মহালয়া, বীন্দ্রকৃষ্ণ ও উত্তম কুমার (1)

Pulak Mondal

 198 total views

মহালয়া, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ও উত্তম কুমার
————————————-
পুলক মন্ডল
————————-
মহালয়ার ভোরে আমবাঙালীর ঘুম ভাঙে রেডিও-য় শাখেঁর ধ্বনি, তবলার বোল, সঙ্গীতের মূর্ছনা আর জলদগম্ভীর কন্ঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠে। যদিও আমরা জানি, মহালয়া একটা তিথি এবং পিতৃপক্ষের শেষ ও দেবীপক্ষের শুরু। কিন্তু আপামর বাঙালি ভারতের বেতার ইতিহাসে দীর্ঘতমকাল ধরে সম্প্রচারিত এই স্থায়ী অনুষ্ঠানকে ‘মহালয়া’ বলে উল্লেখ করেন। …… “আশ্বিনের শারদপ্রাতে……” রেডিও থেকে ভেসে আসা বীরেন্দ্র-কন্ঠে যেন ঝরে পড়ে ভরা-শিউলি, বাতাসে দোলা দেয় কাশের দল, যেন রেডিও-র ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ধুপ-ধুনোর গন্ধে ছড়িয়ে পড়ে পূজো-পূজো মাদকতা——–
১৯৩২-এ তিন বেতার-পুরুষ বানীকুমারের স্ক্রিপ্ট, পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গীত এবং বীরেন্দ্রর ভাষ‍্যপাঠে যে ইতিহাস তৈরি হয়েছিল তা আজও বাঙালি সংস্কৃতি। ১৯৬৫ অবধি চলেছিল সরাসরি সম্প্রচার, ৬৬ থেকে আগে রেকর্ডিং করে রাখা হতো। এই অনুষ্ঠানের নাম ‘মহিসাষুরমর্দিনী’। ৪৪ বছর পর ১৯৭৬-এ আকাশবানী কতৃপক্ষ স্থির করলেন পরিবর্তন আনবেন। সংবাদপত্রে লেখালেখি হতে থাকলো বীরেন্দ্রকৃষ্ণ একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছেন। নতুন স্ক্রিপ্ট লিখলেন ধ‍্যানেশনারায়ন চক্রবর্তী, সহায়তা করলেন সংস্কৃতের অধ‍্যাপক ডঃ গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ‍্যায়। নাম দেওয়া হলো ‘দেবী দূর্গতিহারিনী’। সঙ্গীতে হেমন্ত-লতা-আশা- মান্না-আরতি-সন্ধ‍্যা। এবং……এবং চন্ডীপাঠে বাঙালি হৃদয়ের চিরপ্রেমিক-পুরুষ উত্তম কুমার।
প্রথমে উত্তম আপত্তি করেছিলেন। তাঁর দ্বিধা ছিল। তিনি জানতেন মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ মিথ হয়ে উঠেছেন। তাই দেখা করলেন বীরেন্দ্রর সাথে, অনুমতি চাইলেন। বীরেন্দ্র সম্মতি দিলে উত্তম বাড়িতে সংস্কৃত শিক্ষক রাখলেন শুদ্ধ উচ্চারণের জন্য।
উত্তমের কথা বলার ভঙ্গিমা আর চাহনিতে আট থেকে আশির বাঙালি বুদঁ হয়ে থাকলেও মহালয়ার চন্ডীপাঠে তাঁকে শুন‍্যহাতে ফেরাল বাঙালি। বাঙালি উত্তমের গলায় মন্ত্রোচ্চারণ শুনেছে ঠিকই কিন্তু তাতে পূজোর আমেজ খুুঁজে পায়নি। ঝড় উঠে গেল পূর্ব-পশ্চিম দুই বাংলা জুড়ে। ক্ষোভ সামলাতে ষষ্ঠীর সকালে ফের বীরেন্দ্রকৃষ্ণের মহালয়া রেডিও-য় বাজলো।
এমন নয় যে উত্তম মাইক্রোফোনের সামনে খারাপ পারফরম্যান্স করেছিলেন, কিম্বা বসন্ত চৌধুরীর সহ-ভাষ‍্যপাঠ অথবা হেমন্তের সঙ্গীত পরিচালনা উন্নত ছিলনা। আসলে সেদিন আকাশবানী কতৃপক্ষ বাঙালি সেন্টিমেন্ট’টাই ধরতে পারেননি। বাঙালি মহালয়ার ভোরে রেডিও-য় বীরেন্দ্র-কন্ঠে উৎসারিত পূজোর গন্ধ গায়ে মেখে ইভনিং শোয়ে যাবে সেলুলয়েডের পর্দায় মহানায়কের ভুবনভোলানো হাসি দেখতে, এটাই ছিল গত শতাব্দীর পাচঁ-ছয়-সাতের দশকের অন্যতম বাঙালিয়ানা।
সেদিন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ঘনিষ্ঠ মহলে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ওরা(আকাশবানী) আমাকে একবার জানালোনা’। আবার চারধারে তীব্র সমালোচনায় মানসিক বিপর্যস্ত উত্তমকে ফোন করে বলেছিলেন, কোন সমালোচনাতে কান দিওনা, মনে রেখ তুমি বাঙালির মহানায়ক। যদিও মিডিয়ার মাধ্যমে মহানায়ক তাঁর আপামর ভক্তের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা জানিয়েছিলেন।
রবি ঠাকুরের পর যে বাঙালির শেষ যাত্রাপথে ভেঙে পড়েছিল আমজনতা, তিনি উত্তম কুমার। আবার রবি ঠাকুরের শেষযাত্রার ধারাবিবরনী বেতারে যিনি দিয়েছিলেন, উত্তমের বেলায়-ও তিনি-ই। তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। ৫৪-এর উত্তম কুমারের মহাপ্রস্থানের পথে তাঁর থেকে বয়সে ২১ বছরের বড় ৭৫-এর বীরেন্দ্র যখন অন্তিম লগ্নে বলে ওঠেন,’ যে সুন্দর কমনীয় মুখমন্ডল এতকাল তাঁর অজস্র ভক্তকে আনন্দ দিয়েছে, সেই শরীরে আগুন স্পর্শ করল। মহানায়কের নশ্বর দেহ ঘিরে এখন আগুনের লেলিহান শিখা। একটু একটু করে গ্রাস করে নিচ্ছে তাঁর শরীরকে। আমি দেখতে পাচ্ছি কাতারে কাতারে মানুষ এসে একবার তাঁর পাদপদ্ম স্পর্শ করতে চাইছে ‘…………………..
অশ্রুসিক্ত কন্ঠে তাঁর এই উচ্চারণের সাথে সাথে কোথায় যেন একাকার হয়ে যায় সর্বাধিক প্রিয় নায়কের জন্য বাঙালি হৃদয়-উদ্বেলিত শোক, মহালয়ার নস্টালজিয়া, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ- উত্তম কুমার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *