SANKAR BRAHMA

 340 total views

নিবন্ধ

আফগানিস্থানের কবিতা
শংকর ব্রহ্ম
———————

২৪শে আগষ্ট, ২০২১-য়ে
প্রথম অংশ প্রকাশের পর –

প্রথম অংশের লিঙ্ক পাঠকদের জন্য
নীচে দেওয়া হলো –
https://www.facebook.com/groups/storyandarticle/permalink/904953576828551/ ]

৩১শে আগষ্ট, ২০২১-য়ে প্রকাশিত
দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক-
https://www.facebook.com/groups/storyandarticle/permalink/909251153065460/

[ তৃতীয় ও চতুর্থ সমাপ্তি পর্ব ]
০৯/০৯/২১.

তৃতীয় পর্ব

বিশ্ব জীবনযুদ্ধের কাহিনী শরণার্থীদের কবিতায়। আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে এসে যারা পৌঁছেছে ইউরোপে। চোদ্দ থেকে আঠারো বছরের এমন কয়েকজন আফগানের কবিতায় উঠে এলো ঘর হারানোর যন্ত্রণার কথা৷
যুদ্ধের ভয়াবহতা৷

‘‘পৃথিবী যখন নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যায়,
তখনও জেগে থাকি আমরা
পেটে খিদে
বুকে তৃষ্ণা
পরিশ্রান্ত৷”

যে লিখেছে, তার বয়স মাত্র পনেরো বছর।
আফগানিস্তান থেকে ইরান হয়ে এসে পৌঁছেছে সুদূর জার্মানিতে৷
ইয়াসের নিকসাদা একা নয়, তার মতো আরও বহু কিশোর-তরুণ ইউরোপে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে আফগানিস্তানের ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য৷ তারা ‘দিবা-রাত্রির কাব্য’ চর্চা করে চলেছে সর্বদা৷ যখনই সুযোগ মিলছে৷

সেইসব কবিতা নিয়েই সম্প্রতি জার্মানিতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল৷ পুরস্কৃত করা হয় কমবয়সি ৬ জন আফগান কবিকে৷ তাদের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে৷ নিজেদের কবিতায় সকলেই লিখেছে দেশ ছেড়ে আসার যন্ত্রণা এবং ভয়াবহতা৷
ইয়াসেরের কাছাকাছি বয়সের আরেক কবি লিখেছে, –
‘‘চোখের সামনে
গ্রামের সমস্ত মানুষকে
মেরে ফেলছিল ওরা৷
একসময় সেই রক্তপাত বন্ধ হলো,
আমরা বুঝতে পারলাম,
কাবুলের পাখি বাজার পুরনো শহরে
আজকের মতো রক্তের খিদে শেষ হয়েছে ওদের৷”

জার্মানির L S – ‘লাসকার-শুলার’ সোসাইটি দিয়েছে এই পুরস্কার ছয়জন তরুণ আফগান কবিকে৷
অনেকেই জানেন, শুলার নিজেও ছিলেন এক বিশিষ্ট কবি এবং শরণার্থী৷ ইহুদি শুলার নাৎসি আমলে জেরুসালেমে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ তাঁর কবিতাতেও ধরা পড়েছিল শরণার্থীর যন্ত্রণা৷ ভিনদেশে জীবন কাটানোর যন্ত্রণা জড়িয়ে ছিল তাঁর লেখার পরতে পরতে৷ সে কথা মনে রেখেই প্রতি বছর শুলারের নামে একটি পুরস্কার দেয় শুলার ট্রাস্ট৷ এবার (২০১৮-সালে) সেই পুরস্কার পেলেন আফগান ছয়জর উঠতি তরুণ কবি।

পরিবার বিচ্ছিন্ন এইসব কিশোররা জানে না, আদৌ তারা আর দেশে ফিরতে পারবে কিনা৷
ইয়াসের যেমন বলেছে,
“ভিনদেশে চলে আসা কঠিন৷
কিন্তু আরো কঠিন নিজের দেশে ফিরে যাওয়া৷”

সে রাস্তা আপাতত বন্ধ৷ কিন্তু তারা ফিরতে চায় দেশে৷ দেখা করতে চায় পরিবারের সঙ্গে৷ পরিবার ভালো না থাকলে নিজেদেরও ভালো রাখা যায় না৷ তাদের কথায় সেটা পরিস্ফূট।

আফগান তরুণদের লেখা পড়ে এবং কথা শুনে মুগ্ধ জার্মানির বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীরা৷ অনুষ্ঠানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁরা বলেছেন, বয়সের তুলনায় অনেক বড় হয়ে গিয়েছে ওই সব কবিরা৷ কারণ, জীবনযুদ্ধ খুব কাছ থেকে দেখে ফেলেছে ফেলেছে তারা৷ যদি তাদের মতো প্রতিভাদের পাশে দাঁড়ানো যায়, তবে একটা অন্যরকম সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন সফল করা যাবে বলে জার্মানির মানবাধিকার সংগঠনের ধারণা৷

রাজনীতি চলে রাজনীতির মতো, কূটনীতি কূটনীতির মতো ৷ সেখানে কেবলই যুদ্ধ আর হানাহানি৷ তবু মানবতার জন্য যুদ্ধ আগেও ছিল, এখনো আছে৷ সে ব্যাটন কখনো ছিল লোরকার মতো কবিদের হাতে, বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়েও যাঁরা কবিতা বলতে পারতেন বুক উঁচিয়ে।
ছিল কবি একরম্যানের হাতে সেই ব্যাটন৷
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবরিজিনাল-এর যে কবি ঔপনিবেশিক দাসত্বের কথা লিখেছেন নিজের কবিতায়৷
এখন হয়তো সেই ব্যাটনই চলে এসেছে অসংখ্য আফগান, সিরিয়ো শরণার্থীদের হাতে৷ জীবনের এক অন্য উপাখ্যান লিখছেন তাঁরা৷

৪).চতুর্থ পর্ব

আফগানিস্থানের তালেবান কবিতা
————————————————

ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছে তালেবান কবিতার একটি সংকলন গ্রন্থ। এমন একটি সংকলন গ্রন্থ এই প্রথম ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
তালেবান কবিতাগুলি সংগ্রহ ও এর অনুবাদ করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন একদল ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ। সংকলনটি প্রকাশিত হবার কথাছিল ব্রিটিশ প্রকাশনী ‘C. Hurst & Co. Publishers Ltd’ থেকে। কিন্তু প্রকাশিত হয়েছে ‘কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস’ থেকে ২০১২ সালে।
ধারণা করা হচ্ছে তালেবান কবিতার এ সংকলনটি পড়লে ইংরেজি ভাষাভাষীরা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারবেন আফগানিস্তানের ওইসব মানুষদের, যারা ন্যাটো নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে দুই দশক ধরে।
সংকলনটির একজন সমন্বয়ক অ্যালেক্স স্ট্রাইক ভ্যান লিনচোটেন জানান, তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে এবং তৃণমূল পর্যায়ে অনুসন্ধান করে ২৪০টির মতো তালেবান কবিতা সংগ্রহ করেছেন, যা তালেবান কী বা কেন এটা বুঝতে সহায়তা করবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বে যত তালেবান ওয়েব সাইট রয়েছে তা গভীরভাবে অনেকেই পর্যবেক্ষণ করেন, অনেকেই রয়েছেন যারা তালেবানদের যে কোনো লেখা পড়ার পাশাপাশি এসব কবিতা পড়তে আগ্রহী। এটাই হচ্ছে একমাত্র পথ তালেবানদের বোঝার, তালেবানরা কী পড়ছে এবং তারা কি ভাবছে কিংবা কী বলছে তা জানার জন্য।

কবিতাগুলিতে আফগানিস্তানের পক্ষে গেরিলা-যোদ্ধাদের এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রেরণা দেওয়া হয়েছে।
যেমন–

” আমি চিনি অন্ধকার গিরিখাত
আমি সবসময় আমার কাঁধে একটি রকেট লাঞ্চার বহন করি।

আমি চিনি উত্তপ্ত গিরিখাত
আমি সব সময় শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রতীক্ষায় থাকি

আমি জানি যুদ্ধ, সংঘাত, এবং বিরোধক-শক্তি
আমাকে ফাঁসি কাঠে ঝোলাতে চায়,
আমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হলেও
আমি সত্য কথাই বলব…

কিন্তু তাদেরও শান্তির জন্য কাঁদতে হবে :

যাতে নিষ্ঠুরতার শেষে
একটি পিঁপড়েও না মরে কারও হাতে… ”

সংকলনভুক্ত বেশির ভাগ তালেবান কবিতাতেই উঠে এসেছে, বিদেশি পশ্চিমা শক্তিকে উৎখাত করার পক্ষে প্রচার। ন্যাটো বাহিনীর আক্রমণে বেসামরিক লোকদের মৃত্যুতে, বেনিয়াদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রকাশ। তবে এ’সব বিষয় ছাড়াও অনেক কবিতায় রয়েছে ধর্মের প্রতি ভক্তি, ঈশ্বর-প্রেম এবং নস্টালজিক অনুভূতির মতো বিষয়ের প্রকাশ।
তালেবান কবিতার সংকলন ইংল্যান্ডে প্রকাশিত হয়েছে জুন মাসে(২০১২) এবং যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বরে(২০১২).

নীচের এই কবিতাগুলো কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘পোয়েট্রি অফ দ্যা তালেবান’ বই থেকে নেওয়া। সম্পাদনা করেছেন অ্যালেক্স স্ট্রিক ভান লিনশোটেন ও ফেলিক্স কিউন। দু’জনেই কিংস কলেজ লন্ডনে ওয়ার স্টাডিতে পিএইচডি করা।

(ভাষান্তর করছেন – কায়েস সৈয়দ)

আমি অগ্নিশিখায় বাঁচি
আব্দুল বশির ওয়াতানিয়ার
—————————————

আমি একটি ফুলের মতো কাঁটায় বেঁচে থাকি
প্রজাপতির মতো আমি অগ্নিশিখায় বাঁচি
যদি কেউ আমার কথা জানতে চায়
উপত্যকায় বাস করা আমি একজন আফগান
অন্য কারো প্রাসাদ পছন্দ করি না
আমি আফগানের সন্তান
বাস করি তাঁবুতে
যখন দেশের ক্ষত দেখি
শুরু করি চিৎকার আর দীর্ঘশ্বাস পড়ে
চিরদিন আমি আমার দেশের কথা ভাববো
কি হলো আফগানদের?
চিন্তার মধ্যে থাকি,
শত্রুরা এলো আর আজ হয়ে গেল আমাদের মনিব
ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল আমার দেশ
আমি বাস করি ধ্বংসস্তূপে
আমার দেশ এখানে চিৎকার করে কাঁদে
এ’জন্য আমি আরও একবার বিষণ্ণতায় ডুবি
আমার চোখের জল ধুয়ে দেওয়ার মত কেউ কি আছে?
আমি কাবুল, বাস করছি লাল অগ্নিশিখায়
আলো ছেড়ে গেছে আমার স্বদেশ
প্রতি পদক্ষেপে পড়ে যাচ্ছি
অন্ধকারে থাকি
আমি ওয়াতানিয়র, আমার দেশের জন্য শোকাগ্রস্ত

প্রতিদিন আমি জেগে থাকি ভোর পর্যন্ত
জন্মভূমি ‘শিন গুল আজিজ’
আমার প্রিয় জন্মভূমি পুড়ছে অথচ আমি দেখছি
ধ্বংস হয়ে গেছে এর মাটি আর মরু,
আমি দেখছি
হায় স্রষ্টা, কী নৃশংস! গড়ে তুলো আমার স্বদেশ!

আফগানরা চলে যাচ্ছে, আমি দেখছি
আমি জানি না কে আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে
চক্রান্ত করেছে?
আমার আফগান ভাই কাঁদছে, আমি দেখছি
চোখের পানি ফেলে কেঁদে ফেলেছে ‘শিন গুল’
রক্ত ঝরছে হৃদয় থেকে, আমি দেখছি

অশ্রু ওয়ারদাক
যতদিন এই অবস্থা চলতে থাকবে
কিছু লোক ধনী হবে, কিছু হবে গরীব
আফগানিস্তান সবসময় হবে সর্বনাশগ্রস্ত

প্রত্যেকে শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবে
এই নিষ্ঠুর ড্রাগন থেকে যাবে এইখানে
এই নিপীড়িত জাতি হবে সর্বনাশগ্রস্ত
আমাদের জীবন হয়ে উঠবে কঠিন
সংকটে এ জাতি

ওয়ারদাকের অশ্রু ঝরতে থাকবে
শত্রুরা থাকবে নিরাপদ

সামিউল্লাহ খালিদ সাহাক
মানবতা
——————————–

১.

পৃথিবী থেকে সবকিছু চলে গেছে
পৃথিবী আবার শূন্য হয়ে গেছে
মানব পশু
মানবতা পশুত্ব
সবকিছু চলে গেছে পৃথিবী থেকে
কিছুই দেখি না এখন যা কিছু দেখি তা আমার কল্পনা

২.

হারিয়ে গেছে মানবতা
হারিয়ে গেছে আফগানিয়াত
হারিয়ে গেছে আমাদের আগ্রহদীপ্ত সম্মান

৩.

তারা আমাদেরকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে না
তারা আমাদেরকে পশু হিসেবেও গ্রহণ করে না
আর যেমনটা তারা বলে
মানুষের আছে দুইটি মাত্রা
মানবতা আর পশুত্ব
আমরা আজ উভয়েরই বাইরে

৪.
আমরা পশু নই
আমি তা নিশ্চিতভাবে বলছি
কিন্তু
মানবতা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে
আর তা কবে ফিরে আসবে তাও জানি না
আল্লাহ আমাদেরকে তা দান করুক
আর আমাদেরকে সাজিয়ে তুলুক এই অলঙ্কার দিয়ে
মানবতার অলঙ্কার

আপাতত এটাই শুধু আমাদের কল্পনায়
স্বাধীনতার অপেক্ষায় লুতফুল্লাহ
অন্ধকারের কাফেলায় আমি পুড়তাম
দেশের যন্ত্রণায় আর শোকে আমি পুড়তাম
আমি আমার জন্মভূমির স্বাধীনতার অপেক্ষায়
এজন্য অভিবাসনের অগ্নিশিখায় আমি পুড়তাম
কেউ আমার প্রতি তাদের সমবেদনা প্রকাশ করেনি

আমি একা একা দুশ্চিন্তায় পুড়তাম
সারা পৃথিবী জুড়ে সুখ-স্বপ্ন আছে
দুঃখের অন্ধকার রাতে আমি সব সময় পুড়তাম
বিদায় ‘আলম গুল নাসেরি’
আমাকে যেতে দাও,
অনুমতি দাও তোমাকে বিদায় জানাতে

প্রিয় মা! আমি আর থাকবো না, বিদায়
ইংরেজরা আমার বাড়ি দখল করেছে
কোনভাবেই আমি আর থাকতে পারছি না
তারা আমাদের আত্মমর্যাদা আর সম্ভ্রম নিয়ে খেলছে
আমি আমার বিবেকের কাছে লজ্জিত

এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভালো যুদ্ধে যাওয়া
নক্ষত্র হায়দার
যে নক্ষত্রটি আটকে আছে কালো মেঘে
বন্ধুরা! সেটা আমির জীবনের নক্ষত্র
সে আমার জীবনের আকাশে আলো দেয় না

আলো ছাড়াই তাকে দেখা যায় স্পষ্ট
কাফেলা থেকে আলাদা হয়ে সে হেঁটে যায় ঘুমন্ত
ব্যর্থ হয় সে তার গন্তব্যে, সে এক নিরানন্দের নক্ষত্র

আফগানদের বিবেক! বন্ধ করো দিবাস্বপ্ন
না! তোমার নক্ষত্র পৃথিবীর সর্বোচ্চ
হায়দার! শান্তির সুযোগ এখনও হারিয়ে যায়নি

তোমার নক্ষত্র বিপদের সাথে সংযুক্ত
শুধু আফগান হওয়ার কারণে আমি হতে পারিনি বীর সায়াদুল্লাহ
যাই হোক না কেনও আমি কারো সাথে সহযাত্রী হয়ে উঠিনি

তবে উপরওয়ালাকে ধন্যবাদ যে আমি বদলে যাইনি ঋতুর মতো
ও পৃথিবীর মানুষ, এতো বড় বিজয় সত্ত্বেও

শুধুমাত্র আফগান হওয়ার কারণে আমি হতে পারিনি বীর
আমার দুর্ভাগ্য কোন কোন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে?
আমি আমার আত্মীয়দের কাছে অপরিচিত হয়েছি
অথচ হয়ে উঠিনি অপরিচিতদের আত্মীয়
নিজের কাছে নিজেকে অবিশ্বস্ত লাগছিল
বিচ্ছেদে আমি হইনি উন্মাদ

নসরত
চার লাইনের কবিতা
—————————–
১.
চলো এক অপরকে আলিঙ্গন করি
ঐক্যবদ্ধ হই চলো আমরা
এখন সময় প্রেম আর ভ্রাতৃত্বের
কেটে গেছে ঘৃণার সময়

২.
শত্রু আমার হৃদয় কেটেছে
চোখ থেকে ঝরেছে অশ্রু
নিরোধ্য তুমি, পাথরের চেয়েও কঠিন তোমার হৃদয়
আমি কাঁদি তোমার জন্য আর তুমি আমাকে নিয়ে হাসো

৩.
এখন সময় ফুল আর ঝোপঝাড়ের
সারিবদ্ধ পাখি এসেছে উপর থেকে
জীবন এখন গানময়
আঘাত করবো শত্রুকে পাথর দিয়ে

৪.
এই ধূলিময় আর কর্দমাক্ত ঘরবাড়ি আমরা ভালোবাসি
এ দেশের ধূলিময় মরুভূমি আমরা ভালোবাসি
কিন্তু তাদের আলো চুরি করে নিয়ে গেছে শত্রু
এই আহত কালো পাহাড়গুলোকে আমরা ভালোবাসি

৫.
যে আলো ছড়িয়ে পড়েছিলো হেরা থেকে
সে আলো ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ আফ্রিকার সবখানে
শান্তির বাণী নিয়ে এলো মোহাম্মদ
বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা আর নিপীড়ন ম্লান হতে শুরু করে

৬.
সূর্যের রশ্মি আমার কষ্টের জন্য কাঁদে
আমার হৃদয়ের ফুল যেন ভেঙে যাওয়া ডাল
দাফন করা হয় স্বপ্নগুলো
আশায় যা বিনিয়োগ করি লুট করে নেয় শত্রু
গজল সাফই
ইংরেজরা আমার আত্মার ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে
সেই লাল, লালমুখই কাফেররা ঘুরে বেড়াচ্ছে
কিন্তু এটা দুঃখজনক যখন আমি দেখি
আমার আফগানরা ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের সাথে
এই বিধবা আর এতিমদের জন্য কাঁদা
হাসপাতালে আমার আহতদের জন্য কাঁদো
বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে কারও পা কারও হাত
কবর-স্থানে আমার শহীদদের জন্য কাঁদো
আমি কখনও তাদের ভুলবো না
আমার হৃদয়ে বিরাজ করে কুরআনের ভালোবাসা
যারা দেশ বিক্রির দালালি করতে ছিল
ইংরেজদের দাসেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে
তারা আজ আমার মাথা নিয়ে খেলে
তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে পিজওয়ানের সাথে
আজ সে আমাকে গালি দেয়
তারা লজ্জিত, ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীতে

মীর আহমেদ
শ্লোক
————————–
১.
অনেক কষ্ট সহ্য করেছি
কেঁদেছি অন্ধকার রাতে
যখন আমরা আমাদের আর্তনাদ ছাড়ি
শত লোককে আঘাত করতে পারে একটি তিক্ত শব্দ

২.
কাঠের গুঁড়িতে একসাথে জ্বলেছি আমরা
ভেজা কাঠ কখনো আগুন নেয় না
জাহান্নামের আগুন থেকে আমি আমাদের মুক্তি আশা করি
এখানে শুয়োর আমার ওপর আরও আগুন লাগায়

৩.
স্বীকার করি আমরা হয়তো ভদ্রলোক নই
কিন্তু আমরা বিদেশীদের কাছ থেকে পালাইনি
বিদেশীরা আমাদের সম্পর্কে কি ভাবে?
নিজ দেশ থেকে কেউ আমাদের তাড়িয়ে দেয়নি।

তিনটি চিত্তাকর্ষক শ্লোক
জাহিদ উল-রহমান
——————————-
মুখলিস
—————

১.
আমার প্রতিদ্বন্দ্বী আমাকে আঘাত করে পাথর দিয়ে
একের পর এক কান্নার রোল
প্রতি মুহূর্তে আমি আহত আমার হৃদয়ের পাতায় পতিত হয় তীর

২.
হৃদয়ের গোলাপ আঘাত পেয়েছে, আঘাত
ধ্বংস হয়েছে মিহরাব আর নিশ্চিহ্ন হয়েছে মসজিদ
কান্নায় ভরে গেছে আমার প্রতিটি গজল আমার জীবনের বই রক্তে লাল

৩.

আমি জানি না কোন কারণে সে আমাকে হত্যা করছে
এই লাল আর কালোরা আমাকে হত্যা করছে
আমি নিজে মরে যাওয়ার চেয়েও বেশি কষ্ট পাচ্ছি যে শত্রু আমাকে হত্যা করছে না,
হত্যা করছে আমার ভাইকে –

আফগান কবিতা’র আধুনিক সময়ের পট পরিবর্তনে যেমন আন্তর্জাতিক কবিতাগত ভাবনার (ইমেজিস্ট, সিম্বলিস্ট, সু্ররিয়াল, পোস্ট স্ট্রাকচারাল, পোস্ট মর্ডান ইত্যাদি) একটি ভূমিকা ছিল, তেমনি ছিল আফগানিস্তানের যুদ্ধ, বিদ্রোহ, সন্ত্রাসের ভূমিকাও।
এত বিশাল একটা কবিতার জগত, তাকে লিখতে গেলে আরও বড় পরিসর চাই। নিষ্ঠা চাই।

————————————–
ঋণ স্বীকার –
১).স্বপন রায়(আফগানিস্থান : কিছু কবি, কয়েকটি কবিতা)
২).আনিসুর রহমান অপু (একগুচ্ছ কবিতা)
৩).মঈনুস সুলতান(অনুবাদ:আফগানিস্তানের কবিতা)
৪).স্টেফান ডেগে/এসজি (লাইভ টিভি)
৫).কায়েস সৈয়দ (ইত্তেফাক/এসজেড)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *