MD. SELIM REZA

 14 total views

মজলুম
মুহাম্মদ সেলিম রেজা

  আর মাইল তিনেক পথ ভাঙতে পারলেই গ্রামে পৌঁছাতে পারবে রজব আলি। সমস্যা হল মাঝে দু’-তিনটে হিন্দু গ্রাম আছে। এই পরিস্থিতি হিন্দু গ্রামে পা রাখা দূরের ভাবনা, পাশ দিয়ে যাওয়া মানে যেচে বিষ পান করা। মুসলিম গ্রামগুলোরও একই অবস্থা। সবাই রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিচ্ছে। তারওপর আছে পুলিশের আনাগোনা, মিলিটারী জওয়ানদের রুট মার্চ।অবশ্য ঘুর পথে যাওয়া যায়। তাতে করে তাকে দ্বিগুণের বেশী পরিশ্রম করতে হবে।
  রজব আলির চার ছেলেমেয়ে। বছর দুয়েক হল বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। মেজ মেয়েও বিবাহযোগ্যা, তার জন্য পাত্রের খোঁজ চলছে। ছেলেরা ছোট, স্কুলে পড়ে। বড় মেয়ের সন্তান হয়েছে খবর পেয়ে দু’দিন আগে নাতনিকে দেখতে এসেছিল। সেদিনই সে ফিরে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু মেয়ের ইচ্ছা বাপ আর ক’টা দিন থেকে যাক, জামাইও তাই চায়। শেষপর্যন্ত তাদের আবদার মেনে নিয়ে থেকে গিয়েছিল রজব আলি।
  মাঝরাতে বিবির ফোন করে জানায় ছোট ছেলের ডায়েরিয়া হয়েছে। স্যালাইন দিতে হবে, গ্রামের ডাক্তারের স্টকে নেই। শহর থেকে আনাবে তারও উপায় নেই, দাঙ্গা আবহে কেউ বাড়ি থেকে বেড়ুতে চাইছে না। দেরি করে না রজব আলি, জামাইয়ের বাইকে চেপে হাসপাতাল মোড়ের দোকান থেকে পাঁচটা স্যালাইনের বোতল কিনে, পলিব্যাগে ভরে নিয়ে আলপথ ধরে হাঁটতে শুরু করে। যদিও জামাই তাকে বাড়ি পযর্ন্ত বাইকে পৌঁছে দিতে চেয়েছিল। কার্ফু জারি থাকায়, পুলিশি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার ভয়ে রাজি হয়নি সে। 
   সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঝামেলার সূত্রপাত। ভোটের মরশুম। পোস্টার-ব্যানার, ফেস্টুন-পতাকা নিয়ে সব দলের ছেলেরা প্রচারে নেমে পড়েছে। সাহেবনগরের কিছু হিন্দু যুবক একটি রাজনৈতিক দলের পতাকা টাঙাতে এলে পীরপাড়ায় ছেলেরা বাধা দেয়, মুসলিম বিদ্বেষী ওই দলের পতাকা তারা গ্রামে লাগাতে দেবে না। সাহেবনগরের ছেলেরা তখন চুপচাপ চলে গেলেও পরদিন বাধাদানকারী এক যুবককে গ্রামে পেয়ে যাচ্ছেতাই হেনস্থা করে। সেই থেকে এপক্ষের লোক ফুঁসছে, ওদের যাকে পাবে তাকেই মারবে। উত্তেজনার আঁচ অনুভব করে উভয়পক্ষের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, স্থানীয় থানার ওসি ও ব্লক উন্নয়ন আধিকারিককে নিয়ে আলোচনা করে মিটমাট করে নেন। ক্রমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছিল। এমনসময় ওই দলের কিছু নেতা এসে বিদ্বেষ ভরা গরম গরম ভাষণ দিলে আগুনে ঘৃতাহুতির কাজ করে।
   পীরপাড়ার ছেলেরা কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রতিবাদ করেনি। তাদের বক্তব্য ছিল দলটি মুসলিম বিদ্বেষী, তাদের প্রচার মুসলিম গ্রামে চালাতে দেওয়া হবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্য একটি রাজনৈতিক দল, যারা ওই দলটির প্রধান প্রতিপক্ষ তারা এসে মুসলিমদের হয়ে গলা ফাটাতে শুরু করে। তাদের তালে তাল দিয়ে মুসলিমরা নাচতে শুরু করল, একবারও ভাবল না তাদের মূল অভিসন্ধি কী? পরিনামে যা হবার তাই হয়েছে। রাজনৈতিক কোন্দল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রূপে এলাকায় চেপে বসেছে। পীরপাড়ার একজন বোমায় নিহত হয়েছে, পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে অনেককে।
  রজব আলি এতক্ষণ মেঠো আলপথ ভেঙে এগোচ্ছিল। পাকা রাস্তায় উঠে ভাবনায় পড়ল। ঠিক করে উঠতে পারে না কোন পথে এগোবে। এমনসময় দূর থেকে দেখতে পেল একজোরা হেড লাইট শহরের দিক থেকে ছুটে আসছে। এতরাতে সাধারণত এই রাস্তায় বড় গাড়ি যাওয়া আসা করে না। এলাকায় কার্ফু জারি রয়েছে। হতে পারে পুলিশের গাড়ি টহল দিতে আসছে। ছ্যাত করে দুলে উঠল রজব আলির বুকের ভেতরটা, পুলিশের হাতে পড়লে শূলি-ফাঁসি না হোক, নূন্যপক্ষে তিন মাস জেলের ঘানি টানতে হবে কোন সন্দেহ নেই।
  তাড়াতাড়ি পাকা রাস্তা ছেড়ে নীচে নয়ানজুলিতে নেমে এল সে। শুখা মরসুম নয়ানজুলিতে এক ফোঁটা জল নেই, নানা জাতের আগাছায় ভরে আছে। আগাছার জঙ্গলে গুটিসুটি মেরে বসেও নিশ্চিত হতে পারল না। হেড লাইটের জোরালো আলোয় পুলিশের চোখে ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। ওই অবস্থায় ঘাড় ঘুড়িয়ে এদিক ওদিক তাকায়। গাঢ় অন্ধকারে কিছুই ঠাওর করতে পারে না।
  গাড়িটা হেড লাইটের জোরালো আলোয় অন্ধকার ফালা ফালা করে ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ততই উৎকন্ঠা বাড়ছে রজব আলির, এই বুঝি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেলাম। বউ-বাচ্চার কাছে আর পৌঁছানো গেল না। ইত্যবসরে হেড লাইটের আলোর একছটাক নয়ানজুলিতে আছড়ে পড়তে দেখতে পেল সামনে একটা কালভার্ট। সাথে সাথে গড়াগড়ি দিয়ে কালভার্টের মুখে পৌঁছে হামাগুড়ি দিয়ে ভিতরে টেনে নিল দেহটা। খানিকবাদে মাথার উপর দিয়ে সাঁ করে গাড়িটা বেরিয়ে গেল।
   চুপচাপ সেখানে কিছুক্ষণ বসে থাকে রজব আলি। একবার ভাবে রাতটুকু এখানে অতিবাহিত করে ভোরের আলো ফোটার আগে রওনা দেবে গ্রামের উদ্দেশ্যে। তৎক্ষণাৎ ছেলের যন্ত্রণা ক্লিষ্ট মুখখানা তার মানসপটে ভেসে ওঠে। বোতল বন্দি ক’ফোঁটা পানির অভাবে ছেলেটা আমার মরে যাবে। বাপ হয়ে সে তা সহ্য করে কী করে? যাবতীয় ডর-ভয় ঝেড়ে ফেলে উঠে আসতে চাইল সে। আর তা করতে গিয়ে অসাবধানতায় বাম হাতখানা পিছলে গিয়ে নরম কিছুতে ঠেকল। বিদ্যুৎ গতিতে কালভার্টের ভিতর থেকে ছিটকে বাইরে চলে এল সে।
   কী হতে পারে ওটা? ছোঁয়া লাগতেই মনে হল যেন গুটিয়ে গেল! না, আলো জ্বালিয়ে দেখতেই হচ্ছে। রজব আলি পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেশালাই বার করতে উদ্যত হল। ঠিক তখনই ভিতর থেকে খুক খুক করে কাশির আওয়াজ ভেসে এল। পরিস্কার মানুষের গলার স্বর। কে ও! কেন এখানে সে? পরক্ষণে তার মনে হল, তার মতো ভাগ্য বিড়ম্বিত কেউ প্রাণের দায়ে লুকিয়ে আছে নিশ্চয়।
  লোকটা কোন জাতের, হিন্দু না মুসলিম? প্রশ্নটা চাগার দিয়ে উঠল রজব আলির মাথায়। পরক্ষণে ভাবল, জাত যাই হোক সেও একটা মানুষ। তাতে আমাতে তফাৎ কোথায়? সেও প্রাণ ভয়ে লুকিয়ে আছে, আমিও তাই। দু’জনেই এক ডালের পাখি।
– কে? কে তুমি? ফিসফিস করে ডাকল রজব আলি।
  ওদিক থেকে কোন উত্তর এল না। আবার ডাকল, এবারেও সে কোন কথা বলে না। তৃতীয়বারে রজব আলি বলল, এবার কথা না বললে পাথর মেরে তোমার মাথা ভেঙে দেব।
– আগে বল তুমি কোন জাতের, হিন্দু না মুসলিম? মিউমিউ করে বলল ভিতরের লোকটা।
– তুমি যেমন প্রাণ ভয়ে ভীত হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছ, আমিও তাই। আমাদের জাত একটাই, আমরা মজলুম।
  এরপর নিশ্ছিদ্র নিরবতা, কেউ কোন কথা বলে না। খানিকবাদে লোকটা পুনরায় খুক খুক করে কাশতে শুরু করল। একসময় কাশতে কাশতে তার দম বন্ধ হবার উপক্রম হল। রজব আলি হাতের পলিপ্যাকটা ফেলে রেখে হাঁটু গেড়ে বসে লোকটার পিঠে হাত বোলাতে লাগল। – জল আছে তোমার কাছে? একটু মুখে দাও।
লোকটা জানায় তার কাছে জল নেই। তখন রজব আলি হাত বাড়িয়ে পলিপ্যাক থেকে স্যালাইনের একটা বোতল টেনে নিল। তারপর বোতলের সিল কেটে লোকটার হাতে দিয়ে বলল, এক ঢোক মুখে দাও।
  লোকটা ঢকঢক করে খানিকটা স্যালাইন পান করে বোতলটা রজব আলির হাতে ফেরত দিয়ে বলল, খুব কষা। কি খাওয়ালে ভাই?
– ভালো জিনিস, কিছু হবে না। মুখে একথা বললেও রজব আলির মনে একটা সংশয় থেকেই যায়, রক্তে পুশ করার জিনিস খেয়ে না সে অন্য কোন বিপদে পড়ে।
   ধীরে ধীরে লোকটার কাশি থেমে গেল। তবে লোকটা বেশ কাহিল হয়ে পড়েছে। জোরে জোরে শ্বাস টানছে। হাপাতে হাপাতে সে কিছু বলতে গেলে রজব আলি বাধা দিয়ে বলল, কিছু বলতে হবে না তোমাকে। চুপ করে বসে থাক।
  কালভার্টের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল রজব আলি। অন্ধকারে হাতরে পলিপ্যাকটা হাতে নিয়ে দেখে নিল বোতলগুলো ঠিকঠাক আছে কি না। তারপর লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বলল, আসি ভাই। উপরবালা তোমার হেফাজত করুক।
– এ্যাই আবহে তুমার না গ্যালি হোবে না?
– যেতে আমাকে হবেই। ছোট ছেলেটা অসুস্থ, ওর জন্য ওষুধ নিয়ে যাচ্ছি।
– তালে আর বাধা দিমু না। থামল লোকটা। পরক্ষণেই বলল, একটা বিড়ি দিবা? নেশা চাগাড় দিয়ে উঠছে।
   রজব আলি পকেট থেকে দেশালাই-বিড়ির প্যাকেট বার করে অন্ধকারের মাঝে কালভার্টের ভিতর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নাও। লোকটাও আন্দাজে হাতরে তার হাত থেকে জিনিসগুলো নিল। অতঃপর দেশালাই কাঠি ঠোকার শব্দ ভেসে এল। বার দুয়েকের চেষ্টায় ফস করে জ্বলে উঠল কাঠি। দেশালাইয়ের আগুনে লোকটার মুখ দেখা গেল না, উল্টোদিকে মুখ করে বসে আগুন জ্বালিয়েছে সে। তবে কালভার্টের ভিতরটায় এক ঝলক চোখ বুলিয়ে নিতে পেরেছে রজব আলি। লক্ষ্য করেছে লোকটার বেশভূষা। পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, পাশেই একটা কাপড়ের পুটুলি রাখা আছে। সম্ভবত সে পুটুলিটাকে বালিশের মতো মাথার নিচে রেখে শুয়েছিল।
  সেও পাকা নেশাখোর, প্রায় সবসময় তার ঠোটে জ্বলন্ত বিড়ি ঝুলতে দেখা যায়। টেনশনের চোটে প্রায় ঘন্টাখানেক ধূমপান থেকে বিরত আছে। লোকটাকে বিড়ি টানতে দেখে তার নেশা চড়ে বসল। ঘাড় ঘুরিয়ে চারদিক দেখে নিয়ে ঝুপ করে কালভার্টের মুখে বসে বলল, কই হে দাও দেখি। আমিও একটা ফুঁকে নি। তারপর….
  প্যাকেট থেকে একটা বিড়ি বার করে অভ্যাসবশে বিড়ির মাথাটা মচলে নিয়ে জোরে জোরে দু’টো ফু দিল। তারপর অগ্নি সংযোগ করে পরপর কয়েকটা টান দিয়ে বলল, শালা কোথাকর কে, জান না পেহচান। ভোটে জিতে রাজা হয়ে বসবে। ওদের কথায় কেন নিজেরা লড়াই করে মরব? যার যাকে ইচ্ছা হবে ভোট দেবে। তা না….। একটু থেমে আবারও বলল, শালারা সাধারণ মানুষের কথা একটুও ভাবে না। যতসব চোর-চণ্ডাল-দাগাবাজ, এমএলএ-এমপি হয়ে দু’-হাতে দেশটাকে লুটছে। আর ভোট এলেই হিন্দু-মুসলমাল খেলা, হ্যান করেঙ্গে ত্যান করেঙ্গে আস্ফালন।
– ও ভাই চিল্লাইয়া কথা কও ক্যান। এহুনি কে শুনাইয়া ফ্যালাবে।
– শুনুক। আমি কারওকে ডরাই না। একথা বলে রজব আলি থমকাল। অন্ধকারের ঘাড় কাত করে লোকটার দিকে ফিরে বলল, তোমার দেশ কোথায় বল দেখি? কথা শুনে তো মনে হচ্ছে তুমি এদিককার মানুষ না।
– ঠিক কইয়াছো। হামি বাগরি অঞ্চলের মানুষ, লালগোলার ওদিকে ঘর।
– এদিকে কেন এসেছ?
– একদিন হামার সব আছিল, গঙ্গার ভাঙন সব ক্যাড়ি লিয়্যাছে। মাথার উপর একজোড়া সোমত্ত মাইয়া, টাকার অভাবে ওরঘো বিহ্যা দিতে পারত্যাছি না। তাই পথে ব্যাহির হোলছি….। দ্যাশের পরিস্থিতি এ্যামুন জানলে ইদিকে অ্যাসতাম না। আল্লাহ  জানে জান লিয়ে ঘরে ফিরতে পারমু কি না।
– তুমি মুসলমান!
– হ্!
– কি আছে তোমার ব্যাগে?
– ক’টা চাল। আল্লাহর কসম! লোকটার গলার স্বর কেঁপে উঠল।
  রজব আলি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, ভয় পেও না মিয়া। আমি তোমার বেরাদর, রজব আলি নাম।
– আলহামদুলিল্লাহ! স্বস্তির শ্বাস টেনে বুক ভরালো লোকটা।
– কাছেই আমাদের গ্রাম। আমার বাড়ি চলো, পরিস্থিতি শান্ত হলে পরে দেশে ফিরবে।
  ভোরের আলো ফুটতে এখনো দেরি আছে। ওরা কালভার্ট থেকে বেরিয়ে পাকা রাস্তায় উঠে এল। চারদিক শুনশান, ঝিঝি পোকার ঝাঁঝানি ছাড়া প্রাণের কোন লক্ষণ দৃষ্ট হয় না। আস্তে আস্তে পাকারাস্তা ছেড়ে মাঠ ভেঙে হাঁটতে শুরু করল ওরা। কিছুটা যেতে না যেতে পিছন থেকে বজ্র কঠিন হুংকার ভেসে এল, ফায়ার।
  পরদিন সারা দেশে খবর ছড়িয়ে পড়ল সাহেবনগরের কাছে পাকা রাস্তার কালভার্ট ওড়াতে এসে মিলিটারী জওয়ানদের হাতে নিহত দুই মুসলিম সন্ত্রাসী। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে প্রচুর গোলাবারুদ ও ডিটোনেটর।
                            ——-
   

 
  

  
  
   (ছোটগল্প/ ঈদ সংখ্যার জন্য)

মজলুম
মুহাম্মদ সেলিম রেজা

  আর মাইল তিনেক পথ ভাঙতে পারলেই গ্রামে পৌঁছাতে পারবে রজব আলি। সমস্যা হল মাঝে দু’-তিনটে হিন্দু গ্রাম আছে। এই পরিস্থিতি হিন্দু গ্রামে পা রাখা দূরের ভাবনা, পাশ দিয়ে যাওয়া মানে যেচে বিষ পান করা। মুসলিম গ্রামগুলোরও একই অবস্থা। সবাই রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিচ্ছে। তারওপর আছে পুলিশের আনাগোনা, মিলিটারী জওয়ানদের রুট মার্চ।অবশ্য ঘুর পথে যাওয়া যায়। তাতে করে তাকে দ্বিগুণের বেশী পরিশ্রম করতে হবে।
  রজব আলির চার ছেলেমেয়ে। বছর দুয়েক হল বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। মেজ মেয়েও বিবাহযোগ্যা, তার জন্য পাত্রের খোঁজ চলছে। ছেলেরা ছোট, স্কুলে পড়ে। বড় মেয়ের সন্তান হয়েছে খবর পেয়ে দু’দিন আগে নাতনিকে দেখতে এসেছিল। সেদিনই সে ফিরে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু মেয়ের ইচ্ছা বাপ আর ক’টা দিন থেকে যাক, জামাইও তাই চায়। শেষপর্যন্ত তাদের আবদার মেনে নিয়ে থেকে গিয়েছিল রজব আলি।
  মাঝরাতে বিবির ফোন করে জানায় ছোট ছেলের ডায়েরিয়া হয়েছে। স্যালাইন দিতে হবে, গ্রামের ডাক্তারের স্টকে নেই। শহর থেকে আনাবে তারও উপায় নেই, দাঙ্গা আবহে কেউ বাড়ি থেকে বেড়ুতে চাইছে না। দেরি করে না রজব আলি, জামাইয়ের বাইকে চেপে হাসপাতাল মোড়ের দোকান থেকে পাঁচটা স্যালাইনের বোতল কিনে, পলিব্যাগে ভরে নিয়ে আলপথ ধরে হাঁটতে শুরু করে। যদিও জামাই তাকে বাড়ি পযর্ন্ত বাইকে পৌঁছে দিতে চেয়েছিল। কার্ফু জারি থাকায়, পুলিশি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার ভয়ে রাজি হয়নি সে। 
   সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঝামেলার সূত্রপাত। ভোটের মরশুম। পোস্টার-ব্যানার, ফেস্টুন-পতাকা নিয়ে সব দলের ছেলেরা প্রচারে নেমে পড়েছে। সাহেবনগরের কিছু হিন্দু যুবক একটি রাজনৈতিক দলের পতাকা টাঙাতে এলে পীরপাড়ায় ছেলেরা বাধা দেয়, মুসলিম বিদ্বেষী ওই দলের পতাকা তারা গ্রামে লাগাতে দেবে না। সাহেবনগরের ছেলেরা তখন চুপচাপ চলে গেলেও পরদিন বাধাদানকারী এক যুবককে গ্রামে পেয়ে যাচ্ছেতাই হেনস্থা করে। সেই থেকে এপক্ষের লোক ফুঁসছে, ওদের যাকে পাবে তাকেই মারবে। উত্তেজনার আঁচ অনুভব করে উভয়পক্ষের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, স্থানীয় থানার ওসি ও ব্লক উন্নয়ন আধিকারিককে নিয়ে আলোচনা করে মিটমাট করে নেন। ক্রমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছিল। এমনসময় ওই দলের কিছু নেতা এসে বিদ্বেষ ভরা গরম গরম ভাষণ দিলে আগুনে ঘৃতাহুতির কাজ করে।
   পীরপাড়ার ছেলেরা কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রতিবাদ করেনি। তাদের বক্তব্য ছিল দলটি মুসলিম বিদ্বেষী, তাদের প্রচার মুসলিম গ্রামে চালাতে দেওয়া হবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্য একটি রাজনৈতিক দল, যারা ওই দলটির প্রধান প্রতিপক্ষ তারা এসে মুসলিমদের হয়ে গলা ফাটাতে শুরু করে। তাদের তালে তাল দিয়ে মুসলিমরা নাচতে শুরু করল, একবারও ভাবল না তাদের মূল অভিসন্ধি কী? পরিনামে যা হবার তাই হয়েছে। রাজনৈতিক কোন্দল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রূপে এলাকায় চেপে বসেছে। পীরপাড়ার একজন বোমায় নিহত হয়েছে, পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে অনেককে।
  রজব আলি এতক্ষণ মেঠো আলপথ ভেঙে এগোচ্ছিল। পাকা রাস্তায় উঠে ভাবনায় পড়ল। ঠিক করে উঠতে পারে না কোন পথে এগোবে। এমনসময় দূর থেকে দেখতে পেল একজোরা হেড লাইট শহরের দিক থেকে ছুটে আসছে। এতরাতে সাধারণত এই রাস্তায় বড় গাড়ি যাওয়া আসা করে না। এলাকায় কার্ফু জারি রয়েছে। হতে পারে পুলিশের গাড়ি টহল দিতে আসছে। ছ্যাত করে দুলে উঠল রজব আলির বুকের ভেতরটা, পুলিশের হাতে পড়লে শূলি-ফাঁসি না হোক, নূন্যপক্ষে তিন মাস জেলের ঘানি টানতে হবে কোন সন্দেহ নেই।
  তাড়াতাড়ি পাকা রাস্তা ছেড়ে নীচে নয়ানজুলিতে নেমে এল সে। শুখা মরসুম নয়ানজুলিতে এক ফোঁটা জল নেই, নানা জাতের আগাছায় ভরে আছে। আগাছার জঙ্গলে গুটিসুটি মেরে বসেও নিশ্চিত হতে পারল না। হেড লাইটের জোরালো আলোয় পুলিশের চোখে ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। ওই অবস্থায় ঘাড় ঘুড়িয়ে এদিক ওদিক তাকায়। গাঢ় অন্ধকারে কিছুই ঠাওর করতে পারে না।
  গাড়িটা হেড লাইটের জোরালো আলোয় অন্ধকার ফালা ফালা করে ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ততই উৎকন্ঠা বাড়ছে রজব আলির, এই বুঝি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেলাম। বউ-বাচ্চার কাছে আর পৌঁছানো গেল না। ইত্যবসরে হেড লাইটের আলোর একছটাক নয়ানজুলিতে আছড়ে পড়তে দেখতে পেল সামনে একটা কালভার্ট। সাথে সাথে গড়াগড়ি দিয়ে কালভার্টের মুখে পৌঁছে হামাগুড়ি দিয়ে ভিতরে টেনে নিল দেহটা। খানিকবাদে মাথার উপর দিয়ে সাঁ করে গাড়িটা বেরিয়ে গেল।
   চুপচাপ সেখানে কিছুক্ষণ বসে থাকে রজব আলি। একবার ভাবে রাতটুকু এখানে অতিবাহিত করে ভোরের আলো ফোটার আগে রওনা দেবে গ্রামের উদ্দেশ্যে। তৎক্ষণাৎ ছেলের যন্ত্রণা ক্লিষ্ট মুখখানা তার মানসপটে ভেসে ওঠে। বোতল বন্দি ক’ফোঁটা পানির অভাবে ছেলেটা আমার মরে যাবে। বাপ হয়ে সে তা সহ্য করে কী করে? যাবতীয় ডর-ভয় ঝেড়ে ফেলে উঠে আসতে চাইল সে। আর তা করতে গিয়ে অসাবধানতায় বাম হাতখানা পিছলে গিয়ে নরম কিছুতে ঠেকল। বিদ্যুৎ গতিতে কালভার্টের ভিতর থেকে ছিটকে বাইরে চলে এল সে।
   কী হতে পারে ওটা? ছোঁয়া লাগতেই মনে হল যেন গুটিয়ে গেল! না, আলো জ্বালিয়ে দেখতেই হচ্ছে। রজব আলি পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেশালাই বার করতে উদ্যত হল। ঠিক তখনই ভিতর থেকে খুক খুক করে কাশির আওয়াজ ভেসে এল। পরিস্কার মানুষের গলার স্বর। কে ও! কেন এখানে সে? পরক্ষণে তার মনে হল, তার মতো ভাগ্য বিড়ম্বিত কেউ প্রাণের দায়ে লুকিয়ে আছে নিশ্চয়।
  লোকটা কোন জাতের, হিন্দু না মুসলিম? প্রশ্নটা চাগার দিয়ে উঠল রজব আলির মাথায়। পরক্ষণে ভাবল, জাত যাই হোক সেও একটা মানুষ। তাতে আমাতে তফাৎ কোথায়? সেও প্রাণ ভয়ে লুকিয়ে আছে, আমিও তাই। দু’জনেই এক ডালের পাখি।
– কে? কে তুমি? ফিসফিস করে ডাকল রজব আলি।
  ওদিক থেকে কোন উত্তর এল না। আবার ডাকল, এবারেও সে কোন কথা বলে না। তৃতীয়বারে রজব আলি বলল, এবার কথা না বললে পাথর মেরে তোমার মাথা ভেঙে দেব।
– আগে বল তুমি কোন জাতের, হিন্দু না মুসলিম? মিউমিউ করে বলল ভিতরের লোকটা।
– তুমি যেমন প্রাণ ভয়ে ভীত হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছ, আমিও তাই। আমাদের জাত একটাই, আমরা মজলুম।
  এরপর নিশ্ছিদ্র নিরবতা, কেউ কোন কথা বলে না। খানিকবাদে লোকটা পুনরায় খুক খুক করে কাশতে শুরু করল। একসময় কাশতে কাশতে তার দম বন্ধ হবার উপক্রম হল। রজব আলি হাতের পলিপ্যাকটা ফেলে রেখে হাঁটু গেড়ে বসে লোকটার পিঠে হাত বোলাতে লাগল। – জল আছে তোমার কাছে? একটু মুখে দাও।
লোকটা জানায় তার কাছে জল নেই। তখন রজব আলি হাত বাড়িয়ে পলিপ্যাক থেকে স্যালাইনের একটা বোতল টেনে নিল। তারপর বোতলের সিল কেটে লোকটার হাতে দিয়ে বলল, এক ঢোক মুখে দাও।
  লোকটা ঢকঢক করে খানিকটা স্যালাইন পান করে বোতলটা রজব আলির হাতে ফেরত দিয়ে বলল, খুব কষা। কি খাওয়ালে ভাই?
– ভালো জিনিস, কিছু হবে না। মুখে একথা বললেও রজব আলির মনে একটা সংশয় থেকেই যায়, রক্তে পুশ করার জিনিস খেয়ে না সে অন্য কোন বিপদে পড়ে।
   ধীরে ধীরে লোকটার কাশি থেমে গেল। তবে লোকটা বেশ কাহিল হয়ে পড়েছে। জোরে জোরে শ্বাস টানছে। হাপাতে হাপাতে সে কিছু বলতে গেলে রজব আলি বাধা দিয়ে বলল, কিছু বলতে হবে না তোমাকে। চুপ করে বসে থাক।
  কালভার্টের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল রজব আলি। অন্ধকারে হাতরে পলিপ্যাকটা হাতে নিয়ে দেখে নিল বোতলগুলো ঠিকঠাক আছে কি না। তারপর লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বলল, আসি ভাই। উপরবালা তোমার হেফাজত করুক।
– এ্যাই আবহে তুমার না গ্যালি হোবে না?
– যেতে আমাকে হবেই। ছোট ছেলেটা অসুস্থ, ওর জন্য ওষুধ নিয়ে যাচ্ছি।
– তালে আর বাধা দিমু না। থামল লোকটা। পরক্ষণেই বলল, একটা বিড়ি দিবা? নেশা চাগাড় দিয়ে উঠছে।
   রজব আলি পকেট থেকে দেশালাই-বিড়ির প্যাকেট বার করে অন্ধকারের মাঝে কালভার্টের ভিতর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নাও। লোকটাও আন্দাজে হাতরে তার হাত থেকে জিনিসগুলো নিল। অতঃপর দেশালাই কাঠি ঠোকার শব্দ ভেসে এল। বার দুয়েকের চেষ্টায় ফস করে জ্বলে উঠল কাঠি। দেশালাইয়ের আগুনে লোকটার মুখ দেখা গেল না, উল্টোদিকে মুখ করে বসে আগুন জ্বালিয়েছে সে। তবে কালভার্টের ভিতরটায় এক ঝলক চোখ বুলিয়ে নিতে পেরেছে রজব আলি। লক্ষ্য করেছে লোকটার বেশভূষা। পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, পাশেই একটা কাপড়ের পুটুলি রাখা আছে। সম্ভবত সে পুটুলিটাকে বালিশের মতো মাথার নিচে রেখে শুয়েছিল।
  সেও পাকা নেশাখোর, প্রায় সবসময় তার ঠোটে জ্বলন্ত বিড়ি ঝুলতে দেখা যায়। টেনশনের চোটে প্রায় ঘন্টাখানেক ধূমপান থেকে বিরত আছে। লোকটাকে বিড়ি টানতে দেখে তার নেশা চড়ে বসল। ঘাড় ঘুরিয়ে চারদিক দেখে নিয়ে ঝুপ করে কালভার্টের মুখে বসে বলল, কই হে দাও দেখি। আমিও একটা ফুঁকে নি। তারপর….
  প্যাকেট থেকে একটা বিড়ি বার করে অভ্যাসবশে বিড়ির মাথাটা মচলে নিয়ে জোরে জোরে দু’টো ফু দিল। তারপর অগ্নি সংযোগ করে পরপর কয়েকটা টান দিয়ে বলল, শালা কোথাকর কে, জান না পেহচান। ভোটে জিতে রাজা হয়ে বসবে। ওদের কথায় কেন নিজেরা লড়াই করে মরব? যার যাকে ইচ্ছা হবে ভোট দেবে। তা না….। একটু থেমে আবারও বলল, শালারা সাধারণ মানুষের কথা একটুও ভাবে না। যতসব চোর-চণ্ডাল-দাগাবাজ, এমএলএ-এমপি হয়ে দু’-হাতে দেশটাকে লুটছে। আর ভোট এলেই হিন্দু-মুসলমাল খেলা, হ্যান করেঙ্গে ত্যান করেঙ্গে আস্ফালন।
– ও ভাই চিল্লাইয়া কথা কও ক্যান। এহুনি কে শুনাইয়া ফ্যালাবে।
– শুনুক। আমি কারওকে ডরাই না। একথা বলে রজব আলি থমকাল। অন্ধকারের ঘাড় কাত করে লোকটার দিকে ফিরে বলল, তোমার দেশ কোথায় বল দেখি? কথা শুনে তো মনে হচ্ছে তুমি এদিককার মানুষ না।
– ঠিক কইয়াছো। হামি বাগরি অঞ্চলের মানুষ, লালগোলার ওদিকে ঘর।
– এদিকে কেন এসেছ?
– একদিন হামার সব আছিল, গঙ্গার ভাঙন সব ক্যাড়ি লিয়্যাছে। মাথার উপর একজোড়া সোমত্ত মাইয়া, টাকার অভাবে ওরঘো বিহ্যা দিতে পারত্যাছি না। তাই পথে ব্যাহির হোলছি….। দ্যাশের পরিস্থিতি এ্যামুন জানলে ইদিকে অ্যাসতাম না। আল্লাহ  জানে জান লিয়ে ঘরে ফিরতে পারমু কি না।
– তুমি মুসলমান!
– হ্!
– কি আছে তোমার ব্যাগে?
– ক’টা চাল। আল্লাহর কসম! লোকটার গলার স্বর কেঁপে উঠল।
  রজব আলি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, ভয় পেও না মিয়া। আমি তোমার বেরাদর, রজব আলি নাম।
– আলহামদুলিল্লাহ! স্বস্তির শ্বাস টেনে বুক ভরালো লোকটা।
– কাছেই আমাদের গ্রাম। আমার বাড়ি চলো, পরিস্থিতি শান্ত হলে পরে দেশে ফিরবে।
  ভোরের আলো ফুটতে এখনো দেরি আছে। ওরা কালভার্ট থেকে বেরিয়ে পাকা রাস্তায় উঠে এল। চারদিক শুনশান, ঝিঝি পোকার ঝাঁঝানি ছাড়া প্রাণের কোন লক্ষণ দৃষ্ট হয় না। আস্তে আস্তে পাকারাস্তা ছেড়ে মাঠ ভেঙে হাঁটতে শুরু করল ওরা। কিছুটা যেতে না যেতে পিছন থেকে বজ্র কঠিন হুংকার ভেসে এল, ফায়ার।
  পরদিন সারা দেশে খবর ছড়িয়ে পড়ল সাহেবনগরের কাছে পাকা রাস্তার কালভার্ট ওড়াতে এসে মিলিটারী জওয়ানদের হাতে নিহত দুই মুসলিম সন্ত্রাসী। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে প্রচুর গোলাবারুদ ও ডিটোনেটর।
                            ——-
   

 
  

  
  
  
  

  

  

  

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *