S.H.Shrabon

 10 total views

আবার দেখা হবে মহামারির পরে

 

(১)

ড্রেনের পাশের কচু গাছ গুলোর সবুজ রঙের গাঢ়ত্ব দিন দিন যত বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনান্তে ততই ড্রেনের দূর্গন্ধ বাড়ছে। বাড়ছে বাড়ুক তাতে কি? তেমনি সব গন্ধকে উচ্ছন্নে পাঠিয়ে ,মানুষ দিব্যি বেচে খেয়ে আছে।
এর পাশেই আছে গোটা তিনেক ছাত্রাবাস ,চলতি কথায় সবাই মেস নামেই চেনে। মেসগুলোর ওরফে ছাত্রাবাস গুলোর নামের বাহার নাইবা উল্লেখ করলাম। তার একটিতেই সম্প্রতি বাস করছেন মাহমুদুল হাসান। সবাই তাকে ‘মাহমুদ- দুই’ নামেই বেশি চেনে । কারন মেসে ও ছাড়াও আরেকজন মাহমুদ বাস করেন। কমন নাম বলেই এই ‘এক দুই’ টাইটেল লাগানো হয়েছে নামের শেষে । তবে তাকে ‘মাহমুদ- এক’ ডাকলেও তো পারতো। কোন বিচিত্র কারনে ডাকে না তা সে জানে না।
প্রতিদিন দাঁত মাজতে মাজতেই মাহমুদ ঠিক করে নেয় কলেজের রুটিন। সদ্য কলেজে পা রাখা কিশোরের মনে রং লাগাটাই স্বাভাবিক। গ্রাম থেকে উঠে আসা ওর জন্য এই নবীন কলেজ যেন এক নতুন জগত । তবে জীবনটা এখনো বাটন ফোনেই আটকে আছে। এনড্রয়েড জগতের হাওয়া পুরোটা এখনো গায়ে লাগেনি।
কলেজে সে নিজেকে সুদর্শন হিসেবেই প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু কতটা সফল তা সে সকালে আয়না দেখার সময়ই খানিক আন্দাজ করতে পারে। নেহাত সৃষ্টিকর্তা রূপ দেন নি। তবে মেধা দিয়েই সবার নজরে আসতে চায় সে। কিন্তু এবার? এই মেধা মননের খেলাতেও ততটা এগুতে পারে না । ফিজিক্স কেমিস্ট্রী ক্লাসে ফার্স্ট বেঞ্চারদের ভূমিকা পালন করলেও তা স্যারদের হ্যাঁ এর সাথে হ্যাঁ এবং না এর সাথে না বলার মাঝেই সীমাবদ্ধ।
নতুন ভর্তি হয়েই লাইব্রেরি কার্ডটা করিয়ে রেখেছিলো। লাইব্রেরীর দক্ষিন কর্নারের চেয়ারটা অধিকাংশ সময় ওর দখলেই থাকে। ওখান থেকেই সব স্টুডেন্টদের আনাগোনা স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হয় । কালো মতো একটা মেয়ে প্রায় প্রতিদিনই লাইব্রেরীতে আসে। মাহমুদ টিফিনের শেষ মিনিট অবধি লাইব্রেরীতে অপেক্ষা করে। যেদিন মেয়েটি আসে না সেদিন ওর মুখের আদল গভীর কৃষ্ণকায় কুয়োর পানির মতো রূপ নেয়। আর মনে মনে আবৃত্তি করে-“ তা সে যতই কালো হোক। দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।“
অঙ্ক, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা রসায়নের রস ভালোমতো আস্বাদন না করতে পারলেও, গল্প উপনাস্যের পোকা সে। মাঝে মাঝে মাহমুদ বগলদাবা করে নিয়ে আসে ওর বন্ধু সাজিদকে। সাজিদ কিছুদিনের মধ্যেই আন্দাজ করে ফেলে ওকে লাইব্রেরীতে টেনে হিচড়ে নিয়ে আসবার কারন। মাহমুদের সাথে সেই কৃষ্ণকলি ওরফে সেই কালো মতো মেয়েটির সাথে কথা বলার সুযোগ করে দিতে। বড্ড মুখচোরা মাহমুদ! সাজিদ কিন্তু বুঝেও না বোঝার ভান করে। সেজুঁতি হ্যাঁ সেই কালো মতো মেয়েটির সাথে ভাব জমিয়ে নেয় সাজিদ। কিন্তু কি উপায়ে? মাহমুদের কাছে তা রহস্যই রয়ে গেলো। সেজুঁতির গায়ের রং কালো হলেও নাক মুখ অতি চমৎকার। কিন্তু সবছেয়ে ভালো লাগে ওর কথা বলার ধরণ। সাজিদের সাথে হেসে হেসে কত কথা বলে। মাহমুদের ভালো লাগে না ।সে মুখ কালো করে সেই অন্ধকার মেসে ফিরে যায় সেদিনের মতো। কেটে যায় কিছুদিন।

(২)
আজ সকালটা প্রতিদিনের মেসের কমন আইটেমের মতো হলেও মাহমুদের কাছে অন্যরকম। হ্যাঁ, আজ তার জন্মদিন। গ্রামে থাকলে সারাগ্রাম টো টো করে ঘুরে বেড়াতো এই খুশিতে। তা আজ হবে না এই শহর নামক কাল কুঠুরিতে। এখানে এসব ঠুনকো আবেগের দাম নেই। পকেটে আছে ৫৭৫টাকা আর আছে মাসের ১৩ দিন বাকি। কিন্তু আজ তো জন্মদিন সারা বছরে মাত্র একবারই আসে। আসুক তাতে কি হয়েছে? সে কলেজে চলে গেলো। আঠারো বছরে পা দিয়ে নতুন উদ্যম আসলেও ক্লাসের লেকচারের চাপে তা যেন মেসের পান্তা ভাতের মতো ঠান্ডা হয়ে গেলো। লাইব্রেরির সেই কর্নারে বসে অযথা কালক্ষেপণ আর কলেজের কিছু আঠারো বছরের তরুনির আনাগোনা দেখা এটাই যেনো অবান্তর জন্মদিন।
কলেজ থেকে ফেরার পথে অনেকের মুখে জ্বলন্ত সরু নল দেখে মানে আরকি সিগারেট দেখে আজকের দিনটাকে স্মরণীয় করবার এক ফন্দি মাথায় আসলো।
-“একটা সিগারেট কি খাওয়া যায়না?
-যায়, আলবাদ খাওয়া যায়।“
সিগারেট ফোঁকার মতো যথেষ্ট দাড়ি গোফ তার উঠেছে। হা হা হা! আত্ম কথোপকথনে নিজের সাথে যেন নিজেই মশকরা করছে।

সরু ব্রিজটার ওপর বসে চারপাশ ধূমায়িত করছে মাহমুদ। বাবা মায়ের অগোচরে কাজটি করে খানিক অনুতপ্ত । কিন্তু প্রথমবার সিগারেটে টান পেরে স্বাধীন মনে হচ্ছে নিজেকে। এই খুশিতে একটা কবিতা লিখলে কেমন হয়? হ্যাঁ, লেখাই যায়।

আজও ফুস্ফুস ভারি করিনি ,
ব্ল্যাক কিংবা বেন্সন সিগারেটে।
মনের সকল বায়না মেটাই-
দু দশ টাকার চকলেটে।
আজো আমি ‘অ আ’ লিখি ,
ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট চক স্লেটে।
ঠাকুমার ঝুলি পড়ে –
আমার নির্ঘুম রাত কাটে।
আজো আমি হয়ে উঠতে পারিনি –
পাড়ার মোড়ের বখাটে।
তবু আবেগ যা ছিলো
এসেছি তা ডাস্টবিনে ফেলে।
তাই নির্দ্বিধায় বলতে পারি –
আমি নিতান্ত ‘ভদ্র ছেলে।‘
মিথ্যে কথায় ভরপুর কবিতা। কবিতা হয়েছে কিনা সেটাও প্রশ্ন।
-“কত দিন ধরে খাও তুমি?”
এমন অবান্তর সময়ে পুলকিত প্রশ্নে সিগারেটের ফিল্টারটাই কামড়ে বসে মাহমুদ। পেছনে ফিরে দেখলো স্নিগ্ধা দাড়িয়ে। নামটা অবশ্য সে জানতো না, নেমপ্লেটের সৌজন্যে জানতে পারলো। লাইব্রেরীর কর্নারে বসে মেয়েটাকে অনেকবারই দেখেছে। কিন্তু মেয়টা অনেক রূপবোতী।তাই আর বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে যায় নি। কিন্তু আজকে যেছে নিজেই কথা বলতে এসেছে। বৃহস্পতি কি তুংগে নাকি?
-“ আজই প্রথম।“ মনের অজান্তেই উত্তর দিলো মাহমুদ।
-“ও , আমি আগে প্রায়ই খেতাম। কিন্তু খেলে প্রচুর কাশি হয় তাই এখন ছেড়ে দিয়েছি। তো আজকে কি উপলক্ষে খাচ্ছো? বিরহ বিলাস নাকি? হা হা হা…”
এই ছিটগ্রস্থ মেয়েটার সাথে আর কথা বাড়াবে কিনা বুজে উঠতে পারছে না। কিন্তু এই আঠারো বছর
বয়সের কিছু স্বভাব স্বভাবতই এড়ানো যায় না। তাই কথা না বলেও থাকতে পারলো না।
-“জ্বী না, আজ আমার জন্মদিন। তাই একটা অবান্তর উপায়ে সেলিব্রেট করার চেষ্টা করছি।“
-“ও, আচ্ছা। কথা বলে ভালো লাগলো। তোমাকে প্রায় প্রতিদিনই লাইব্রেরীতে দেখতাম তাই কথা বললাম। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড আমাকে একটা সিগারেট দেয়া যাবে?”
-“সরি, একটাই কিনেছিলাম। মেয়েটা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেলো। যেনো ওর কোনো প্রিয় বস্তু হাতছাড়া হয়ে গেছে।“
-“আচ্ছা আরেকদিন দেখা হবে। “ আর এক মুহূর্তও দাড়ালো না। মেয়েটি চলে গেলো…
স্নিগ্ধাকে একটা সিগারেট না দিতে পেরে খুব খারাপ লাগছে মাহমুদের। ইস! আগে জানলে আরো একটা কিনতো সে।
আজ মাহমুদের দিনটা ভালো ছিলো না খারাপ ছিলো বুঝতে পারলো না। মেসে ফিরে খাতা কলম নিলো । কিছু লিখবে। খাটের উপড় উপুর হয়ে শুয়ে মেয়েলি ধরনের ফুলতোলা খাতায় কি লিখেছে সে জানে না। সারাদিনের ক্লান্তিতে নাকি এই আশাতীত ঘটনার শ্রান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসছে , যাই হোক তার দু চোখ জুড়ে চাঁদের অমাবস্যার মতো ঘুন নেমে আসলো । আধো ঘুম আধো জাগরণ। হালকা তন্দ্রার মাঝে চোখের সামনে ভেসে উঠলো- লাইব্রেরীর সেই দখীন কর্নারের চেয়ার। যেখানে বসে সেই ফুলতোলা খাতা দেখে কবিতা আবৃত্তি করছে। সেজুতি মুগ্ধ নয়নে ওর দিকে তাকিয়ে, না না ও সেজুতি নয় স্নিগ্ধা । ওর কালো মুখের রূপছটা গায়ে এসে বিধছে। স্নিগ্ধার গায়ের রঙ তো কালো নয়। ও কে? মাহমুদের তন্দ্রা গভীর নিদ্রায় ধাবিত হচ্ছে…ও আবৃত্তি করেই যাচ্ছে
পৃথিবীর সকল বৃক্ষ মরে যাক,
কোনো দুঃখ নেই।
সমুদ্রের সকল শৈবাল প্রাণ হারাক,
তবু দুঃখ নেই।
আমি হৃদয়হীন মানুষ,
অক্সিজেন পাম্প করবার বালাই নেই।
হয়তো ফুস্ফুস ভারী করবো
কোনো আগুন্তুক ধুমে।
নতুবা অপেক্ষায় রইলাম , শ্বাস শুষে নেবো-
কারোও ওষ্ঠ চুমে……………কারোও ওষ্ঠ চুমে……………

(৩)
রাত -১১টা ৩৮ ১১ই সেপ্টেম্বর,২০২১
আর মাত্র ২২ মিনিট পর একটা নতুন দিন শুরু হবে। পাল্টে যাবে রুটিন। সেদিনের পর গল্পের নায়ক মাহমুদের কি হয়েছিলো? হ্যাঁ, সেটাই বলছি। কি আর হবে ? মহামারির ছুটি শুরু হলো । অনেকদিন মাহমুদের সাথে আমার দেখা হয়নি। তবে কিছুদিন আগে সেই মেস ঘেষা ড্রেনটির পাশে ওর সাথে দেখা। দূর থেকে দেখে চিনতে পারিনি। মুখ শুকনো , চোখের নিচে কালি পড়া। চেহারায় যেনো যক্ষা আক্রান্ত বিদ্ধস্ত সুকান্ত ভাব। চিনতে পেরে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেদেদিলো , সে কি কান্না। অনেকদিন পর বন্ধুর সাথে দেখা হওয়ায় সুখের কান্নাই ভেবেছিলাম। না এই কান্না ছিলো জীবন যুদ্ধে পরাজিত ১৯ বছরের এক তরুনের কান্না।
শুনলাম সব । মাহমুদের বাবা মারা গিয়েছে এই করোনায়। তারপর আর কি আর পাঁচটা গরীব বাঙ্গালী পরিবারের মতন বড় ছেলে হিসেবে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। গতবছরের সেই ১৮ বছরের তরুন যেনো পৃথিবীতে পদদলিত হয়ে আজ ৮১ বছরের বুড়ো।
মেসে ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র আর কিছু টাকা ধার করতে এসেছিলো। আমার কাছে যা ছিলো তার সবটুকুই দিয়ে দিলাম। একটা কথাটা বলতে ওর লজ্জা হচ্ছিলো তাও বললো,
-“সাজিদ, সেজুতির খবর কিছু জানিস?”
-“কি আর বলি। গায়ের রং কালো হলে যা হয়। ভালো পাত্র জুটে গেছে তাই বাবা মা মেয়েকে আর ঘরে বসিয়ে রাখেনি। গেলো এপ্রিলে ওর বিয়ে হয়ে গেছে। আমি জানলাম স্নিগ্ধার কাছ থেকে।“
-“কোন স্নিগ্ধা? “
-“ওই যে সুন্দর মেয়েটা। যার সাথে ব্রিজের গোড়ায় তোর কথা হয়েছিলো। আমি কিন্তু পেছন থেকে সবই দেখেছিলাম সেদিন। থাক ওর কথা বলতে আর ভালো লাগছে না।’
-“কেনো কি হয়েছে ওর?”
-“কেনো জানিস না? জানবি আর কি করে ? তোর জীবনেই ক্রাইসিস যাচ্ছিলো। বড়লোক বাবা মায়ের বখে যাওয়া মেয়ে। নেশা করতো । প্রথমে বুঝতে পারিনি। একদিন শুনলাম আমাদের এক সিনিয়র ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে, কিন্তু তিন দিন পর ওর লাশ বরুরহাট পুকুরে পাওয়া গেলো।“

কথাটা মাহমুদের বুকে ধাক্কার মতন লেগেছিল, তা বেশ বুঝেছিলাম। শুধু যাবার সময় বলে গিয়েছিলো, “সাজিদ, এই জীবনটাকে নিয়ে ভালো থাকিস। আমার জীবনটা ১৮ বছরে এসে ধ্বংস হয়ে গেছে।“

ও চলে গেছে আর দেখা হবে কিনা যানিনা। এভাবেই কিছু ১৮ বছরের রঙ্গিন চশমা খসে পড়ে আমাদের চোখ থেকে। কিছু চাঞ্চল্য সজীবতা হারিয়ে গেছে গত ১৮ মাসে। তাদের সবার কথা আর বলা হয়ে ওঠে না। আর হয়তো বলাও হবেও না। লাইব্রেরির দখিন কর্ণারে হয়তো নতুন কেও বসবে । কি জানি তার জীবনেও কোনো মহামারি আসবে কিনা?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *