RAHUL DEV BISWAS

 8 total views

# মুখোশের আড়ালে

# রাহুল দেব বিশ্বাস

প্রেম কুমার প্রজাতন্ত্রের বড়ো কর্মকর্তা। সরকারি গাড়ি, বাড়ি, প্রভাব,প্রতিপত্তি, ক্ষমতা কি নেই তার! দানে, দয়ায় নিজের এলাকায় বেশ সুনাম। ঘরে তার সুন্দরী বউ আর পাঁচ বছরের একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান আছে। গরীব সরল সোজা বাবা মায়ের অমতে দীর্ঘদিন প্রেম করে সে উচ্চ বংশীয় পরিবারে বিয়ে করে। বাবা মা প্রথম প্রথম না মানলেও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে সবকিছু মেনে নিয়েছে। ছবির মতো সাজানো গোছানো ওর সংসার। সরকারি কোয়ার্টারে ভিআইপি জীবন যাপন। না চাইতেই সে এখন অনেক কিছু পেয়ে যায়। বউয়ের কাছে সে এক মহা মানব তুল্য,দৃঢ় বিশ্বাসের পাত্র! কিন্তু এই লোকটির বাস্তব রূপটি সম্পূর্ণ আলাদা। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার সাথে সে তার বউয়ের অন্ধ বিশ্বাসকে দূর্বলতা ভেবে ওর বউকে ঠকিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন!
তার এই সাধুর মুখোশের আড়ালের নোংরা মানুষটিকে খুব ভালো করে চেনে শুধু একজন ব্যক্তি। সে হলো নিরব নীল।

সেদিন ছিল শুক্রবার। নিরবের এক ফেসবুক বান্ধবী ওকে ম্যাসেঞ্জারে নক করে।
নিরবের সাথে এই মেয়েটির ফেসবুকের কল্যাণে খুব ভালো সম্পর্ক। ম্যাসেঞ্জারে প্রায়ই তাদের বেশ কথাবার্তা হয়। যে কারনে নিরব জানে মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। ওর নাম হলো টিনা। ওর বাবার বাড়ি নিরবের গ্রামের পাশের গ্রামে। কিন্তু এর আগে ওরা একে অপরের নাম শুনলেও ওদের মধ্যে কোনদিন দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। টিনার বর সরকারি কর্মকর্তা। ওর আট বছরের একটা ছেলে ও বারো বছরের এক মেয়ে আছে। ওদের সুখের সংসার। টিনার লাভ ম্যারেজ।

টিনা ম্যাসেঞ্জারে নিরবকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি প্রেম কুমারকে চেনেন?’
‘প্রেম নামে তো অনেকেই চিনি। তুমি বলছো ‘প্রেম কুমার’! ওরে বাব্বা! বলি, এ কি রাজা ডালিম কুমারের সৎ ভাইটাই নাকি?’
‘দেখেন, একটুও ফাজলামো করেন না। ও কিন্তু একজন ইউএনও। খুবই ভালো অফিসার,অনেক সুনাম বুঝলেন!’
নিরব হাসির ইমোজি দিয়ে লিখলো,’তাতে আমার কি হবে? আমাকে কি সুপারিশ করে প্রমোশন করে দিবে?’
‘এভাবে বলছেন কেন! সুপারিশ সে করলে আপনার প্রমোশন হয়েও তো যেতে পারে! এসব কথা এখন রাখেন তো, আগে বলেন আপনি ওকে চেনেন কিনা?’
‘হ্যাঁ, ওকে চিনি তো। আমার ফেসবুকে এ্যাড আছে। আমরা ছেম ইয়ারে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। এক স্কুলে পড়িনি তবে ওর সাথে আমার পরিচয় আছে এবং মাঝে মাঝে কথাবার্তা বলি। সম্পর্ক একেবারে খারাপ না।’
‘আপনাদের মধ্যে যে কথাবার্তা হয় সেটা কিন্তু আমি আগে থেকেই জানি। ও যে আপনার ফেসবুকে এ্যাড আছে তাও দেখেছি।’
নিরব বললো, ‘তা আছে। কিন্তু তুমি ওকে কিভাবে চেনো? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি! হঠাৎ করে ওর কথা আমাকেই বা কেন বলছো?’
টিনা অনেকক্ষণ ধরে কোনো কিছু না লিখে চুপচাপ আছে। নিরব বুঝতে পারছে যে টিনা কিছু একটা বলতে চাচ্ছে কিন্তু সেই কথাটি সে কিভাবে বলবে এতোক্ষণ ধরে মনে মনে সেই পরিকল্পনা আটছে।
‘দাদা,আপনাকে যে কিভাবে বলব! তবুও কেন জানিনা আমার মনে হচ্ছে আপনাকে বিশ্বাস করে বলতে পারি!দাদা,আপনাকে একটা অনুরোধ করবো আপনি কিন্তু অন্যভাবে নেবেন না প্লিজ..’
নিরব টিনাকে চাঙ্গা করে লিখলো, ‘আরে না প্যাঁচিয়ে খুলে বলোতো কি ব্যাপার?’
টিনা এবার একটু সাহস নিয়ে লিখলো,’দাদা,আমরা না অনেক গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। ওর সাথে আমার প্রায়ই ভিডিও কলে কথা হয়। আমার বর ঘুমিয়ে পড়লে প্রায় প্রতি রাতে ওর সাথে কথা হয়। প্রেম আমাকে বিয়ের আগে পছন্দ করতো কিন্তু কোনদিন আমাকে বলেনি। আমি ওর সাথে জড়িয়ে পড়েছি। আমি ওকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারি না। কিন্তু কিছুদিন যাবত ও আমাকে খুব বেশি সময় দেয় না। ও আমাকে সময় না দিলে আমার খুব কষ্ট হয়। আমি সহ্য করতে পারি না। আমি ওকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি।’
নিরব টিনার কথা শুনতে শুনতে যেন হতভম্ব হয়ে গেল!
সে কী লিখবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণের জন্য সে বেহুঁশ হয়ে গেছিল!
‘এসব বলো কী! তুমি না প্রেম করে বিয়ে করেছো। তোমার ফুটফুটে দুটো সন্তান আছে। কতো সুন্দর সংসার তোমার! তাছাড়া প্রেমের ঘরেও তো বউ বাচ্চা আছে। দেখো টিনা, এটা একদম ঠিক না। একেবারে অন্যায়! তুমি তোমার বর, ছেলে মেয়েদের ঠকাতে পারো না। এটা তো স্রেফ অন্যায়, অপরাধ! তোমার অবশ্যই এই পথ থেকে ফিরে আসা উচিত নয়তো কোনদিন শান্তি পাবে না।’
টিনা অনেকক্ষণ ধরে শান্ত হয়ে নিরবের উপদেশ শোনার পর তার অর্থ বুঝলো কি না বুঝলো ঠিক বোঝা গেল না।
‘ওকে দাদা। আমি সবরকম চেষ্টা করবো এই সম্পর্ক থেকে ফিরে আসতে। তবে প্লিজ দাদা এই সম্পর্কের কথা আপনি কাউকে বলেন না।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি বিশ্বাস রাখতে পারো আমি কাউকে বলবো না। কিন্তু একটা কথা তুমি সবসময় মনে রাখবে তাহলো ভালো কাজ যেমন প্রকাশ পায় তেমনি খারাপ কাজও একদিন প্রকাশ পায়! সেদিন কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়েও তোমার কিছু করার থাকবে না।’

তারপর বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে। নিরব নিজের অফিস আর ব্যক্তিগত কিছু কাজ কর্ম নিয়ে কিছুদিন ধরে খুব ব্যতিব্যস্ত ছিল। তাই এতো দিন ধরে সে অফলাইনে ছিল। আজ একটু ফ্রি হতে পেরে সে অনেকদিন পর ডাটা অন করেছে।
নিরব ডাটা অন করার সঙ্গে সঙ্গে টিং টিং করে মোবাইলের স্ক্রিনে টিনার ম্যাসেজ।
টিনা ওকে টেক্সট করেছে। সে এখনো এক্টিভ আছে।
‘দাদা,এতদিন অফলাইনে কেন ছিলেন?’
‘অফিসিয়ালি ও পারসোনালি খুব ঝামেলার মধ্যে ছিলাম। অফিসের ঝামেলা মিটে গেছে। এখন আমার নিজের ঝামেলা ঘাড়ে চেপে বসেছে। আমি সিটি করপোরেশনের মধ্যে কিছু জমি কিনতে চাই। তাই পরিচিত সবাইকে বলে দেখছি তাদের তেমন কোন জানাশোনা আছে কি। এইতো সেদিন শ্রেয়সীকে এ ব্যাপারে বললাম। ও তখন আমাকে প্রেম কুমারের মোবাইল নাম্বার দিয়ে বললো, ওর কথা বললেই নাকি কাজ হয়ে যাবে।’
‘শ্রেয়সী প্রেমকে কিভাবে চেনে?’
‘এই কথা আমি শ্রেয়সীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও আমাকে বলে, সে ওকে কিভাবে চেনে সেটা নাকি আমার জানার বিষয় না। আমার কাজ হলেই তো হলো!’
টিনা আর না পেঁচিয়ে বলল,’ও তাই বুঝি! মনে হচ্ছে সম্পর্ক বহুদূর গড়িয়েছে! বুঝতে পারছি এইজন্যই আমাকে এখন আর সে ফোন করার সময় পায় না। বাদ দেন এসব কথা। আপনি কি তাহলে প্রেমকে আপনার জমি কেনার ব্যাপারে ফোন করবেন?’
‘ধূর, তুমি কি পাগল হয়েছো। প্রেম এর সাথে ফোনে কথা বলতে চাইলে তো ওর নাম্বার আমি নিজেই ওর কাছ থেকে চেয়ে নিতাম। ভাবছি এভাবে আর কাউকে বলব না। শুধু শুধু সময় নষ্ট না করে নিজেই খুঁজতে বের হয়ে যাবো।’
‘আপনি যেটা ভালো মনে করেন। ভালো থাকবেন।’
এই বলে টিনা অফলাইনে চলে গেল। সেদিন আর কোন কথা হয়নি।

কিছুদিন ধরে নিরবের ফেসবুক পেজে টিনাকে আর দেখা যায় না। সেদিন হঠাৎ করে ব্যাপারটা নিরবের নজরে আসে। সে একটু লক্ষ্য করে বুঝতে পারলো টিনা নিরবকে ব্লক মেরে দিয়েছে।
তখন নিরব অন্য একটি আইডি থেকে নিজের পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞেস করল,’কি ব্যাপার, আমাকে মনে হয় ব্লক মেরে দিলে?’
আশ্চর্যজনক ব্যাপার টিনা এই আইডিও ব্লক মেরে দিল।
নিরব এবার একটু বিষয়টির গভীরে ঢুকে দেখলো প্রেম কুমারও নিরবকে ব্লক মেরে দিয়েছে।
নিরবের কাছে এখন অন্তত একটি বিষয় পরিস্কার হয়ে গেল। নিরবকে ব্লক মারার সিদ্ধান্ত ওদের দুজনের যোগসাজশে করা হয়েছে। আমদুধে মিশে গেছে আর কি। আঠি এখন বাগানে গড়াগড়ি খাচ্ছে! কিন্তু নিরব তাকে ব্লক মেরে দেওয়ার প্রকৃত কারণ এখনও খুঁজে পাচ্ছে না।
নিরব আনমনে যখন এসব কথা ভাবছে তখন ওর মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠলো। অপরিচিত নাম্বার।
নিরব বললো,’হ্যালো কে বলছেন?’
‘আমি শ্রেয়সী। চিনতে পেরেছো নিশ্চই!’
‘এভাবে বলছো কেন? তুমি তো আমার অচেনা কেউ না!’
শ্রেয়সী খানিকটা রাগ করেই বললো,’এই তুমি ওই ডাইনি মেয়েটাকে কী বলেছো?”
‘ তার আগে বল, ডাইনি মেয়ে বলতে কাকে বুঝাচ্ছো?’
‘টিনাকে আমার কথা কী বলেছো? ওর এতো বড়ো স্পর্ধা হয় কি করে আমাকে চার্জ করে। আমাকে বলে কিনা প্রেমের পথ থেকে সরে যেতে। বলি,প্রেম কি ওর পৈতৃক সম্পত্তি?’
শ্রেয়সী খুব উত্তেজিত হয়ে গেছে।
নিরব বললো, ‘শ্রেয়সী মাথা ঠান্ডা করো। আমি তোমার ব্যাপারে তেমন কিছুই ওকে বলেনি। ও মনে হয় বেশি এক্সাইটেড হয়ে গিয়ে তোমাকে চার্জ করে ফেলেছে।’
শ্রেয়সী আরও উত্তেজিত হয়ে গেছে।
‘শোন নিরব, তুমি ঐ ডাইনিটাকে সোজাসুজি বলে দিও যে ওর কারনে যদি প্রেম আমার সাথে আর সম্পর্ক না রাখে তাহলে আমি ওর গুষ্টির ষষ্ঠী পুজোর ব্যবস্থা করে ছাড়বো! তখন ঐ ছুড়ি বুঝবে কত ধানে কত চাল!’
নিরব পড়ে গেছে মহা মুছিবতে! ওরা যে দু’জনেই নিরবকে ব্লক মেরে দিয়েছে। নিরব কারো সাথেও নেই ,পাছেও নেই। শুধুমাত্র টিনার কথা শুনলো তাতেই কেন চোখের বিষ হলো এর মাথামুণ্ডু কিছুই সে বুঝতে পারলো না।
নিরব আর দেরি না করে শ্রেয়সীকে জিজ্ঞেস করল,”তুমি কি প্রেমকে পছন্দ করো?”
‘পছন্দ নয় , আমাদের অনেক দিনের রিলেশন! তুমি ঐ ছুড়িকে বলে দিও যে ওর জন্মের আগেই আমি প্রেমকে ভালবাসি! আমি প্রেমকে পেতে সবকিছু করতে পারি।’
নিরব মনে মনে ভাবছে আর বিড় বিড় করে বলছে, বাপরে বাপ! এ কোন দুনিয়ায় এসে পড়লাম! এ যে ঘোর কলি শুরু হয়ে গেছে! স্বামী, সংসার,বৌ, বাচ্চা ছেড়ে এরা এ কিসে মজে আছে! এদের পাপের কি কোন শাস্তি নেই? এদের কি কোন বিচার হবে না?
নিরব শ্রেয়সীকে কিছু না বলেই কলটি কেটে দিল।
এতোক্ষণ ধরে সে প্রচন্ড এক ঘোরের মধ্যে ডুবে ছিল। এবার সে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলো। খোলা আকাশের দিকে এক মনে তাকিয়ে নিরব ভাবছে, মুখোশপরা এইসব শয়তান বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক থাকার আর কী প্রয়োজন! এরা তো মিথ্যা ভালোবাসার ছলনাতে ভুলিয়ে রাখে আপনজন! কাছের মানুষের সাথে অহর্নিশ প্রতারনার আশ্রয় নেয়। একেকটা মুখোশধারী আস্ত শয়তান! এদের খপ্পরে পড়ে না জানি কতো নিষ্পাপ মুখ জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে!
তবে ভয় নেই,,
ওদের নিরাপরাধ পরিবারগুলোর সম্মানের কথা মাথায় রেখে আমি যদিও আজ নিরব হয়ে গেলাম তবে সৃষ্টিকর্তার চোখ অন্ধ নয়! সে চোখে পাপ পূণ্য সবই ধরা পড়ে। প্রেম কুমারের বউয়ের ভালোবাসা,শ্রেয়সীর পরিবারের অভিশাপ কিম্বা টিনার স্বামীর অন্ধ বিশ্বাসের দাম একদিন দিতেই হবে। আর সেদিন মনে হয় খুব বেশি দূরে নয়!

তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত! নিরবের সাথে ওদের আর যোগাযোগ হয়নি। নিরবেরও যে কথা সেই কাজ। সে ওদের কারোর সাথে আর কোনদিন যোগাযোগ করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি।
নিরব প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজ আগে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়বে তারপর অন্য কাজে মনোযোগ দেয়। আজ সকালে পত্রিকার পাতায় একটি খবরে আর দু’চোখ আটকে গেছে। কিছুতেই সে চোখ সরাতে পারছে না। সবগুলো পত্রিকার হেড লাইন একই। নিরব পত্রিকার পাতায় খবরটি পড়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তড়িগড়ি করে উঠে টিভি ছাড়লো। সব চ্যানেলেই একই সংবাদ।
‘গতকাল রাতে আনুমানিক সাড়ে এগারোটায় ইউএনও প্রেম কুমার বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি একটি সুইসাইড নোট লিখে রেখে গেছেন। সুইসাইড নোটে তিনি উল্লেখ করেছেন,তিনি স্বেচ্ছায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি আরো লিখে গেছেন আমার আত্মহত্যার ব্যাপারে প্রশাসন যেন অহেতুক আমার স্ত্রী ও পরিবারকে হয়রানি না করে। তার নিশ্চয়তা প্রদান করার জন্য তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত অনুরোধ করেছেন।’
টিভিতে এই দুঃসংবাদ দেখতে দেখতে নিরবের দু’চোখ কখন যে জলে ভরে উঠলো সে একটুও টের পায়নি। নিরবের চোখের সামনে ভেসে উঠল প্রেম কুমারের নিষ্পাপ শিশু সন্তানের মুখ এবং তার নিথর দেহের পাশে স্ত্রীর আহাজারি!
টিভি ক্যামেরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে! সাংবাদিকরা হন্যে হয়ে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করছে এর সাথে অন্য কোনো ক্লু জড়িয়ে আছে কিনা! চারিদিক শত শত চোখ। শত শত প্রশ্ন। কিন্তু সবাই অবাক, সবাই হতবাক। কেউ কিছু জানে না। কেউ কিছু বলতে পারছে না আসলে এই মৃত্যুর কী রহস্য?
নিরব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে সোফায় বসে পড়ল। ঠিক তক্ষুনি নিরবের ফোনে শ্রেয়সীর কল আসল।
শ্রেয়সী হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে নিরবকে বলল, ‘এখন আমার কী হবে?’
‘কেন, তোমার কী হয়েছে?’
শ্রেয়সী বললো, ‘তুমি তো জানো, আমার স্বামী খুব একরোখা। আজ দুই মাস হলো আমেরিকায় চলে গেছে। আমার এখন কী হবে? আমি কী করবো?’
নিরব শ্রেয়সীর কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। এমনিতেই দুঃসংবাদটা শুনে নিরবের কিচ্ছু ভালো লাগছে না।
নিরব একটু বিরক্ত হয়েই বললো,’ এসব কথার মানে কী?তোমার স্বামী আমেরিকা থাকুক আর রাশিয়ায় থাকুক তাতে কী হয়েছে?’
শ্রেয়সী বাধো বাধো কন্ঠে নিরবকে বললো, ‘আমি তিন মাস হলো প্রেগন্যান্ট!’
‘ তাতে সমস্যা কোথায়?’
‘আমার গর্ভে প্রেমের সন্তান!’
‘এসব কী বলো তুমি? তুমি কি শিউর?’
শ্রেয়সী আবার হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে বললো,’হ্যাঁ দাদা,হ্যাঁ। আমি প্রেমের কোনো কথাই শুনিনি। আমি ওকে ভীষণ ভালোবাসি। আমি কোনো ভাবেই আমার ভিতর বেড়ে ওঠা ওর অস্তিত্ব অস্বীকার করতে চাইনি। ওকে নিয়ে আমি সংসার করতে চেয়েছি। কিন্তু আমি এখন কী করবো? আমি তো আমার বরকে আজ পর্যন্ত কিছুই জানাইনি। ওকি আমাকে আদৌও বিশ্বাস করবে? এই কলঙ্ক নিয়ে আমি এখন কিভাবে বাঁচবো? আমার মরা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
নিরবের হঠাৎ টিনার কথা মনে পড়ে গেল।
‘টিনার কী খবর কিছু জানো?’
‘আমি তেমন কিছু জানিনা। তবে কিছুদিন আগে শুনেছিলাম ও বরের সাথে আর থাকেনা। ছেলে মেয়ে নিয়ে আলাদা থাকে।’
নিরব শ্রেয়সীকে এই মুহূর্তে ঠিক কী বলবে বুঝে উঠতে পারছে না।
অনেকক্ষণ পর সে বললো, ‘দেখো শ্রেয়সী, আমি তোমাকে একটা উপায় বলে দিতে পারি কিন্তু একটা শর্তে। তবে আমি বুঝতে পারছি না এই উপায়টি তোমার কতটা কাজে আসবে।’
‘আমি সব শর্তে রাজি আছি। তুমি প্লিজ দেওনা একটা উপায় বলে।’
‘শর্ত হলো আমার কাছ থেকে এই কথা শোনার পর আমার সঙ্গে আর কোনদিন তোমার যোগাযোগ করা যাবে না। আর তুমি কখনো কল করলেও আমি রিসিভ করবো না।’
শ্রেয়সী বুঝতে পারছে নিরব অনেক কঠিন শর্ত দিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সে এখন নিরুপায়! একটা উপায় তো তাকে বের করতেই হবে। নইলে মরন ছাড়া যে আর কোনো পথ থাকবে না। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর নিরবকে বললো,’আমি তোমার শর্তে রাজি।’
নিরব তখন বলল, ‘তুমি আমার সাথে কথা বলার পরেই আমেরিকায় ফোন করে তোমার বরকে যেভাবে পারো তাড়াতাড়ি দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করো। আর এটা যত তাড়াতাড়ি করতে পারবে ততো তাড়াতাড়ি তোমার কলঙ্ক ঘুঁচবে। এটাই এখন একমাত্র পথ। নিষ্পাপ অনাগত শিশুটিকে তোমার বরের পরিচয়ে বাড়তে দিও। কোনদিন ভুলেও এই গোপন কথা তোমার বরকে বলো না। আর এই জঘন্য পাপ কাজ থেকে শিক্ষা নিয়ে নোংরা জীবনকে শুধরে নিও। আগে মানুষ হয়ে তারপর নিষ্পাপ শিশুটির জন্ম দিও।’

এই বলে নিরব শ্রেয়সীর উত্তরের জন্য বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করেই কলটি কেটে দিল।

সমাপ্ত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *