Rahul Dev Biswas

 67 total views

মুখার্জি বাবুর শিক্ষা   –  রাহুল দেব বিশ্বাস

 

মুখার্জি বাড়িতে আজ সকাল থেকে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়ে গেছে! বাড়ির বাহির থেকে শুনে বোঝার উপায় নেই বৃটিশ ভবনের আঙ্গিকে তৈরি এই দোতলা বাড়ির ভিতরে আসলেই কি ঘটছে। তবে চেঁচামেচির আওয়াজ এতটাই বিকট যে কেউ কেউ মনে করছে ভিতরে মনে হয় কোন লঙ্কাকান্ড ঘটে গেছে!
কিছু অতিউৎসাহী লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে কানাঘুষো করছে আর বলছে,’ওরে সর্বনাশ! মুখার্জি বাড়ি নাকি পুলিশ ঢুকে গেছে!’

কিছুক্ষণ পর দেখা গেল বাড়ির প্রধান কর্তা সকলের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত মুখার্জি বাবু,তিনজন পুলিশ কনস্টেবল এবং এই বাড়িতে দীর্ঘ দশ বছর ধরে কাজ করা কুমারেশ দস্তিদারের দু’হাতে শক্ত হাতকড়া পরানো অবস্থায় মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে আসল।

মুখার্জি বাবু খুবই গম্ভীর প্রকৃতির লোক। তিনি এতক্ষণ ধরে বাড়ির বাহিরে রাস্তায় দাঁড়ানো অতিউৎসাহী লোকগুলোকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আপনারা শুনুন, চাকরবাকর কোনদিন বিশ্বাস করবেন না। ছোটলোক কোনদিন মানুষ হতে পারে না। এরা হলো বিষধর সাপ। সুযোগ পেলেই মালিকদের ছোবল মারে। এধরনের আরও অনেক কথা তিনি উৎসুক জনতাকে শুনিয়ে যাচ্ছেন আর এরা হাঁ করে গিলছে মুখার্জি বাবুর অমৃত বাণী!’

আটপৌরেভাবে ময়লা শাড়ি পরা অল্প বয়সের একটা বউ কিছু দূরে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে খুব জোরে জোরে কান্নাকাটি করছে। সে আর দেরি না করে একদৌড়ে এসে মুখার্জি বাবুর পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো, ‘বড়ো বাবুগো, বিশ্বাস করেন,আমার স্বামী চুরি করেনি। ওকে আমি ভালো করেই চিনি। ও কিছুতেই চুরি করতে পারে না। বাবুগো, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। ঈশ্বরের দোহাই লাগে আমার স্বামীকে পুলিশের হাতে তুলে দেবেন না।’

মুখার্জি বাবুর অনেক ক্ষমতা। তিনি দৃঢ় কন্ঠে ধমকের সুরে বলে উঠলেন,’তোমার স্বামী দোষী কি নির্দোষ সেটা পুলিশই ভালো বুঝবে।’

সেদিন মুখার্জি বাবুর পায়ে ধরে কুমারেশকে পুলিশের হাত থেকে ছাড়াতে অনেক কাকুতিমিনতি করেছিল কুমারেশের বউ। কিন্তু কোন কিছুতেই অনড় পাথর টলেনি। অচল সমাজ ব্যবস্থায় জী হুজুর বলা মানুষগুলো সেদিন বিচারের আগেই কুমারেশকে চোর সাব্যস্ত করে ওর নিষ্পাপ বউটিকে চোরের বউ তকমা লাগিয়ে দিয়েছিল।

তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। লোকমুখে শোনা যায় ছয় মাসের মতো জেল খেটে কুমারেশ দস্তিদার জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিল। কিন্তু এই তল্লাটের মানুষ কোনদিন আর কুমারেশকে একটিবারের জন্যও দেখেতে পায়নি।

মুখার্জি বাবু বিলেত ফেরত লোক। দামি গাড়ি, প্রাসাদ বাড়ি, কোন কিছুরই তার অভাব নেই। সারাক্ষণ গলায় শোভা পায় এক মহা মূল্যবান হীরার হার। ছুটির দিনে নিজের পাজেরো গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে সারা শহর দাপিয়ে বেড়ানোই তার একমাত্র শখ। সেদিন আউটিংয়ে মুখার্জি বাবুর গাড়ি চলতে চলতে রাস্তায় হঠাৎ করে ডিস্টার্ব দিলে পাশেই একটি ওয়ার্কশপে নিয়ে ঠিক করে আবার দ্রুত বেড়িয়ে পড়েন। ব্যস্ত মানুষ,জরুরি কাজ আছে ।

মুখার্জি বাবুকে আড়াল থেকে এক পলক দেখে সেদিন অন্য কাজের অজুহাতে আড়ালেই থাকলো ওয়ার্কশপের নতুন কর্মচারী কুমারেশ দস্তিদার।

অনেকক্ষণ হলো বাবুর গাড়ি ওয়ার্কশপ থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু কিভাবে যেন মহা মূল্যবান বাবুর হীরার হারটি গলা থেকে খুলে পড়ে গেছে ওয়ার্কশপের মেঝেতে! কিন্তু সেদিকে মুখার্জি বাবু খেয়ালই করিনি।
সেদিন অনেক কষ্ট করে ওয়ার্কশপের অন্য কর্মচারীদের বুঝিয়ে বলতে গেলে এক প্রকার যুদ্ধ করে কুমারেশ ওদের কাছ থেকে হীরার হারটি নিয়ে ছুটলো হীরার হারটি ফিরিয়ে দিতে মুখার্জি বাড়ি।

অনেকদিন পর কুমারেশ দস্তিদার আজ দাঁড়িয়ে তার অতি পরিচিত মুখার্জি বাড়ির মেইন গেটে। বুক পকেটে তার মহা মূল্যবান হীরার হার।

মুখার্জি বাবু মূল ফটক খুলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে ওখানে?’

কুমারেশ মৃদুস্বরে উত্তর দিলো,’ বাবু আমি কুমারেশ দস্তিদার! ওয়ার্কশপে ফেলে আসা আপনার হীরার হারটি আমি ফিরিয়ে দিতে এসেছি। দয়া করে আপনি নিলে আমি চলে যাব।’

মুখার্জি বাবু কিছুক্ষণের জন্য যেন ভাষা হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন! কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে আসলে কুমারেশকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ভাই, তুই আমাকে মাফ করে দিস্। আমি তোর সাথে মহা অন্যায় করেছি। আমি দুধকলা দিয়ে যে কত বড় কালসাপ পুশেছিলাম সেটি আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছি। আমার নিজের শালা (বউয়ের ভাই) যাকে আমি আপন ছোট ভাইয়ের মতো দেখে আসছি, সেই আমার বাড়িতে কিভাবে পুকুর চুরি করতে পারে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। আর তুই সেদিন এ বাড়ির সামান্য চাকর হয়েও মুখার্জি বাড়ির সম্মানের কথা ভেবে সব জেনেও মিথ্যা দায় মাথায় নিয়ে নি:শব্দে সাজা খেটেছিস। আর আজ মহা মূল্যবান জিনিস পেয়েও আমাকে ফিরিয়ে দিতে আসলি। আমি আজ বুঝতে পারলাম যে ছোটলোক,চাকর তারাই হয় যাদের ভিতরের বিবেকটা পচে গেছে। যে শিক্ষা আমি বিলেতে পাইনি সেই শিক্ষা আমি তোর কাছে পেলাম। আজ থেকে মুখার্জি বাড়িতে তুই চাকর নয়,আমার আপন ভাই হয়েই থাকবি।’

কুমারেশ দস্তিদারের মুখ দিয়ে আর একটি কথাও বেরোলো না। সে অতীতের মতো আজও নির্বাক! শুধু দুচোখে তাঁর আনন্দাশ্রু টলমল করছে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *