাতেই কামড়ে থাকে। তাই বলে এমন না যে, রাতে কামড়ায় না!
এ মশা কখন সক্রিয় থাকে তা নিয়ে প্রাণিবিজ্ঞানী ও কীটতত্ত্ববিদদের মধ্যে সামান্য মত-পার্থক্য আছে।

সবচেয়ে প্রচলিত তথ্য হচ্ছে, দিনের বেলায় এডিস মশা কামড়ায়। ভোর বা সূর্য ওঠার ৩-৪ ঘণ্টা পর এবং বিকাল থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত এ মশা সক্রিয় থাকে।

প্রাণিবিজ্ঞানদেন সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুসারে,
শুধু দিনের বেলাতেই নয়; এডিস মশা সক্রিয় থাকে উজ্জ্বল আলোতে। তাই ঘর আলোকিত থাকলে রাতেও কামড়াতে পারে এডিস মশা।

এডিস মশা ভরদুপুরের চেয়ে আলো-আঁধারি পছন্দ করে বেশি। আর তাই ভোর বা সূর্যোদয়ের সময় এবং গোধূলি বা সূর্যাস্তের সময়টা এসব মশার ক্ষেত্রে কামড়ানোর জন্য পছন্দসই সময়। তবে রাতের বেলায়ও কৃত্রিম আলো-আঁধারিতে এডিস মশা কামড়াতে পারে।

এডিস মশা স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে। এ ছাড়াও মশক নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ সময় ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধ করতে হলে এডিস মশার বিস্তার রোধ করতে হবে। এছাড়া এই মশা যেন কামড়াতে না পারে সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।

✓ এডিস মশা চেনার উপায়।

এই মশা অন্য মশাদের চেয়ে কালো ধরনের হয়ে থাকে। এর পায়ে এবং পাশে সাদা ডোরাকাটা থাকে। এডিস মশার মাথার পেছনে ওপরের দিকে কাস্তে ধরনের সাদা দাগ থাকে। বাকি মশাদের মাঝ বরাবর সাদা দাগ থাকে। এই দুটো দেখেই চিহ্নিত করা যায় এডিস মশাকে।

✓ যেভাবে সতর্ক থাকবেন।

• দিনের বেলা পায়ে মোজা ব্যবহার করতে পারেন।
• ফুল হাতার জামা পরুন।
• শিশুদের হাফপ্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা পরাতে হবে।
• দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে।
• মশা যেন না কামড়াতে পারে এজন্য মশাবিরোধী বিভিন্ন ক্রিম বা তেল শররের খোলা স্থানে ব্যবহার করুন।
• দরজা-জানালায় নেট লাগাতে হবে।
• মশা তাড়াতে স্প্রে, লোশন, ক্রিম, কয়েল, ম্যাট ব্যবহার করতে পারেন।
• ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, বাড়িঘরের আশপাশে যে কোনে পাত্রে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করুন।
• ঘরের বাথরুমে কোথাও পানি জমাবেন না।
• বাড়ির ছাদে বাগানের টবে বা পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে। প্রয়োজনে প্রতিদিন পানি বদলে ফেলুন।
• বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার রাখুন।

✓ ডেঙ্গুজ্বরে রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা খুব বেশি পরিমাণ কমে গেলে রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যু ঝুঁকি থাকে।
✓যেসব খাবার খেলে প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে পারে জেনে রাখুন।

সাধারণত মানুষের দেহে প্লাটিলেটের সংখ্যা দেড় লক্ষ থেকে সাড়ে চার লক্ষ থাকে।
ডেঙ্গু জ্বর বা অন্য যে কোনো কারনে প্লাটিলেটের সংখ্যা কমতে কমতে 20 হাজারের নিচে চলে আসলে দেহের ভেতরে ও মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ হতে পারে।এমনকি মৃত্যু ঝুঁকি থাকে।এই কারণে প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কিছু খাবার নিয়মিত খাওয়া উচিত।
ডেঙ্গু একটি হেমোরেজিক ফিভার যা এডিস স্ত্রী মশার কামড়ে হয়।এই রোগের কোনো ঔষধ নেই বললেই চলে।তবে কয়েকটি দেশে টিকা অনুমোদিত হলেও যারা একবার সংক্রমিত হয়েছে শুধুমাত্র তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ‍্য।
সাধারনত মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গরম ও বর্ষায় এর প্রকোপ থাকে বেশি।শীতকালে এই জ্বর হয় না বললেই চলে। তবে এ বছর অনেক আগেই ডেঙ্গুর প্রার্দুভাব দেখা দিয়েছিল।
এই রোগে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীর রক্তে প্লাটিলেট কমে যায়।প্রায় 90% রোগীর প্লাটিলেট কমে যায়।অন্য কারণেও প্লাটিলেট এর সংখ্যা কমতে পারে।যেমন- অ্যানিমিয়া,ভাইরাস সংক্রমণ,লিউকোমিয়া,মদ্যপান, কেমোথেরাপি,ভিটামিন- বি 12 (মিকোবালামিন) এর অভাব কিংবা অন্য জটিল রোগের কারণেও প্লাটিলেটের পরিমাণ কমতে পারে।
তবে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার মূল কারণ দুটি “হয়তো প্লাটিলেট ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে নয়তো পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হচ্ছে না।” ডাক্তারি ভাষায় প্লাটিলেট এর সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যাওয়াকে থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া বলা হয়।

এনএস-ওয়ান পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গুজ্বর নিশ্চিত হওয়া যায়।
এছাড়া সিবিসি পরীক্ষার মাধ্যমে প্লাটিলেটের সংখ্যা জানা যায়।

রক্ত প্রধানত দুটি অংশে বিভক্ত।
1.রক্ত রস (Blood plasma)
2.রক্ত কণিকা(Blood corpuscle) ।

রক্ত আবার তিন ভাগে বিভক্ত।যেমন-
1.লোহিত কণিকা(Erythorcytes)
2.শ্বেত কণিকা(Leucocytes)
3.অনুচক্রিকা বা প্লাটিলেট(Thrombocytes)।

প্লাটিলেট রক্তের ক্ষুদ্র কণিকা।অত্যন্ত জরুরী এই কণিকার আয়ু ৫ থেকে ৯ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে।
প্লাটিলেটের মূলকাজ শরীরের কোন অংশ কেটে গেলে, রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে ও জমাট বাঁধতে সহায়তা করে।প্লাটিলেট সুতার আঁশের ন্যায় রক্তকে জমাট বাধায়।প্লাটিলেটের সংখ্যা লাখের নিচে থাকলে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করেন না।
কিন্তু কোন কারনে প্লাটিলেটের সংখ্যা 20 হাজারের নিচে আসলে কোন প্রকার আঘাত ছাড়াই দেহের ভেতর আপনা-আপনি রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে।
আবার প্লাটিলেটের সংখ্যা 10 হাজারের নিচে নেমে গেলে দেহের অভ্যন্তরে অঙ্গপতঙ্গ যেমন-
অন্ত্র,মস্তিষ্ক,কিডনিতে রক্তক্ষরণ হতে পারে।
এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

তবে আশার কথা হচ্ছে,প্লাটিলেট সংখ্যা কমে গেলেও তিনদিনের মধ্যেই এই সংখ্যা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসে।প্লাটিলেটের সংখ্যা আমরা নিত্যদিনের খাবার,জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে বাড়াতে পারি।

এমন কয়েকটি খাবার জেনে নেওয়া যাক।

১.পেঁপে :
প্লাটিলেট সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য পাকা পেঁপের জুস খেতে পারেন।
2009 সালে মালয়েশিয়ার “এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি”র একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পাকাপেঁপে ও পেঁপেপাতা প্লাটিলেটের সংখ্যা দ্রুত বাড়াতে দারুন কাজ করে।
রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে গেলে প্রতিদিন পেঁপে পাতা বেটে রস করে,লেবু দিয়ে শরবত করে খেতে পারেন। পাতা সিদ্ধ করেও খাওয়া যায়।

২.মিষ্টি কুমড়া এবং কুমড়া বীজ :
মিষ্টি কুমড়া রক্তের প্লাটিলেট তৈরি করতে বেশ কার্যকরী।এছাড়া মিষ্টি কুমড়াতে আছে ভিটামিন-এ যা প্লাটিলেট তৈরি করতে সহায়তা করে।মিষ্টি কুমড়া ও এর বীজ খেলে উপকার পাওয়া যায়।

◆ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার:
রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে ভিটামিন-সি জাতীয় খাবার খাওয়া বৃদ্ধি করতে হবে।
1990 সালে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভিটামিন-সি রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।আমাদের শরীরে প্রতিদিন 400 থেকে 2000 মিলিগ্রাম ভিটামিন- সি এর প্রয়োজন পড়ে।কিন্তু প্রতিদিনই তাতে ঘাটতি থেকে যায়।
তাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় টমেটো, কমলা,লেবু, আমলকী, কিউয়ি, ক্যাপসিকাম জাতীয় ভিটামিন- সি সমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত।

৩.লেবুর রস:
লেবুর রসে প্রচুর ভিটামিন- সি থাকে।ভিটামিন- সি রক্তে প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে।এছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে প্লাটিলেট ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে।

৪.আমলকি :
আমলকিতেও প্রচুর ভিটামিন- সি আছে।অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ আমলকি খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং প্লাটিলেট ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পায়।

৫.অ্যালোভেরার রস :
অ্যালোভেরা রক্তকে বিশুদ্ধ করে।রক্তের যেকোনো সংক্রমণ দূর করতে অ্যালোভেরা বেশ উপকারী।নিয়মিত অ্যালোভেরার জুস পান করলে প্লাটিলেটের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

৬.বেদেনা বা ডালিম :
বেদেনায় বা ডালিমে পুষ্টি ও খনিজ উপাদান রয়েছে। প্লাটিলেটের সংখ্যা স্বাভাবিক রাখতে এবং ডেঙ্গু সারাতে এটি বেশ উপকারী।
প্রতিদিন 150 মিলিলিটার ডালিমের জুস দুই সপ্তাহ পান করলে ভিটামিনের দুর্বলতা দূর করে শারীরিক শক্তি যোগায়।

৭.ডাব :
ডাবের পানিতে খনিজ ইলেকট্রোলাইটস রয়েছে যা ডেঙ্গুজ্বরে খুবই দরকারি।যেমন- পটাশিয়াম।
প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে ডাবের পানি সহায়তা করে।

৮.পালং শাক :
আয়রন ও ওমেগা- থ্রি ফ্যাটি এসিডের অন্যতম উৎস পালং শাক।
শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে পালং শাক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।ভিটামিন-কে সমৃদ্ধ পালং শাকের শরবত বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
আবার 4/5 টি পালং শাকের পাতা 2 কাপ পানিতে কয়েক মিনিট সিদ্ধ করে ঠান্ডা করে আধা গ্লাস টমেটো রসের সাথে দিনে তিনবার পান করুন। সালাদ অথবা রান্না করেও খাওয়া যেতে পারে।

৯.দুধ
দুধের ক্যালসিয়াম রক্তে প্লাটিলেট গঠনে সাহায্য করে।ক্যালসিয়ামের অভাব হলে রক্তে প্লাটিলেট তৈরির গতি ধীর হয়ে যায়।
দুধের পাশাপাশি টক দই, চিজ, দুধের তৈরি খাবার খাওয়া উচিত।

১০.কলিজা :
কলিজা রক্তের প্লাটিলেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।যেকোনো মাংসের কলিজা ভালোভাবে রান্না করে খেতে হবে।এতে রক্তে আয়রনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়া কড লিভার অয়েল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

১১.ব্রোকলি :
ভিটামিন-কে এর দারুন উৎস ব্রোকলি।
ব্রোকলি রক্তে প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে।যদি দ্রুত প্লাটিলেট কমতে থাকে তবে প্রতিদিনকার খাবারে অবশ্যই ব্রোকলি যুক্ত করতে হবে।
এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও উপকারী খনিজ উপাদন রয়েছে।

১২.বিট :
প্লাটিলেটকে রক্ষা করতে ও এর সংখ্যা বাড়াতে বিট বেশ উপকারী।এক গ্লাস বিটের শরবত খাওয়ার অভ্যাস প্লাটিলেটের অভাব কমাতে সাহায্য করে।

প্লাটিলেট সমৃদ্ধ খাবার খেলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ শারীরিক দূর্বলতাও দূর করে।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *