Ranjana Basu

 125 total views

শিরোনাম- শিউলি কথা

যারা কথা দিয়ে যায়,তাঁরা আর আসেনা। শিউলির গরীব বাবা যতীন মিত্র সাধ্যমত চেষ্টা করে। কতবার যে তার মা,সাজিয়ে গুছিয়ে এনে পাত্র পক্ষের সামনে তুলে ধরে! শিউলির আর এসব ভালো লাগে না।

বাবা,মা ভাবে তাদের একমাত্র মেয়ে কত গুনবতী। মেধা আছে, ঘরের খুঁটিনাটি সেই সব সামলায়। কালো মেয়ের গড়ন খানি সুন্দর। টানাটানা দুটি মায়া ভরা চোখ। বাপ, কাজে বেরোলে মেয়েই পুঁটলি বেঁধে খাবার সঙ্গে দিয়ে দেয়,একদিনও ভুল হয় না। যে মেয়ের অন্তরে এত ভালোবাসা, তার কিনা বর জোটেনা ?

প্রৌঢ় বাবা চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠে। দেখতে দেখতে মেয়েটারও বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। ওর সব বন্ধুই এখন ঘরকন্না করছে। ছেলেমেয়ে সামলাচ্ছে। আর তার মেয়ে! কম চেষ্টা করছেন, কিন্তু পার করতে পারলেন কই?

বহুদিন পরে সৌপর্ণ গ্ৰামে এসেছে। বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে কর্মসূত্রে গৌহাটিতে থাকে। এই গ্ৰামে দু-কাঠা জমির উপর টিনের চালের একটি কাঁচা বাড়ি রয়েছে। যাবার সময় যতীন বাবুকেই দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল সৌপর্ণর মা। সরাসরি এসে তাই এ বাড়িতেই উঠেছে সৌপর্ণ।

সৌপর্ণর নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। ওর বাবার অভাবটা খুবই বোধ করে। বাবা মারা গেছেন দশ বছর হল। তা- ও যেদিন বাবাকে চোখের সামনে আই সি ইউ- তে কাঁচের বন্ধ জানলার বাইরে থেকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। সেই মুহুর্তটা যখনই বাবার কথা মনে পড়ে তখনই একইভাবে প্রাণটা ডুকরে কেঁদে ওঠে। ছোটবেলার দিনগুলো বাবার সাইকেলে সামনের রডটাতে বসে কত জায়গায় বেড়িয়েছে। এই বাড়িতে বসে শিউলির মা,সৌপর্ণর মায়ের সাথে একসঙ্গে নাড়ু, মুড়কি, নিমকি তৈরি করতেন। পুজোর সময় হইহই করে মুখার্জি বাড়িতে ওরা সবাই যেত অঞ্জলী দিতে। আগাগোড়াই একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল দুই পরিবারের মধ্যে। শিউলির মা,একটা রেকাবিতে মুড়ি আর নাড়ু সাজিয়ে এনে সৌপর্ণকে বললেন, খেয়ে নাও বাবা— তোমার কাকাবাবু কাজে বেরিয়েছেন, ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। তা, তুমি কি আজই ফিরে যাবে?

সৌপর্ণ জানায় তাকে আজই ফিরে যেতে হবে। কাকাবাবুর নামে মা,একটি চিঠি পাঠিয়েছে। উত্তর টা আমায় আজই নিয়ে যেতে বলেছিল। আপনি চিঠিটা রেখে দিন। কাকাবাবু এলে দিয়ে দেবেন। বাড়ির অবস্থাটা একবার নিজে চোখে দেখে যেতে বলেছিল, তা, যা অবস্থা হয়েছে দেখলাম, মেরামত না করলেই নয়!

হ্যাঁ, বাবা— বসবাস না থাকলে যা হয় আর কি! বেড়ার দেওয়াল ভেঙ্গে পড়েছে, একবার সময় করে এসে লোক লাগিয়ে ঠিকঠাক করে নিতে পারলে আবার কিছুদিন ভালো থাকবে।

কোথায় রে, শিউলি— এক গ্লাস জল আনতে এতক্ষণ সময় লাগে তোর?

শিউলি দরজার পাশেই অপেক্ষা করছিল, মায়ের ডাকে লজ্জা জড়ানো পা দুটো কোনরকমে টেনে নিয়ে এল ঘরে, জলের গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল। সৌপর্ণ একটু হেসে শিউলির দিকে তাকালো। মা, তোমার জন্য এই শাড়িটা কিনে পাঠিয়েছে। এটা তুমি রাখো। শিউলি এগোতে পারে না। ওর লজ্জা রাঙ্গা মুখের দিকে তাকিয়ে সৌপর্ণ শাড়ির প্যাকেট টেবিলের উপর রেখে বলে, এবার আমি উঠি কাকিমা। কলকাতার কাজ সেরে বাড়ি ফিরতে আরও দু- চারদিন দেরি হবে।

রাস্তার মোড় পর্যন্ত যতদূর চোখ যায়,ততক্ষন দোর ধরে তাকিয়ে থাকে
শিউলি। বাবা বাড়ি ফিরলে, চিঠিখানা তুলে দেয় হাতে। চিঠিটা শেষ করে উঠতে পারে না,ডাক দেয়, শিউলির মা, শুনে যাও?
আজ আমাদের বড়ো আনন্দের দিন গো—
বৌঠান, শিউলিকে তার ছেলে সৌপর্ণর জন্য চেয়ে অনুরোধ রেখেছেন। আমাদের মত পেলে এই অগ্ৰহায়নেই শুভ কাজ সম্পন্ন করতে চান। কিন্তু পত্রপাঠ উত্তর নিয়ে যাওয়ার কথা। তা যখন হলো না,চিঠির শেষে ঠিকানা দিয়েছেন, আমি তাহলে কালই একটা উত্তর পাঠিয়ে দিই, তুমি কি বলো?

আমার যে আর তর সইছে না, এতদিনে ঈশ্বর মুখ তুলে চেয়েছেন। দিদি যে আমার শিউলিকে কতখানি ভালোবাসে সে আমি জানি। যাই, ঠাকুর ঘরে গিয়ে শাঁখটা বাজিয়ে আসি। স্বামী,স্ত্রী দুজনে সারারাত ধরে কত কথাই বলে, শেষ রাতে ঘুমিয়েছে। শিউলির মা, ঘুম ভেঙে তাড়াতাড়ি উঠে দেখে—

জানালা দিয়ে শরতের রোদ এসে পড়েছে ঘরে। শিউলি গাছের ফুলে সারা উঠোন ভরে গেছে। একটি একটি করে সেই ফুল সাজিতে তুলে রাখছে তার আদরের মেয়ে। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, সেই আশ্চর্য নরম রোদে যেন এক শ্বেত পদ্ম ফুটে উঠেছে একবুক ভালোবাসা নিয়ে।

কলমে, রঞ্জনা বসু

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *