Md. Akabbor Ali PK

 180 total views

” সিল্কের শাড়ি” রেশম পোকায় যার জন্ম।
• সিল্কের শাড়িতে আভিজাত্য ফুটে ওঠে শতকরা ১০০ ভাগ।
• রাজশাহীর সিল্ক দিয়ে তৈরি শাড়ি দেশের বাইরেও ব্যাপক জনপ্রিয়।

#প্রভাষক_একাব্বর_রসায়নবিজ্ঞান।

রেশম (ইংরেজি: Silk) একধরনের প্রাকৃতিক প্রোটিন তন্তু, যার কয়েকটি ধরন বস্ত্রশিল্প বয়নের কাজে ব্যবহার করা হয়। রেশমের সর্বাধিক পরিচিত ধরন বম্বিক্স মোরি নামের রেশম পোকার লার্ভার গুটি থেকে সংগ্রহ করা হয়। এক ধরনের রেশম পোকার গুটি থেকে এ ধরনের সূতা পাওয়া যায়। বিশেষ ব্যবস্থায় রেশম পোকা চাষের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে এই সূতা প্রস্তুত করা হয়। রেশম পোকার গুটি চাষের পদ্ধতিকে সেরিকালচার বলা হয়।

✓ রেশমের বর্ণাঢ্য ইতিহাস ।

চীনে এর উৎপত্তি। এরপর এই আবিষ্কার দুই হাজার বছর নিজেদের মধ্যেই রেখে দেয় চীনারা।
প্রস্তর যুগের শেষ প্রান্তে সিল্কের আবিষ্কার চমকে
দেয় সারা দুনিয়াকেই। খুব ধীরে হলেও একসময়
এর বিস্তার ঘটতে থাকে অন্যান্য দেশে।

কথিত আছে,খ্রিষ্ট জন্মের প্রায় ২০০০ বছর আগে
চীন দেশে সর্বপ্রথম রেশম সুতা আবিস্কৃত হয়।
এরপর প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার বছর পর্যন্ত চীনারা একচেটিয়াভাবে অত্যন্ত গোপনীয়নতার সাথে রেশমী সুতা ও রেশমী কাপড় তৈরি করত।

প্রাচীনকাল সর্বপ্রথম চীনে রেশমগুটির চাষ করা হয়। রেশমের জন্য চীনের সম্রাটের স্ত্রী লেই চু এর অনেক ভূমিকা রয়েছে।সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ৩,৫০০ আগে থেকেই চীনারা রেশম ব্যবহার করতে জানতো।
প্রথম দিকে রেশমের জামা চীনা সম্রাটের জন্য সংরক্ষণ করা হতো।
পরে এটি সমাজের ধনী শ্রেণীর তোষাখানাতে স্থান পায় এবং এর সৌন্দর্য্য ও হালকা গুণগত মানের
জন্য পরে এটি চীনা ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রেশমের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে এটি একটি আন্তজার্তিক ব্যবসায় পরিণত হয় এবং বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করা শুরু হয়।

চীনা সম্রাটরা রেশমগুটির চাষের উৎপাদন পদ্ধতি গোপন রাখার জন্য অনেক সর্তকতা অবলম্বন করেন।

খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছর পর দুজন ইউরোপীয় পাদ্রী চুরি করে রেশম উৎপাদনের কৌশল শিখে নেন এবং ইউরোপে কিছু রেশম পোকার ডিম ও তুঁত গাছের বীজ নিয়ে এসে রেশম চাষ শুরু করেন।

রেশম বাণিজ্যের প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায় মিশরের ২১তম রাজবংশের (সি. ১০৭০ খ্রিস্টপূর্ব) একটি মমির চুলে পাওয়া রেশম থেকে।

ইউরোপে, যদিও রোমান সাম্রাজ্য রেশমের চাষ জানতো এবং সমাদর করতো, কিন্তু শুধু খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০, বাইজেন্টাইন সাম্রাজের সময় রেশমগুটির চাষ শুরু হয়েছে।
উপকথা থেকে জানা যায় যে, সন্ন্যাসীদের আদেশে সম্রাট জাস্টেনিয়ান প্রথম কন্সটান্টিনোপলতে রেশম পোকার ডিমগুলো আনেন। ১২০০ খ্রিষ্টাব্দে ইতালির পালেরমো, কাতানযারো এবং কোমো ছিল ইউরোপের সর্বাধিক রেশম উৎপাদন শহর।

কিন্তু পরে রেশমেরর চাষ জাপান, কোরিয়া এবং ভারতে আবির্ভূত হতে শুরু হয়।

সিল্ক নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসও কম গর্বের নয়। বাংলাদেশের মসলিনের জয়জয়কার এখনো।
সিল্কের নানা ধরন। নানা নাম। কিন্তু প্রকাশ একই রকম। আভিজাত্য। শাড়িতে যেন সেটা ফুটে ওঠে শতকরা ১০০ ভাগ।

✓ রাজশাহীর সিল্ক দিয়ে তৈরি শাড়ি দেশের বাইরেও ব্যাপক জনপ্রিয়।

বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশ উন্নতমানের রেশম সুতা ও রেশম পোকার চাষ করে। বাংলাদেশও এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। উন্নত মানের রেশমী কাপড় উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশের রাজশাহী শহরকে সিল্ক সিটি নামে অভিহিত করা হয়।

রাজশাহীর সিল্ক নামটি দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের রাজশাহীর রেশম তন্তু দিয়ে এটি উৎপন্ন হয়েছে বলে।
এটি জনপ্রিয় একটি নাম,বিশেষ করে শাড়িতে।

রাজশাহীর সিল্কের তৈরি শাড়ি রঙিন এবং রকমারি নকশা ও ডিজাইনে পাওয়া যায়। সিল্ক তন্তু বস্ত্র এবং এ সম্পর্কিত অন্যন্য পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
রাজশাহীর সিল্ক দিয়ে তৈরি শাড়ি ও অন্যন্য পণ্যগুলি বেশ জনপ্রিয় এবং দেশ ও দেশের বাইরেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

রাজশাহী রেশম শিল্পের জন্য একটি সিল্ক কারখানা এবং একটি সিল্ক গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছে এ অঞ্চলের রেশম চাষ সমগ্র বাংলাদেশের সিল্কের যোগানদাতা হিসাবে গ্রাহ্য করা হয়। প্রায় ১০,০০০ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাতের নিযুক্ত রয়েছে।

রেকর্ড অনুযায়ী ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলে রেশম উৎপাদনের সূচনা হয়।এটি তখন বেঙ্গল সিল্ক বা গঙ্গার রেশম নামে পরিচিত ছিল। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সরকার রাজশাহীতে রেশম উৎপাদন শুরু করে। রাজশাহী সিল্ক কারখানা একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা যা ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে এটি বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের হাতে হস্তান্তরিত হয়। তার পর থেকে এটি ক্ষতির বোঝা বয়ে চলছিল, এটি ৩০ নভেম্বর ২০০২ এ বন্ধ করে দেওয়া হয়।এই কারখানাটি দ্বারা ২০,০২,৩০০ টন রেশম উৎপাদিত হয়েছিল। ২০১১ সালে এটি ছিল মাত্র ৫০ টন। ২০১১ সালে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, রাজশাহী রেশম কারখানাটি আবার চালু করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু বেসরকারীকরণ কমিশন এই কাজটিকে উদ্বেগজনক বলে অস্বীকার করেছিল।

২০২১ সালে, এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই)পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

রাজশাহীর সিল্ক অনেক সুক্ষ্ম এবং নরম মোলায়েম আঁশ।আঁশের উপাদান পিউপা যা আসে তুঁত রেশম থেকে এবং এটি প্রোটিন এর আবরন যা সারসিনা নামে ডাকা হয়।
সাধারনত তিন ধরনের সিল্ক হয়: ১.তুঁত সিল্ক ২.ইরি(অথবা ইন্ডি) সিল্ক এবং ৩.তসর সিল্ক।

এ সকল পণ্য,তুঁত রেশম সূক্ষ্ম এবং সেইজন্য সবচেয়ে মূল্যবান।

✓ রেশম আসলে কি ?

Silk Fiber বা রেশম তন্তু বা সুতা, রেশম মথ নামে এক ধরনের মথের লার্ভার লালাগ্রন্থি বা রেশ গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত রসের তৈরি। এরা অর্থোপোডা (Arthropoda) পর্বের অন্তর্ভুক্ত ইনসেক্টা (Insecta) শ্রেণীর লেপিডটেরা (Lepidoptera) বর্গের পতঙ্গ। রেশম পোকার ইংরেজি নাম সিল্ক ওর্য়াম (Silk Worm)। ওর্য়াম (Worm) শব্দের অর্থ কীট।

Silk Worm এর অর্থ দাঁড়ায় রেশম কীট। কৃমি জাতীয় প্রাণীদের কীট বলা হয়। আসলে এরা দেখতে কৃমির মত নয়। তবে এরা পূর্ণবয়স্ক হলে প্রজাপতির মত দেখায়। তাই কীট না বলে পোকা বলাই বরং ভাল। বিভিন্ন প্রজাতির রেশম মথ বিভিন্ন মানের রেশম সুতা তৈরি করে। আমাদের দেশে যে রেশম পোকা পাওয়া যায় তার বৈজ্ঞানিক নাম বোমবিক্স মোরি (Bombyx mori) ।

✓ রেশম পোকা হতে রেশমি সুতা কিভাবে হয় ?

রেশম পোকার খাবার হল তুঁত গাছের পাতা।
তুঁত গাছকে ইংরেজিতে মালবেরি গাছ বলে।
তুঁত গাছ বিভিন্ন জাতের হয়ে থাকে এবং নামও ভিন্ন। বাংলাদেশের রেশম পোকারা যে তুঁত গাছের পাতা খায়, তার নাম মোরাস অ্যালবা ( Morus alba) ।

রেশম পোকার জীবনে চারটি পর্যায়। তা হল ডিম, শূককীট, মূককীট ও পূণাঙ্গ পোকা। পূর্ণাঙ্গ পোকার নাম মথ। পোকারা নিশাচর অর্থাৎ রাতের বেলায় চলাফেরা করে। পোকার রঙ উজ্জ্বল নয়।

স্ত্রী মথ পাতা বা কাগজের উপর চরে বেড়ায়। মথ কাগজ বা পাতায় ৪০০- ৫০০’শ ডিম পাড়ে। ডিমের রঙ ফ্যাকাশে হলুদ। প্রায় ১০ দিন পর ডিম ফুটে শূককীট বের হয়। শূককীট দুষ্টু ছেলের মত চঞ্চল।
সে ছুটোছুটি করে আর গ্রোগাসে গিলতে থাকে।

তুঁত গাছের পাতা কুচি কুচি করে কেটে এদের খেতে দিতে হয়। শূককীট কয়দিন পর পর চারবার খোলস বদলায়। খোলস বদলালনোকে মোল্টিং বলে। মোল্টিং অর্থ ত্বক পরিবর্তন। শূককীট বড় হলে বাদামী লাল রঙের দেখায়। শূককীট চতুর্থবার খোলস বদলানোর পর মূককীটে পরিণত হতে শুরু করে। এ সময় এদের খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। শূককীট, মূককীটকে যে বাঁশের ডালায় রাখা হয় তার নাম চন্দ্রকী। চন্দ্রকীতে অনেক গুলি কুঠুরি থাকে।

শূককীট দেহের ভিতরে একটি লম্বা রেশম গ্রন্থি থাকে। গ্রন্থিতে থাকে এক প্রকার রস।নালী দিয়ে এ রস মুখের বাইরে আসে। নালীর নাম স্পিনারেট (Spinneret)। বাতাসের সংস্পর্শে রস শক্ত হয়ে যায়।

মূককীট মিনিটে ৬৫ বার মুখ ঘুরিয়ে রস দিয়ে দেহের চারপাশে আবরণ তৈরি করে। এই রসকে সাধারণ কথায় মুখের লালা বলে। আবরণসহ মূককীটকে গুটি বলে। গুটির ইংরেজি নাম কুকুন (Cocoon)।

গুটির মধ্যে মুককীটের অদ্ভুত রূপান্তর ঘটে। এই পরিবর্তনকে মেটামরফসিস (Metamorphosis) বলে। মূককীট পরিবর্তিত হয়ে সুন্দর মথের রূপ ধারণ করে। মথই রেশম পোকার পূর্ণাঙ্গ অবস্থা।

মথ হবার আগেই গুটিকে বাষ্প বা গরম জলে রাখতে হয় । না হলে মথ গুটি কেটে বেরিয়ে যায়। গুটি কেটে গেলে সুতা নষ্ট হয়ে যায়। গুটি গরম পানিতে পড়লে এর সুতোর জট খুলে যায়। একটি গুটিতে ৪০০ – ৫০০ গজ সুতা থাকে। প্রায় ২৫,০০০ গুটি থেকে ১ পাউন্ড সুতা পাওয়া যায়।

✓ সিল্কের শাড়িতে নানা ধরনের কাজ।

সিল্কের শাড়িতে করা যায় সব ধরনের কাজ। তবে সব সিল্কে সব ধরনের কাজ হয় না। সুতার ব্যবহারের বিষয়টাও বেশ জটিল। নানা ধরনের সিল্ক এখন তৈরি হচ্ছে এ দেশে। এর মধ্যে মসলিন, সফট সিল্ক, বলাকা, ডুপিয়ান, অ্যান্ডি উল্লেখযোগ্য। সিল্কের রাজ্যে বলাকা সিল্ক শ্রেষ্ঠ। এ গ্রেড সুতা ব্যবহার করে বানানো হয় এই সিল্ক। এই সুতা দিয়ে কাতান শাড়িও তৈরি করা হয়। মসলিনের মধ্যেই আবার তিন থেকে চার ধরনের মান থাকে, যেগুলো ১/১, ২/২, ২/৩ সুতার মাধ্যমে বানানো হয়। সুতার এ রকম ভিন্নতা সফট সিল্কের মধ্যেও দেখা যায়। তবে সফট সিল্ক তৈরি করার সময় সুতার ওজন যত বেশি হবে, মানও তত ভালো হবে। সফট সিল্ক বানানোর সময় থানকে গরম পানির মধ্যে সেদ্ধ করে নরম করা হয়। মটকা ও ডুপিয়ান সিল্ক মোটা সুতার মাধ্যমে করা হয়। এ ধরনের সিল্কের ওপর সব ধরনের কাজই করা যায়।

১. বলাকা সিল্কের মান খুব ভালো হয়। হাতের কাজ, নানা ধরনের প্রিন্ট করা হয় এই সিল্কের ওপর। তবে এ ধরনের দুটো রং দিয়েও সাজানো হচ্ছে শাড়িকে। পুরো শাড়ির মূল অংশের রং মেরুন। আঁচলটি কালো। এ ধরনের শাড়ির একটি সুবিধা—গয়না ও ব্লাউজ ভিন্নধর্মী হতে পারে। চাইলে সাধারণ কাটের ব্লাউজও পরতে পারেন।

২. কাঁথা ফোঁড় আমাদের দেশের ঐতিহ্য। এ ধরনের নিখুঁত হাতের কাজ যখন সিল্কের ওপর ফুটিয়ে তোলা হয়, আবেদনে চলে আসে আভিজাত্য। যেকোনো দাওয়াতে এ ধরনের শাড়ি ভিড়ের মধ্যেও মধ্যমণি করে রাখবে আপনাকে।

৩. সফট সিল্কে সুতার কাজ করা সম্ভব নয়। এতে কাপড় ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে ছাপা নকশাই এখানে ভরসা।

৪. সফট সিল্কে হালকা রঙের ওপর কালো জ্যামিতিক নকশা। গলায় ভারী রুপালি গয়না। যেকোনো বয়সেই মানিয়ে যাবে এই সাজ। সফট সিল্কে মূলত ব্লক, হাতে আঁকা ও স্ক্রিন প্রিন্ট করা হয়।

৫. গরমে দেখেই আরাম লাগবে এমন একটি শাড়ি। হালকা রঙের টাই-ডাই করা শাড়িটি নজর কাড়তে বাধ্য। খুব ভারী গয়না না পরলেই স্নিগ্ধতা বজায় থাকবে।

মসলিনের ওপর কাটওয়ার্ক করা যায়। উজ্জ্বল হলুদ রঙের মসলিনের শাড়িটি যে কোনো ঋতুর জন্য মানানসই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *