Md. Tofayel Ahmed

 141 total views

কল্পনা
মোঃ তোফায়েল আহমেদ

হেমন্তের শেষাশেষি,এই সময়টি যেন কেমন! অকারনেই মনের মধ্যে এক চাপা আক্ষেপ জেগে ওঠে।মনের ভেতরটা খা খা করে আর শুধু শুধু ফুঁপিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। এরূপ ঘটনা আমার জন্য নতুন না, তবুও প্রতিবছরই এই সময়টি আসলে কেনো জানি আনমনা হয়ে পরি।ভেবেছিলাম,দুপুরে একটু ঘুমাবো,ঘুমানো আর হলো কোই? পাশের বিল্ডিঙে কন্সট্রাকশনের কাজ চলছে,বিদঘুটে আর তুলনামূলক অসহ্য শব্দে প্রায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। তারপরেও হাতে একটি বই নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে বসেছি,চেষ্টা করছি একটু পড়ার।বইয়ের পাতায় আমার চোখ প্রায় ঘন্টা দুয়েক থেকে স্থির আছে,অথচ একটি শব্দও আমার আয়ত্তে আসেনি! কারণ,মাথার ভেতর চলছে অন্যকিছু,চোখের সামনে ভেসে উঠছে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার প্রতিচ্ছবি। নাহ!পড়া আমার আর হলো না! হুমায়ুন আহমেদের লেখা এই বইটি খুব শখ করে কিনেছিলাম,কিন্তু শখের দিকে তাকাতেও আমার মন চাইছে না।
দুপুর গড়িয়ে এখন বিকেল।আমার শূন্য মন আজ ঘরে থাকতে চাইছে না।স্বভাবতই মানুষ মনের প্রতি দুর্বল,আমি একটু বেশিই দুর্বল। মনের খাতিরেই বাইরে বের হলাম।
বিকেলের এই সময়টিতে প্রকৃতি খুবই অদ্ভুত দেখায়। অস্তমান সূর্যের সোনালী হলুদ আলো এসে যখন প্রকৃতির কোলে লুটিয়ে পড়ে তখন প্রকৃতির সেই বিচিত্র রূপ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়।অত শত সৌন্দর্যের মধ্যে আমার চোখ স্থির হলো অন্যদিকে।খানিক দূরেই অল্প বয়সী এক কিশোরী আমার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ের আছে।তার শরীরে কি রঙের পোশাক ছিলো,সেদিকে আমার খেয়াল নেই। অস্তমান সূর্যের স্নিগ্ধ সোনালী আভা তার মুখে এসে পড়ছিলো।যেন ম্লান হয়ে আছে তার মুখখানি। মুখের গড়নে একটি স্থির স্থির ভাব থাকলেও চোখ দুটি তার চঞ্চল,আর এই চঞ্চল চোখ দুটিতেই তার সমস্ত সৌন্দর্য কেন্দ্রীভূত।অল্পবয়সী কিশোরীর অকৃত্রিম সৌন্দর্যে প্রায় মুগ্ধ হয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম।সে এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে,চুপচাপ! তার মধ্যে একরকম আবেদনময়ী ভাব রয়েছে যা আমাকে টানছে। সেকি ওখানে দাঁড়িয়ে কেবল আমার জন্যেই অপেক্ষা করছে? নাকি ব্যাপারটি অন্যরকম?
সে যাই হোক,তার কাছে পৌঁছে আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না! অজানা,অচেনা এই কিশোরীকে বলেই ফেল্লাম,
-তোমার নাম?
-আমার নাম? আফনে জাইনা কি কৈরবেন?
মেয়েটির বয়স দেখে মনেহচ্ছে এতদিনে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করবার কথা। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পাশ মেয়ে আর যেমনই হোক তার কথায় নিশ্চই এতটা আঞ্চলিকতা থাকবে না!
-আমি জেনে কিছু করবো না! তোমাকে ভালো লেগেছে তাই তোমার নামটি জানতে চাচ্ছি।
-কিহ? আমারে ভালা লাগতাসে? আফনে কইলে তাই ই। আপনেরে হামি রোইজি দেহি, হেই রাস্তাতই তো হাটবার আহেন।
-তাই নাকি? প্রতিদিনই দেখ? আমি হয়তো খেয়াল করিনি!
-আফনে থাহেন কনে?
-আমি থাকি শহরে,গ্রামের দিকে হাঁটতে আসি। আসলে যেমন বয়স বেড়েছে তেমনি বেড়েছে রক্তে চিনির পরিমান।
-ওহ! আইচ্ছা। চলেন আইজ হামিও আফনের লগে হাটমু।
-তুমি হাঁটবে? ঠিক আছে চলো। কোন দিকে যাবে?
-ওই দিকটাই চলেন,ওই দিকে আমার ভালা লাগে।
দূর থেকে এই কিশোরীর মুখটি যেমন ম্লান দেখেছিলাম, কাছে এসে দেখি এতো সেই অপরূপ সুন্দরী মেয়ে,যাকে কল্পনা করেই হয়তো কবি সাহিত্যিকেরা এত প্রেমের গান লিখেছেন।
গ্রামের মধ্য দিয়ে চিকন এক রাস্তা,এতই চিকন যে দুটো রিক্সা পাশাপাশি চলতে পারবে না! এতক্ষন দুজনে নিরবই ছিলাম,মেয়েটি এবার কথা বললো…
-চলেন এইহানে বসি।
-এখানে বসবে? চলো বসি।সাপ-খোপের উপদ্রব নেই তো?
-নাহ! এহানে আফনের কিছুই হইবো না।
-তাই নাকি? আচ্ছা,তোমার নাম তো এখনো বললে না!
-আমার নাম? শুনতেই হইবো?
আমি একটু রসিকতা করেই বললাম,–হ, শুনতেই হইবো!
এরপর মেয়েটি কি যেন বলতে লাগলো,আমি তার কথা কিছুই শুনছি না!আমার চেতনা লোপ পেয়েছে তার উলঙ্গ স্কন্ধের চিকচিকে ঘামের দিকে তাকিয়ে।অপরূপ সুন্দরী এই মেয়েটি অনর্গল আমার সাথে কথা বলেই যাচ্ছে। তার ঠোঁটের কোনে যেন লুকিয়ে আছে একপ্রকার রহস্যময়ী চাপা হাঁসি। চেহারায় একটু আগেই একটা স্থির স্থির ভাব দেখেছিলাম,কিন্তু এখন সে ভাব আর নেই,আছে কেবল চঞ্চলতা।
তার এই চঞ্চলতা আমাকে যে মুগ্ধ করেছে তাইই নয়, রীতিমতো তার প্রতি দুর্বলও হয়ে পড়েছি।
দূর্বলতা বশে তাকে বলেই ফেললাম,
–তোমার বিয়ে হয়েছে?
–হ..হইসে কাম। হেই কথা আফনেও জিগাইতেছেন?
–আমিও জিগাইতেছি মানে?
–মানে সারা গিরাম আমারে এহন এই এগডায় প্রশ্ন করতাসে।
–কেনো?
–শহরের সব বড় বড় সাহেবেরা আইসিলো হামার বাপের কাছে বিয়ার প্রস্তাব লিয়া, হামিই রাজি হই নাই।
–বড় বড় সাহেবেরা এসেছিল অথচ রাজি হওনি, কেন?
–কি আর কমু কহেন, সব কয়টা হইতাসে একেকডা বিড়ি খোর, মদ খোর,গাঞ্জা খোর…
–আচ্ছা থামো থামো, মদ-গাঁজা ভিন্ন কথা কিন্তু বিড়িতে তোমার আপত্তি কেনো?
–বিড়ি খাওয়া মাইনসেক হামার সহ্যই হয় না, হামার দু চোখের বিষ।
–দু চোখের বিষ? তুমি কি জানো, বিড়ি বা সিগারেট খেলেই যে সে খারাপ হবে এ কথা ভুল?
–কিন্তু বেশিরভাগ খারাপ লোকেরাই তো হেইডা খায়।
–তাই নাকি?
–হ, মুই লেখা পড়া করি নাই,তার উপর গরিব ঘরের মাইয়া। বিয়ার পর এক পুরুষ মাইনসের ঘরে আমার যাইয়া ওঠোন লাগবো,তার গায়ে গা এলাইয়া ঘুমান লাগবো।এমনেই পুরুষ মাইনসের গায়েত গন্ধ থাহে,তার উপর বিড়ির বিচ্ছিরি গন্ধে হামার গা গুলিয়ে উঠবো।হামি হেইসব বিড়ি খোড়ের লগে ঘর বাঁধতে পারুম না।
–ওহ,বুঝেছি।
আমি একটু অন্যদিকে তাঁকিয়ে ছিলাম,এবার পাশফিরে তাকাতেই দেখি মেয়েটি আর আমার পাশে বসে নেই,দাঁড়িয়ে গেছে। তার চোখে এবার আর মায়া নেই আছে কেবল ভৎসর্ণা। আমিও উঠে দাড়ালাম।সঙ্গে সঙ্গে সে জিজ্ঞেস করলো–
–আফনেও সিগারেট খান, তাই না?
–আমি? হ্যা খাই,প্রতিদিনই খাই।
–আমি…আমি সিগারেট খাওয়া লোকদের দেখতে পারি না।আমার অগরোক সহ্যই হয় না। আফনেও খান? আফনেও?
–আহা,তুমি এত বিব্রত হোচ্ছ কেনো? আমি তো খারাপ কিছু করিনি?
–নাহ, হেইডা সত্য যে আফনে খারাপ কিছু করেন নাই।কিন্তু হামি আফনেরে আর সহ্য করতে পারতেসি না।
মেয়েটি এইবার দৌড়াতে লাগলো। আমিও তার পেছনে প্রথমে দ্রুত হাঁটতে লাগলাম, কিন্তু হেটে পারলাম না তাই আবার দৌড়াতে লাগলাম। এই অপরূপ সুন্দরী মেয়েটি আমাকে এভাবে ভৎসর্ণা করে চলে গেলো? কি এমন অন্যায় আমার?
–আরে! আরে দাঁড়াও তো!
সে কোনো কথা বলছে না। পেছনে ঘুরেও তাকাচ্ছে না। শুধুই দৌড়াচ্ছে।
–তোমার নামটিও তো বললে না! তোমার নাম কি? নামকি তোমার? এই মেয়ে,এই মেয়ে তোমার নাম কি?
এবার সে থেমে গেলো,সঙ্গে সঙ্গে আমার পা দুটিও থেমে গেলো। সে পেছনে ঘুরে তাকাতেই আমি আবিষ্কার করলাম,তার মুখ ভরা হাঁসি। মনে হচ্ছে সে জিতে গেছে,আর এই হাঁসি হলো তার জয়ের হাঁসি, এক প্রকার তৃপ্তির হাঁসি।
সে বললো,—আমার নাম হুনবেন?
একটু ব্যাঙ্গ করেই বললাম ,—হ, হুনবো।
তার মুখের হাঁসিটি এবার আরো বড় হয়ে গেলো,আমি তার হাঁসি দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সে আবার পেছনে ফিরে দৌড়াতে লাগলো,আর বলতে লাগলো….
–আমার নাম কল্পনা….আমি কল্পনা….আমি কল্পনা…হা…হা…হা…
–স্যার! স্যার!
–আহ, কি হয়েছে?
মুখে একটা তাচ্ছিল্যের হাঁসি নিয়ে আমার গৃহকর্মী বজলু বললো,–স্যার,আপনার চা। বসে বসেই ঘুমিয়ে গেছিলেন নাকি?
মনের অজান্তেই হাতে থাকা আধ পোড়া সিগারেটটি ছুড়ে ফেলে দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম,কেবল সাড়ে তিনটে বাজে।এখনো আমার হাঁটতে যাবার সময় হয় নি।

1 thought on “Md. Tofayel Ahmed”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *