Md. Akabbor Ali PK

 289 total views

মৌমাছির “দ্য ড্রামাটিক সেক্সুয়াল সুইসাইড” ।
(The Dramatic Sexual Suicide)।

#প্রভাষক_একাব্বর_রসায়নবিজ্ঞান।

মৌমাছি মূলত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। পুরুষ, কর্মী ও রাণী মৌমাছি। এদের প্রত্যেকের কাজ ও দায়িত্ব ভিন্ন ধরনের। নিজ নিজ অবস্থানে থেকে এরা সুশৃঙ্খল ভাবে কাজ করে। আসুন প্রথমে এদের সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক।
অতঃপর সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্য মৌমাছির
“দ্য ড্রামাটিক সেক্সুয়াল সুইসাইড” কিভাবে ঘটে
তার বিস্তারিত জানতে পড়তে থাকুন।

পুরুষ মৌমাছি আকৃতিতে কর্মী ও রানী মৌমাছির মাঝামাঝি। পুরুষ মৌমাছি সহজে চাক থেকে বের হয় না। পুরুষ মৌমাছি নিজে খেতে পারেনা, শ্রমিক মৌমাছিরা তাদের খাইয়ে দেয়।
এরা অলস, কর্মহীন ও কর্ম-বিমুখ! পুরুষ মৌমাছি মধু সংগ্রহ করতে বাহিরে যায় না, সেটা তার কাজ নয়!
স্বাভাবিকভাবে একটি পুরুষ মৌমাছি প্রায় ২ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

একটি শ্রমিক মৌমাছি প্রায় ৪২ দিন বেঁচে থাকে। শ্রমিক মৌমাছি মূলত নারী মৌমাছি,এগুলোকে বন্ধ্যা মৌমাছিও বলা যেতে পারে।

সকল কর্মী মৌমাছি হুল ফুটাতে পারে, কাউকে হুল ফোটালে সেটা আর দেহ থেকে বের হয়না। হুল এবং হুলের গোড়ায় অবস্থিত কিছুটা মাংসপেশি সহ ছিঁড়ে আক্রান্ত ব্যক্তির গায়ে সেটা বিঁধে থাকে। মাংস ছিঁড়ে যাবার কারণে মৌমাছি মারা যায়। এই হুল যতক্ষণ শরীরে বিধে থাকে ততক্ষণই বিষ ক্ষরণ হতে থাকে। খণ্ডিত মাংস পেশী জীবন্ত থেকে যায়, সেটা ছেঁড়া অবস্থায়ও বিষ পাম্প করতে পারে।সেটা খুলে ফেলার পরই ব্যথা কমতে শুরু করে। অতএব মৌমাছির হুল ফুটলে সেটা সন্ধান করে উৎপাটন করলেই বিষ জ্বালা সহসা কমে আসে। 

✓মৌমাছির “দ্য ড্রামাটিক সেক্সুয়াল সুইসাইড”।

পুরুষ মৌমাছির জীবনের একটাই লক্ষ্য আর তা হলো রাণী মৌমাছির সাথে মিলন।
ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত তাই না!

রানী মৌমাছির প্রাপ্তবয়ষ্ক হতে সময় লাগে ১৬ দিনের
মতো আর পুরুষ মৌমাছির (drone) লাগে ২৪ দিন।
রানী যৌবনপ্রাপ্ত হলেই যৌন কাজে লিপ্ত হয়, যাকে ইংরেজিতে বলে mating। মেটিং করে শূণ্যে উড়ন্ত অবস্থায়। মেটিংয়ের পূর্বে রানী আকাশে উড়াল দেয়। পিছে পিছে পুরুষ মৌমাছিরাও উড়াল দেয়।
শত শত পুরুষ মৌমাছির মাঝ থেকে মাত্র কয়েক জনের সৌভাগ্য ঘটে রাণীর সাথে মিলিত হবার।
পুরুষদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা হয়।

এক একটা মৌচাকে প্রায় ১০০’র মত পুরুষ মৌমাছি থাকে। মিলন মৌসুমের প্রতিদিন দুপুরবেলা সকল মৌচাকের সকল পূর্ন বয়স্ক পুরুষ সদস্য একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ভিড় জমায়।
যাকে বলে,”পুরুষ ধর্মসভা এলাকা”
(drone congregation area)।
এর অবস্থান মাটি হতে ১৫-৪০ মিটার উচ্চতায়।
এই ধর্মসভায় কি আলোচনা হয় ?
রাণী মৌমাছির সাথে যৌন মিলনের !

অন্যদিকে কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে প্রতিটা মৌচাক থেকে পূর্ন বয়স্ক মৌমাছি রাণী মৌমাছি ঘুরতে বের হয়।
যার নাম- The Mating Flight.(ভার্জিন রাণীমৌমাছি)
এরপর উড়তে উড়তে রাণী মৌমাছি হটাৎ করেই ঢুকে পড়ে পুরুষ ধর্মসভায়।
কিন্তু কিভাবে রাণী মৌমাছি এ এলাকা খুঁজে পায় ?
সেটাও একটা রহস্য, তাই না !

সে এসেই এক বিশেষ ধরনের গন্ধ (ফেরোমেনন) ছড়িয়ে দেয়, যার ফলে শত শত পুরুষ মৌমাছি’রা উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং এরপরই উড়ন্ত অবস্থায় রাণী মৌমাছি পছন্দমত পুরুষের সাথে মিলন করে। পর্যায়ক্রমে ১৮-২০ টা পুরুষ মৌমাছির সাথে মিলন হয় রাণীর।
তাহলে বাঁকি পুরুষগুলোর কি ভাগ্য খারাপ?
তা অবশ্য নয়।
তবে বাঁকিরা সিরিয়ালের অপেক্ষায় থাকে !
কার ভাগ্যে কি আছে,বলা একটু কঠিনই !

অদ্ভুত ব্যাপার হলো একটা পুরুষ মৌমাছির মিলনের সময়ে তার এন্ডোফেলাস (যৌনাঙ্গ) কর্মী মৌমাছির হুলের মতই ভেঙ্গে যায় এবং তখনই মারা যায় পুরুষ মৌমাছি। মিলনের পরেই মৃত্যু ! কি অদ্ভুত,তাই না !
এ জন্য এ মিলন’কে বলে “The Dramatic Sexual Suicide”।

বাঁকি পুরুষ মৌমাছিগুলো পরদিন আবার ধর্মসভা করে, অপেক্ষা করে জীবনের লক্ষ্য পুরণের। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তারা এ কাজে আত্মত্যাগ করে বংশ রক্ষার্থে। আর সকল প্রাণীর মতোই।

বেশ কিছু পুরুষ মৌমাছি অবশ্য মিলন হতে বঞ্চিত থেকে যায়, বংশরক্ষায় অংশ নিতে পারে না।
কারণ তুলনামূলকভাবে পুরুষ মৌমাছি বেশি।

রাণী প্রতি মৌচাকে মাত্র ১টা, পুরুষ ১০০ টা।
তাহলে ঘটনাটা কি ঘটে !

তাদের মধ্যে একজন রানীর সঙ্গে মিলিত হতে পারে। মিলিত হবার পর পুরুষের পুরুষাঙ্গ (Endophallus) আর বের হয় না।
তখন পুরুষ মৌমাছি তার পুরুষাঙ্গটার আশা ছেড়ে দিয়ে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।তখন পুরুষটার তলপেটের অংশসহ পুরুষাঙ্গটা রানীর দেহে আটকে থাকে। পুরুষটা বিচ্ছিন্ন হবার পরই দূর্বল হয়ে মাটিতে পতিত হয় এবং মারা যায় (“The Dramatic Sexual Suicide”)।

এরপর একই উড়ালে অন্য পুরুষও সুযোগ নিতে চায়। সেক্ষেত্রে ঐ পুরুষটাকে পূর্বের পুরুষটার আটকে থাকা যৌনাঙ্গ বা Endophallus টা সেখান থেকে তাকেই বের করতে হয়। তারপর নতুন পুরুষটা মিলিত হতে পারে। মিলিত হবার পর একই রকমের ঘটনা ঘটে। এরপর আবার অন্য কোন পুরুষ যদি মিলিত হতে চায় তবে পূর্বেরটার মতো কাজ করতে হয় এবং তার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। এভাবে প্রায় ৮-১০ টি বা তারও বেশী পুরুষ মৌমাছি রানী মৌমাছির সাথে একই উড়ালে মিলিত হতে পারে।

এভাবে যে পুরুষ মৌমীছি রানীর সাথে মিলিত হবে তারই প্রাণ যাবে। তাই এই মিলিত হওয়াকে বলা হয় Suicide Mating.

একটা উড়ন্তে যতবারই মিলিত হোক, সব মিলিয়ে প্রায় ১০ কোটি পর্যন্ত স্পার্ম (Sperm) রানীর Oviduct এ জমা হতে পারে। আর রানী সারা জীবনভর এই স্পার্ম ব্যবহার করে ডিম দিতে পারে। তার আর কখনও কোন পুরুষ মৌমাছির সাথে মিলিত হবার দরকার হয় না।

এমনকি তার পেট থেকে জন্ম নেয়া রানী মৌমাছিও যদি তার জীবনে কখনো সেক্স না করে তাহলেও তার রাজত্ব চলবে এবং ডিম ও বাচ্চা দিতে সক্ষম হবে। এটাও একটা প্রকৃতির বিস্ময়ভরা বিশেষত্ব !

রানী মৌমাছির কোন কাজ নেই। চারপাশে শত শত কর্মী ঘুরঘুর করে তার সেবা করার জন্য। তাকে খাওয়ায়, মুখ মুছে দেয়, তার গা পরিষ্কার করে দেয়।
আর রানী শুধু বসে বসে ডিম পাড়ে।
একদিনে সর্বোচ্চ ২০০০ ডিম পাড়তে সক্ষম।
রানী মৌমাছির জীবনকাল ২ থেকে ৫ বছর।

মিলন বঞ্চিত হলেও পুরুষ মৌমাছিরা বেঁচে থাকে শীত মৌসুম পর্যন্ত, মৌচাকের কাঁধে বোঝা হয়ে।
শীতে খাবারের টান পড়লে কর্মী মৌমাছিরা মৌচাক হতে তাদের দূর করে দেয় এবং সেখানেই ২-১ দিনের ভেতরে তারা মারা যায়। নির্দয়ের মতো এ কাজটা করে কর্মীরা শুধুমাত্র তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে।

মজার ব্যাপার হলো রাণী মৌমাছি কিন্তু জীবনে এই একবারই মিলন করে। মিলনের ৩য় দিন থেকে বাকি জীবন (২-৫ বছর) সে এই মিলনের ফসলই ফলায়। প্রতিদিন ১৫০০-২৫০০ ডিম পাড়ে। জীবনের শেষে তার পাড়া ডিমের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩-৪ মিলিয়ন।

এভাবেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মৌচাকের বিস্তৃতি।

শীতকালে রাণী মৌমাছি ডিম পাড়ে না, কেননা তখন শীতের প্রকোপে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। গ্রীষ্মে পুরোদমে ডিম পাড়ে রাণী মৌমাছি।বেশি ডিম পাড়ার ফলে তখন অন্য একটি সমস্যা দেখা দেয়।

বেশি ডিমের সাথে সাথে বেশি মৌমাছি,মৌচাকও বড় হতে থাকে। বেশি মৌমাছির মধ্যে মৌচাকে নিয়ম- শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য স্বাভাবিক আচরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় নতুন মৌচাকের প্রয়োজন পড়ে।
কিন্তু কর্মী মৌমাছিরা এই প্রয়োজনের কথা জানতে পারে কিভাবে?

রাণী মৌমাছি সবসময়ে বিশেষ ধরনের ফেরোমেনন ছড়ায়, কর্মীরা এর মাধ্যমেই রাণীর উপস্থিতি টের পায়। কিন্তু মৌচাক বেশি বড় হয়ে গেলে রাণীর ফেরোমেনন সকল কর্মী পর্যন্ত পৌঁছায় না।

তখন দূরে থাকা কর্মীরা ধরে নেয়, তাদের রানী আর নেই! তাই কর্মী মৌমাছিরা তখন নতুন রাণী মৌমাছি বানানোর জন্য বিশেষভাবে তৈরি কুঠুরী (cell) বানায়। রাণী মৌমাছি এই বিশেষভাবে বানানো কুঠুরিতে নিষিক্ত ডিম পাড়ে।

কর্মী মৌমাছিরা এই বিশেষ ডিমগুলো থেকে বেরোনো লার্ভাদের জন্মের পর থেকেই পূর্ণ-বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত এক বিশেষ ধরনের তরল খাওয়ায়। যার নাম রয়েল জেলী। এই রয়েল জেলী দুধের ন্যায় সাদা বস্তু, যা উৎপন্ন হয় কর্মী মৌমাছির মাথা’র মগজ থেকে। এই রয়েল জেলী শুধু যে মৌমাছির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তা নয়, মানব জীবনে অন্যান্য প্রাণীর জীবনেও মৌমাছির রয়েল জেলী’র বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

নিষিক্ত ডিম হতে উৎপন্ন কর্মী মৌমাছিদেরও  রয়েল জেলী খাওয়ানো হয়; তবে খাওয়ানো হয় মাত্র ৩ দিন। এরপর তাদের স্বাভাবিক খাবারই (মধু,রেনু ইত্যাদি) খাওয়ানো হয়।
                                                         
অনাকাঙ্খিত কারণে যদি কোন রাণী মৌমাছি মারা যায়, তবে ১৫ মিনিটের মধ্যে সকল কর্মী মৌমাছি সে খবর পেয়ে যায় এবং স্বপ্রণোদিতভাবে নতুন রাণী মৌমাছি বানানোর উদ্যোগ নেয়।

রয়েল জেলী খেয়ে খেয়ে রাজকীয় ভাবে বেড়ে ওঠে আগামী দিনের সম্ভাব্য রাণী। অন্যদিকে নতুন রাণীকে জায়গা ছেড়ে দিতে পুরনো রাণী বেশ কিছু কর্মী মৌমাছি সাথে করে মৌচাক ছেড়ে চলে যায়।

কারণ, একটা মৌচাকে একটাই রাণী থাকতে পারে।

পুরনো রাণী এরপর কোথায় যায়? সে তার দল-বল সহ নতুন মৌচাক এর জন্য খোঁজ করতে থাকে। রাণী মৌমাছির যাতে কোন ক্ষতি হতে না পারে, সে জন্য সকল কর্মী মৌমাছি মিলে তাকে ঘিরে রাখে।

এই দৃশ্য আমরা অনেকেই দেখে থাকি।
                                                                  
পুরো দল খুব একটা ঘোরা-ঘুরি করে না, তারা কোন গাছের ডালে আশ্রয় নেয়। খোঁজার জন্য দলের কিছু কর্মী ঘুরে বেড়ায় এবং ভাল কোন জায়গা পেলে এসে খবর দেয়।
তারপর সকলে মিলে নতুন জায়গায় আবার শুরু করে নতুন জীবন।শুরু হয় নতুন করে মৌচাক তৈরি,জন্মায় নতুন নতুন পুরুষ, কর্মী মৌমাছি।

আর আগের মৌচাকে নতুন রাণী মৌমাছি ৮ দিনের মাথায় বেরিয়ে আসে কুঠুরি (cell) থেকে।এরপর       নতুন রাণী মৌমাছি কিছু কর্মীকে সঙ্গে করে নতুন কোন উপযুক্ত জায়গার খোঁজে বেরিয়ে পড়ে, যেখানে নতুন মৌচাক বানানো যায়। অথবা আগের মৌচাকেই থাকে কিন্তু কিছু বিশেষ ডিম, লার্ভা (যেগুলোর ভবিষ্যতে রানী হওয়ার কথা) ধংস করে দেয়।

যাতে নতুন কেউ রাণী হতে না পারে!

এভাবেই চলতে থাকে বছরের পর বছর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।

পৃথিবীর পতঙ্গ-পরাগায়নের ৯০ ভাগই মৌমাছির অবদান। এরা না থাকলে অনেক উদ্ভিদ হারিয়ে যেত কালের গর্ভে। উদ্ভিদের ফলন হত কম। আমেরিকান গবেষণায় দেখা যায়, মৌমাছির পরাগায়নের কারণে শুধু আমেরিকাতেই প্রতি বছর ৩২ বিলিয়ন ডলার মুল্যের ফসল বেশি ফলে।
(বাংলাদেশের সম্পূর্ণ বাজেট ৩৭ বিলিয়ন ডলার )

মৌমাছির শীত মৌসুম টিকে থাকার জন্যই মূলত মধু তৈরি করে।তবে বেশি সিরিয়াস বলে এরা প্রয়োজনের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন মধু তৈরি করে।

উৎপন্ন মধু’র প্রধান খাদক আমেরিকানরা।
এরা বছরে ২৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড মধু কিনে খায়।

2 thoughts on “Md. Akabbor Ali PK”

  1. মো: একাব্বর আলী প্রাং

    ইতিপূর্বে জোনাকি পোকার ” ড্রামাটিক সেক্সুয়াল লাভ এন্ড সুইসাইড ” পেজে প্রকাশিত হয়েছে।
    তবে মৌমাছির ” ড্রামাটিক সেক্সুয়াল সুইসাইড ” লেখাটি আরও বেশি আকর্ষণীয় তথ্যবহুল এবং শিক্ষনীয় পোস্ট।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *