Md Selim Reza

 4 total views

গল্প কেন অল্প হবে
মুহাম্মদ সেলিম  রেজা

মানবচরিত্র বেজায় জটিল ও বিচিত্র। প্রত‍্যেকের নিজস্ব স্বকীয়তা বর্তমান, যা দিয়ে একজনের থেকে আরেক জনকে আলাদাভাবে চেনা যায়। কেউ সাহিত‍্যক্ষেত্রে উজ্জ্বল তো কেউ নাচ-গান-অভিনয়ে বিশেষ পারঙ্গম। কেউ কেউ সফল ব‍্যবসায়ী তো অনেকে চাষবাস, শিক্ষকতা, ওকালতি, চিকিৎসা ইত্যাদি নানা পেশায় প্রতিষ্ঠিত। মজার বিষয় বিভিন্ন পেশার মানুষের মাঝে একটি কমন গুণ পরিলক্ষিত হয়। আর তা হল নিজেকে জাহির করার প্রবণতা।
আমাদের কাছেপিঠে এমন কিছু মানুষ আছে তাঁরা অন‍্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে এমন সব কাণ্ড করে অথবা এমন কথা বলে দেখেশুনে ছাগলেও হাসে। এই যেমন গতপরশু স্কুল লাইফের একবন্ধুর সাথে দেখা হল। অনেকদিন পর দেখা। একটু ভালোমন্দ কথা হবে তা নয় দেখামাত্র সে বলে বসল, ক’দিন থেকে খুব ব‍্যস্ত আছি জান। এ ব‍্যাঙ্ক সে ব‍্যাঙ্ক করে হাঁপিয়ে উঠেছি। আর পারছি না।
আজকাল ব‍্যাঙ্কে খাতা খোলার হ‍্যাপা অনেক। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প‍্যান কার্ড কত কিনা দাখিল করতে হয়। তারওপর আছে বানান ভুলের গেড়ো! ভোটার কার্ডের শ‍্যামলাল আধার কার্ডে কমলাল হয়ে প‍্যান কার্ডে গিয়ে ফিকেলাল হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা হামেশায় ঘটে থাকে। সে রকম কোন ভ্রান্তি না থাকলে বুঝতে হবে আপনি কপাল করে জন্মেছেন। তারপরেও আপনার কাজ সহজে হয়ে যাবে এমনটা ভাবলে কিন্তু ভুল করবেন। কারণ আপনার কাজ হওয়া সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করছে ব‍্যাঙ্কবাবুদের মেজাজ মর্জির ওপর। তিনারা খোসমেজাজে থাকলে ভালো, অন‍্যথায় কি ভোগান্তি না ভুগতে হয় একমাত্র ভুক্তভুগিই তা জানে।
ভেবেছিলাম ছেলেটিও হয়তো সে রকম কোন সমস‍্যায় পড়েছে। কিন্তু আমার অনুমান ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সে উচ্চকন্ঠে বলল, আরে না না! এলাকার সব ব‍্যাঙ্কে আমার খাতা আছে। সমস‍্যা দেখা দিয়েছে টাকা নিয়ে। এত টাকা নিয়ে কী করব ভেবে পাচ্ছি না। ছ’টা ব‍্যাঙ্কে একলাখ করে রেখে এলাম। পকেটে এখনও লাখ দুয়েক আছে।
যাদের সত‍্যি সত‍্যি টাকা থাকে তারা কী এইভাবে বলে বেড়ায়? টাটা-বিড়লা-আম্বানী-গোয়েঙ্কারা টাকা রাখার সমস‍্যায় ভুগছেন এমন খবর শুনেছেন কখনও? আমি কিন্তু শুনেছি। তখন আমি কলেজ ছাত্র। কোন কাজে রঘুনাথগঞ্জ গিয়েছিলাম। ফেরার সময় বাসের উপর গ্রামের এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা। তিনি আবার স্কুল শিক্ষক। দেখামাত্র চিৎকার করে বললেন, ওহে শুনেছো আমার জামাইয়ের টাকা আর ব‍্যাঙ্কে নিচ্ছে না।
ভদ্রতার খাতিরে সাড়া দিতে হল, কেন নিচ্ছে না?
– ব‍্যাঙ্ক বলছে অনেক টাকা জমা হয়ে গেছে, আর নেওয়া যাবে না।
এ কথা শুনে বাসের সব যাত্রী একযোগে চমকে উঠে তাঁর দিকে তাকাল। আমি তখন হতভাগা বিল গেটসের কথা মনে করে কষ্ট পাচ্ছিলাম, সাহেবের কী দূর্ভাগ‍্য কোন ব‍্যাঙ্ক আজ পযর্ন্ত তাঁকে জবাব দিল না। অথচ….
এই অবসরে সেই শিক্ষকের আর একটি অমর কীর্তি জেনে নেওয়া যাক। গত শতাব্দীর আটের দশকের ঘটনা। সে বছর তাঁর একমাত্র কন‍্যা মাধ‍্যমিক পরীক্ষায় বসেছিল। মেয়েটি লেখা পড়ায় খুব একটা চৌকস ছিল না, বিশেষ করে অঙ্কে ছিল ভীষণ দূর্বল। তাই তিনি অঙ্ক পরীক্ষার দিন একজন বিশেষজ্ঞ সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। দূর্ভাগ‍্যক্রমে সেদিন প্রশাসন খুব কড়াকড়ি শুরু করায় বিশেষজ্ঞের করে দেওয়া চোথা কিছুতেই মেয়েটির কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এমতাবস্থায় কিছু নগদের বিনিময়ে ডিউটিরত এক কনস্টেবলকে ম‍্যানেজ করা হল। তাঁর হাতে একগাদা চোথা ধরিয়ে দিয়ে শিক্ষকমশাই বললেন, পরীক্ষার হলে যে মেয়েটি দেখতে সবচেয়ে সুন্দর তাকে দেবেন।
পরীক্ষা শেষে জিজ্ঞাসা করা হলে মেয়েটি জানাল, পুলিশবাবু তাকে নয় অন‍্য একটি মেয়েকে চোথা দিয়েছে। একথা শুনে শিক্ষকমশাই রাগ আর ধরে না। দৌড়ে গিয়ে সেই কনস্টেবলকে প্রায় টানতে টানতে মেয়ের কাছে এনে বললেন, কাগজটা এই মেয়েটিকে দিতে বলেছিলাম। আপনি কাকে দিয়েছেন?
পুলিশবাবু স্মিত হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, তাতো বলেননি আপনি। বলেছিলেন হলের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটিকে দিতে। আমার চোখে যাকে সুন্দর লেগেছে তাকেই দিয়েছি।
এক বন্ধুর শ্বশুরমশাই মারা গেছেন। কাফন-দাফন হয়ে যাবার পর দূরবর্তী অতিথিদের খেতে দেওয়া হয়েছে। একে দুঃসময়, তারওপর গরীব পরিবার। কোনরকমে চাট্টি মাছ-ভাতের আয়োজন করা হয়েছে। আমার পাশে বসেছিল এক তরুণ। তাকে এক পিস মাছ দিতে গেলে সে প্রায় চিৎকার করে ওঠে, ছি ছি! এই মাছ আমি খাই না। কাতলা মাছের পেটি থাকলে দাও।
তার কথা শুনে পরিবেশনকারী লোক কিছুক্ষণের জন‍্য থমকে দাঁড়ালেন। অতঃপর তাকে মাছ না দিয়ে পরের জন থেকে দেওয়া শুরু করলেন। সে তখন সে সমানে চিৎকার করে চলেছে, আমাকে মাছ দিলে না। আমি ভাত খাব কী দিয়ে?
এই বলে সে তাদের কতগুলো পুকুর আছে। পুকুরে কতো বড় বড় আছে। সেই মাছের পেটির সাইজ কেমন হয়, ইত্যাদি নানা বৃতান্ত বকতে লাগল।
ওর কথা শুনে অনেকে হাসাহাসি করছিল, কেউ কেউ বিরক্তবোধ করছিল। একজন তো রেগে গিয়ে বলে বসলেন, ওহে ছোকরা তুমি নজর আলির নাতি না? তোমার সাত গুষ্ঠির খবর আমার কাছে আছে। চুপ করবে না হাটে হাড়ি ভাঙব?
মোক্ষম প্রতিশেধক। যুবক লাথ খাওয়া কুকুরের মতো কুঁইকুঁই করতে করতে আসর ছেড়ে পলায়ন করল।
এক ভদ্রলোক কলকাতা গেছেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী দূরসম্পর্কীয় ভাইপোর সাথে দেখা করতে। ভাইপো জানে চাচার অতিরিক্ত কথা বলার অভ‍্যেস আছে, তাই সে আগেভাগে চাচাকে বলে দিয়েছিল সবার সাথে সব বিষয়ে কথা বলতে যাবেন না। কিন্তু চোর না শোনে ধর্ম কথা! ওয়েটিং রুমে একজনকে প্রবেশ করতে দেখে চাচা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। নিজেকে অফিসারের আপন চাচা পরিচয় দিয়ে আলাপ জমাতে শুরু করলেন। বিষয়টি এখানেই শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু ওই যে কথা বলার রোগ, নিজেকে জাহির করার বাতিক। চাচাজান ঢাক পিটিয়ে ফলাও করে অফিসার ভাইপোর পারিবারিক ইতিবৃত্ত বর্ণনা করতে লাগলেন। ভাইপোরা চার ভাইবোন। বড়ভাই হাই স্কুলের শিক্ষক,  এ মেজো, ছোট আইআরএস। একমাত্র বোনটি হোমিও ডাক্তার, পাশ করা। ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি।
ভাতিজা নিজের চেম্বার থেকে সব শুনতে পাচ্ছিল। ভদ্রলোক কাজ সেরে বেরিয়ে যেতে সে চাচাকে চেপে ধরল, আপনাকে না চুপ থাকতে বলেছিলাম? জানেন ওই লোকটা কে? ওনার এক দাদা ক‍্যাবিনেট মিনিস্টার, আর এক দাদা রাজ‍্য বিধানসভার এমএলএ। তিনি নিজে রেলওয়ে কন্ট্রাক্টর। বছরে কয়েক কোটি টাকা ইনকাম করেন।
একটি ছেলে বন্ধু মহলে প্রচার করে সে হাইফাই ঘরের ছেলে। মাঠে তাদের একশ বিঘার মতো চাষজমি আছে। বিশ-বাইশটি বড় বড় পুকুর আছে। আর আছে তেলমিলের ব‍্যবসা। একদিন তার কিছু বন্ধু বাড়ি আসার আগ্রহ প্রকাশ করলে সে বলল, বাস স্ট‍্যাণ্ডে নেমে আমার নাম করবি যে কেউ বাড়ি চিনিয়ে দেবে।
সত‍্যি সত‍্যি একদিন তার বন্ধুরা বাস স্ট‍্যাণ্ডে এসে নামল। যাকে তাকে জিজ্ঞাসা না করে তারা সরাসরি বাস স্ট‍্যাণ্ড লাগোয়া তেলমিলে গিয়ে হাজির হল। কারণ সে বলে রেখেছিল তেলমিলটা তাদের।
সব শুনে মিল মালিক বললেন, ওই নামে গ্রামে একাধিক ছেলে আছে। ঠিক কাকে চাইছ তোমরা?
একজন বলল, সে বলে এই মিলটা তাদের। আর বাস স্ট‍্যাণ্ড থেকে বাড়ি পযর্ন্ত রাস্তার দুই দিকে যত জমি আছে সব তাদের।
ছেলেগুলোকে অপেক্ষা করতে বলে মিল মালিক ভিভরে গিয়ে ক‍্যাশবাক্স গুছিয়ে রেখে ফিরে এসে সকলকে নিয়ে ভ‍্যান রিক্সায় চড়ে বাড়িতে এলেন। সাধ‍্য মতো তাদের আপ‍্যায়ন করে খাওয়াদাওয়া করালেন। তারপর সেই ছেলেটিকে ডেকে এনে আড়াল থেকে বন্ধুদের দেখিয়ে বললেন, এদের আসতে বলে কোথায় লুকিয়ে ছিলি?
ছেলেটি সব বুঝতে পেরে মিল মালিকের পায়ে হুমরি খেয়ে পড়ল। – মাফ করে দিন চাচা। এমন ভুল আর কোনদিন হবে না।
এই শ্রেণির মানুষ ভুল থেকে শিক্ষা নিতে জানে না। জীবনভর ভুল করে যায় আর পদে পদে অপদস্থ হয়। আসলে অনৈতিক ভাবে নিজেকে জাহির করা একপ্রকার মানসিক রোগ। একবার যে এই রোগে আক্রান্ত হয়, শত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ‍্য করেও আমৃত‍্যু তা বহন করে চলে।
——-

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *