Md. Akabbor Ali PK

 23 total views

নেলসন ম্যান্ডেলা ১৮ বছর বন্দি ছিলেন যে দ্বীপে ।
[ ছোট্ট এক দ্বীপ রবেন আইল্যান্ডের যত কাহিনী ]

এক দুই বছর নয়,একটানা আঠেরোটি বছর! তাঁর মোট সাতাশ বছরের কারাবাসের মধ্যে আঠেরো বছরই কেটেছে এই রবেন আইল্যান্ডের কুখ্যাত কারাগারে।

সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগার দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েস্টার্ন কেপের ছোট্ট এক দ্বীপ রবেন আইল্যান্ড।পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্তে আটলান্টিক মহাসাগর ও ভারত মহাসাগর যেখানে মিলিত হয়েছে, তার ঠিক পশ্চিমে কেপটাউন শহর।

দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লুবার্গ স্ট্যান্ড উপকূল থেকে ৬.৯ কিলোমিটার ও কেপটাউন জাহাজঘাট বা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিকের টেবিল উপসাগরে রোবেন দ্বীপটির অবস্থান। এখন এটি একটি নিষ্ক্রিয় কারাগার।

এখানেই বন্দি ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবিদ্বেষের অবসান এবং মানবাধিকার অর্জনের অক্লান্ত যোদ্ধা!
এখানে বর্ণবাদী বিরোধী শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা
বর্ণবাদী শাসনামলে ১৮ বছর কারাগারে বন্দী ছিলেন। এছাড়াও প্রাক্তন বন্দিদের মধ্যে ছিলেন কগালেমা মোটলানথে এবং জ্যাকব জুমা, যারা উভয়ে পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন।

১৯৬৪ থেকে ১৯৮২, আঠেরো বছর ধরে রবেন আইল্যান্ড কারাগারের আট বাই সাত-এর সঙ্কীর্ণ কুঠুরিই ছিল ম্যান্ডেলার স্থায়ী ঠিকানা। ১৯৬৪ সালে ম্যান্ডেলা ছিলেন ৪৬৬ নম্বর বন্দি। আঠেরো বছর ধরে তাঁর কোড ছিল ৪৬৬/৬৪। আজও ‘ প্রিজ়নার ৪৬৬৬৪’ সংখ্যাটি গভীর শ্রদ্ধায় তাঁর সঙ্গে জুড়ে আছে।
বাকি ন’বছরে কখনও তিনি ছিলেন কুখ্যাত পলসমুর জেলে, কখনও বা ভিক্টর ভারস্টার কারাগারে।

ছোট্ট কুঠুরিতে শয্যা বলতে ছিল খড়ের মাদুর। সারা দিন চলত হাড়ভাঙা পরিশ্রম। দিনে তেরো ঘণ্টা শ্রম দিতে হত। কখনও পাথর ভেঙে, জঙ্গল সাফ করে রাস্তা নির্মাণে, কখনও চুনাপাথরের খনিতে। খনিতে কাজ করতে করতে ম্যান্ডেলার দৃষ্টিশক্তি খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ কর্তৃপক্ষ তাঁকে রোদচশমা ব্যবহার করতে দেয়নি।

প্রথম দিকে ম্যান্ডেলাকে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ‘ডি’-শ্রেণির বন্দির তকমা দিয়েছিল। ছ’মাসে একটা চিঠি আর এক জন মাত্র ভিজ়িটরের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি ছিল।
কারণ ১৯৬২ সালে রিভোনিয়া ট্রায়ালের রায়ে, নেলসন ম্যান্ডেলাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
বহু লড়াইয়ের পর তাঁকে ‘এ’-শ্রেণির বন্দির মর্যাদা দেওয়া হয়।

এমনকি ১৯৬৮ সালে তাঁর মায়ের মৃত্যু এবং বড় ছেলের গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর তাঁকে তাদের শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়নি।

নেলসন ম্যান্ডেলা জেল থেকে মুক্তি পান ১৯৯০ সালে। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ম্যান্ডেলা দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাই মানবাধিকার আর নেলসন ম্যান্ডেলার নাম ক্রমশ সমার্থক হয়ে ওঠে।

জেলে থাকাকালীন ম্যান্ডেলা স্থানীয় আফ্রিকান
ভাষা শেখেন,ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইনের উচ্চতর পাঠ নেন,বই লেখেন— ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’। কারাবাসে লেখা এই আত্মজীবনী প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। প্রকাশ করে লিটল ব্রাউন অ্যান্ড কোম্পানি। এই বইতেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর কৈশোর, যৌবন, শিক্ষাপর্ব এবং সাতাশ বছরের বন্দিজীবনের কথা।

২০১৩ সালে ম্যান্ডেলা বিবিসি-র অনুরোধে রবেনে তাঁর কারাকক্ষটি পরিদর্শনে যান। সেখানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ম্যান্ডেলা বলেন, রবেন আইল্যান্ডের কারাজীবন তাঁকে অন্য এক মানুষে রূপান্তরিত করেছে, নিজেকে তিনি পুনরাবিষ্কার করেছেন।

প্রথমদিকে কৃষিকাজে ব্যবহূত হলেও পরে দ্বীপটি ক্রীতদাসদের জন্য নির্ধারিত হয়। রবেন আইল্যান্ডে নির্বাসনের ইতিহাস নতুন নয়। চারশো বছরের পুরনো। সপ্তদশ শতকের ধারা বজায় রেখে বিভিন্ন সময়ে রবেন দ্বীপকে নির্বাসনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। সব সময় শুধু অপরাধী নয়, কখনো কখনো কুষ্ঠরোগীদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার জন্য ব্যবহৃত হত রবেন দ্বীপ।
রাষ্ট্রদ্রোহীদের নির্বাসিত করে কঠোরতম শাস্তি দেওয়ার জন্য রবেন আইল্যান্ড ছিল শাসকের চোখে আদর্শ। ১৯৬১ সাল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার রাজনৈতিক বন্দি এবং সাজাপ্রাপ্তদের নির্বাসনের জন্য রবেনকে নির্দিষ্ট করে।ঊনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে আফ্রিকান নেতারা এ দ্বীপে নির্বাসিত হন।

নামিবিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামীদেরও এখানে পাঠানো হত।নামিবিয়ার পিপলস লিবারেশন আর্মির কম্যান্ডার ছিলেন জন ইয়া ওটো নানকুধু। তিনি ইজিপ্ট আর তৎকালীন সোভিয়েট ইউনিয়নে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।তানজ়ানিয়াতে গেরিলা প্রশিক্ষণ শিবির ও শুরু করেন। ধরা পড়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকার তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়ে নির্বাসিত করেছিল এই রবেনে। ১৯৮৫ সালে তিনি মুক্তি পান।

নামিবিয়ার আর এক নামী বিপ্লবী ইয়া টোইভো ১৯৬৬ সালে ধরা পড়েন। সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় তাঁর ঠিকানা হয় এই রবেন। তাঁর স্বাধীনতার স্পৃহা ছিল অদম্য। ১৯৮৪ সালে মুক্তি পেয়ে পরবর্তীকালে তিনি স্বাধীন নামিবিয়ার খনি, শক্তি ও কারা দফতরের মন্ত্রী হন।

১৯৯৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার বন্দিশালাকে দেশের অন্যতম জাতীয় জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা দেয়।একই বছর ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘোষণা করে।

ঔপনিবেশিক আমলে, সতেরো শতক থেকে প্রায় ৪০০ বছর ধরে কারাবাস ও নির্বাসনের স্থান হিসেবে রোবেন দ্বীপ ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কারাগারটি সক্রিয় ছিল।

এর প্রথম বন্দি ছিল স্ট্র্যান্ডলপার নেতা অতশুমাতো।ঊনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে আফ্রিকান নেতারা এই দ্বীপে নির্বাসিত হন। আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ আঠারো বছর (১৯৬৪ থেকে ১৯৮২) এ নির্জন দ্বীপে কারাবন্দি থেকেছেন।
তাঁর কারাবাসের ঘটনাবলী তিনি ১৯৯৪ সালে লং ওয়াক টু ফ্রিডম আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন।

আয়তনে ছোট এবং ডিম্বাকৃতির এ দ্বীপটি লম্বায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এবং চওড়ায় দুই কিমি.।
মোট ছয় কিমি. ব্যাসার্ধ। প্রাচীনযুগে দ্বীপটি মূলত পর্বতের প্রান্ত হিসেবে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আকৃতি ডিমের মতো। ভাঙনের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব একটা উঁচু নয়। রাতে এই দ্বীপ যেন প্রেতভূমি!
চার দিক শুনশান, জনমানবহীন, সাগরের ঢেউ ছুঁয়ে শনশন বাতাসের শব্দ। জ্যোৎস্নার আলোয় রাতে আটলান্টিকের ঘন নীল জলে চাঁদের আলোর মায়া মনকে উদাসী করে দেয়। কিন্তু অমাবস্যার রাতে এই দ্বীপ যেন আঁধারপুরী!

সবশেষ বরফ যুগের প্রায় ১২ হাজার বছর আগে ক্রমবর্ধমান সমুদ্রস্তর উপকূল থেকে এ দ্বীপকে পৃথক করে। ১৫০০ শতকের প্রথমার্ধেও পৃথিবীবাসীর কাছে রবেন দ্বীপ ছিল অজানা।

১৪৮৮ সালে টেবিল উপসাগরে জাহাজ নোঙরের সময় দ্বীপটির অস্তিত্ব খুঁজে পান পর্তুগিজ পর্যটক বাতোলোমিও ডায়াস। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ওলন্দাজরা কেপ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে আসে। অল্প সময়ে তারা এ দ্বীপকে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে।

রবেন দ্বীপ নির্জন হলেও প্রাণীশূন্য নয়। মানুষের সংখ্যা তেমন না হলেও এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা বেশ কয়েকটি প্রাচীন কচ্ছপ আর পেঙ্গুইন। প্রচুর সামুদ্রিক প্রাণী সিল পাওয়া যাওয়ায় দৃষ্টিনন্দন দ্বীপটির নাম হয়েছিল ‘সিল দ্বীপ’। কিন্তু দ্বীপটির খ্যাতি কারাগারের জন্যই।
প্রতিদিন পৃথিবীর অসংখ্য পর্যটক নৌযানে করে রবেন দ্বীপে ঘুরতে যান। এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণ হলো নেলসন ম্যান্ডেলার বন্দিশালা।

১৯৯৭ সালে রবেন দ্বীপটি একটি জাদুঘরে পরিণত হয়। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার রবেন দ্বীপকে দেশের অন্যতম জাতীয় জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা করে। নির্বাসনের জন্য ব্যবহূত দ্বীপটি এখন নিষ্ক্রিয় কারাগার হিসেবেই পরিচিত।

পুরো দ্বীপটি পর্যটকদের বাসে করে ঘুরিয়ে দেখানো হয়। দেখানো হয় কারাগারে থাকা বিভিন্ন বন্দিদের দলিল ও ব্যবহূত জিনিসপত্র এবং ঐতিহাসিক স্থান। দ্বীপটি এখন নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে। পর্যটকরা সহজেই রবেন দ্বীপ ভ্রমণ করতে পারেন, কারাগারে যেতে পারেন এবং বিভিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। ঘুরিয়ে দেখানো হয় গোটা দ্বীপ জেলখানা, নেলসন ম্যান্ডেলার সেল, পরিত্যক্ত চুনাপাথরের খনি, গোরস্থান, গির্জা, স্কুল, নৌ-ঘাঁটি, বাঙ্কার।

তবে কারাগার দেখানোর গাইড স্বতন্ত্র। এঁরা বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন। এই গাইডেরা এক সময় রাজনৈতিক বন্দি ছিলেন।
নেলসন ম্যান্ডেলা যে সেলে বন্দি ছিলেন, সেই সেল খুবই ছোট। দেশ-বিদেশের লোক ছুটে আসেন এই দ্বীপ আর কারাগার দেখার টানে। এখানে এলে, ম্যান্ডেলার আপসহীন সংগ্রামের ইতিহাস জানলে শ্রদ্ধায় মাথা আপনিই নত হয়ে আসে!

তবে যারা আন্দামানের সেলুলার জেল দেখেছেন, তাঁদের মনে হতে পারে, রবেন কারাগার সেলুলার জেলের চেয়ে অনেক কম ভয়াবহ। কিন্তু রবেনের তাৎপর্য অন্যত্র। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা-সহ দেশ-বিদেশের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি মানবাধিকার সংগ্রামের এই তীর্থস্থান পরিদর্শন করে গিয়েছেন।
১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার রবেন দ্বীপকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের শিরোপা দিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *