MD SELIM REZA

 226 total views

পানুর ডায়েরী – ৫

দিনটি ছিল শুক্রবার। দুই পিরিয়ডের পর একঘন্টার লম্বা টিফিন। স্কুল বাউন্ডারির বাইরে গাছতলায় বসে আমরা ক’জন বন্ধু মিলে পরদিন স্কুল ফাঁকি দিয়ে সিনেমায় যাবার ষড়যন্ত্র করছিলাম। এমনসময় দেখি দশ ক্লাসের মেয়ে রুসি তাড়স্বরে চিৎকার করতে করতে মাঠের দিক থেকে ছুটে আসছে। তার চোখমুখে ঘোর অতঙ্ক।
স্কুলের দক্ষিণে, বেশ কিছুটা তফাতে মাঠের মাঝে রায়বাবুদের বিরাট বাগান। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাগানের মাঝখানে একটি পোড়োবাড়ি। ওটা নাকি একসময় নাচমহল ছিল। সংগীত প্রিয় রায়বাবুরা লক্ষ্ণৌ থেকে বাইজি নিয়ে আসতেন। আট-দশ দিন ধরে চলত নাচগানের আসর। কালের করাল গ্রাসে রায়বাবুদের সেই দপদপানি আর নেই, নাচঘরটাও প্রায় ধ্বংসাবশেষে পরিনত হয়েছে।
বাগানকে ঘিরে এলাকায় নানা কথা প্রচলিত আছে। শোনা যায় লক্ষ্ণৌয়ের বিখ‍্যাত মীরাবাঈকে খুন করে বাগানের মধ‍্যে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। মীরাবাঈয়ের অতৃপ্ত আত্মা নাকি এখনও রাতের অন্ধকারে বাগানের ঘোরাফেরা করে। এই ঘটনার সত‍্যাসত‍্য যাচাই করা হয়নি কোনকালেই, তবে মানুষের মনে ভয় থেকে গেছে। তারওপর বছর দুয়েক আগে একটি মেয়ে বাগানের গাছে গলায় ফাঁসি লাগিয়ে আত্মহত‍্যা করে। সেই থেকে বাগানের ধারেকাছে কেউ যায় না।
নানা প্রজাতির ফুল ও ফল গাছের সাথে একটি নারকেল কুলের গাছ আছে সেখানে। ফুল ফুটলে ভ্রমর যেমন মধুর লোভে ছুটে আসে, স্কুলের মেয়েরাও তেমনি কুলে রঙ ধরতে শুরু করলে বাগানের আশেপাশে ছুকছুক করে। তবে কেউ ভেতরে ঢোকে না। পাঁচিলের  এপারে ঝুলে পড়া ডাল থেকে কুল সংগ্রহ করে। কখনও কখনও ছেলেরা তাদের এই কাজে সাহায‍্য করে।
রুসি বাগানের দিক থেকে আসছে। আমরা বৈঠক ভঙ্গ করে তার কাছে ছুটে গেলাম। – কী হয়েছে রে! চিৎকার করছি কেন?
– ভুত!
– কোথায় ভুত?
– বাগানে। গাছের ডালে ঝুলছে।
বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেল নীচু ক্লাসের একটি মেয়েকে সাথে নিয়ে সে কুল পারতে গিয়েছিল। ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক তার সমনে পাঁচিলে ছোট একটি ফাটল আছে। হঠাৎ তারা ওই ফাঁক দিয়ে লক্ষ‍্য করে সাদা কাপড় পরিহিত একটি মহিলা গাছের ডালে ঝুলছে। মেয়েটি তৎক্ষণাৎ জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছে। রুসি কোনরকমে এসেছে তাদের খরব করতে।
খবর তো পাওয়া গেল। কিন্তু ভুতের মুখোমুখি হবে এমন বুকের পাটা ক’জনের কাছে? পানু, আমি আর অচিন্ত‍্য নামের একটি ছেলে বাদে সকলেই ততক্ষণে ফিরতি পথ ধরেছে। অগত‍্য আমরাই রুসিকে নিয়ে অকুস্থলে পৌঁছালাম।
তখনও মেয়েটি চিৎ হয়ে পরে আছে। রুসি ছুটে গিয়ে তার মাথাটা কোলে তুলে নিল। অচিন্ত‍্য ধানের জমি থেকে খাবল খাবল জল তুলে মেয়েটির চোখেমুখে ছিটোতে লাগল। আমি সাইকেল তালার চাবিটা মেয়েটির দু’পাটি দাঁতের ফাঁকে ঢুকিয়ে ধরে বসে আছি, যাতে দাঁতকপাটি লেগে জীভ কেটে না যায়। এই অবসরে পানু টুক করে পাঁচিল টপকে বাগানে ঢুকে গেল। একা যেতে বারণ করলাম,  শুনলো না।
অনেক তদবির-তদারক করার পর মেয়েটি উঠে বসল। তাকে রুসির জিম্মায় রেখে অচিন্ত‍্যকে নিয়ে ছুটে গেলাম বাগানের মূল ফাটকের দিকে। মোটা মোটা লোহার রড দিয়ে বানানো পাল্লা কতদিন খোলা হয়নি, লতাপাতা-আগাছার জঙ্গলে ছেয়ে আছে। জঙ্গল সরিয়ে লোহার রড বেয়ে দরজা পেরিয়ে বাগানে প্রবেশ করলাম।
– পানু। পানু তুই কোথায়? চিৎকার করতে করতে আমরা ছুটে চলেছি বাগানের শেষপ্রান্তে, যেখান দিয়ে পানু পাাঁচিল টপকে বাগানে ঢুকেছে। গাছের ডালপাতায় ধাক্কা খেয়ে আমাদের ডাক প্রতিধ্বনি হয়ে আমাদের কাছেই ফিরে আসছে। শান্তি বিঘ্নিত হওয়ায় বাগানের স্থায়ী বাসিন্দা কাক-শালিকের দল প্রতিবাদে ফেটে পড়ল। তাদের সম্মিলিত কলতানে কান ঝালাফালা হবার জোগাড়। পানু সাড়া দিলেও তা আমাদের কানে পৌঁছানোর কথা নয়।
যেখানে ভুতের ভয় সেখানেই সন্ধ‍্যা হয়। অচিন্ত‍্যর পরনের শার্ট সরু একটা ডালে আটকে গেলে ভুতে ধরেছে মনে করে সে চিৎকার দিয়ে উঠল, বাবারে গেলুম রে! ভুতে খেয়ে ফেলল।
আমি তার থেকে অনেকটা এগিয়ে এসেছি। চিৎকার শুনে পিছন ফিরে দেখি অচিন্ত‍্য হাত-পা ছুড়ে লাফালাফি করছে। তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে তাকে মুক্ত করে, পুনরায় পা বাড়াতে যাব এমনসময় আগাছার জঙ্গল ভেদ করে পানুর আবির্ভাব ঘটল। রুসি কথিত সাদা শাড়ি পরিহিতা মহিলার ঘাড় চেপে ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসছে সে।
কিন্তু পানু কাছাকাছি হতে আর এক ভৌতিককাণ্ড ঘটে গেল। সাদা শাড়ি পরিহিতা মহিলা উবে গিয়ে তার হাতে যে এখন এক টুকরো সাদা পলিথিন ঝুলতে দেখছি।
– এ কী কাণ্ড! জানতে চাওয়া হলে পানু পলিথিনের টুকরোটা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে একগাল হেসে বলল, ভুতটাকে গাছ থেকে নামাতে খুব কসরত করতে হয়েছে বুঝলি। একেবারে হাপিয়ে উঠেছি।
                          —–

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *