Sarmistha Guha Roy (Majumder)

অসুখে বন্দী শিশুর জীবন
শর্মিষ্ঠা গুহ রায় (মজুমদার)

সেইযে গতবছরের প্রথমদিকে,আমার জন্মদিন ছিল।কী সুন্দরই না ছিল সেই দিনটা! তার কিছুদিন পরে কী যে হল! সব ওলোটপালোট হয়ে গেল– সবকিছু।বাইরে বেরোনো মানা,স্কুলে যাওয়া মানা,আঁকার ক্লাসেও যাওয়া মানা।বড়দের থেকে জানলাম-ভয়ঙ্কর এক অসুখ এসেছে পৃথিবীতে, চারিদিকে শুধু ভয় আর ভয়।
একমাস দুমাস হয়ে গেল এইভাবে।প্রথমে কিন্তু  খারাপ লাগছিল না।বেশ নতুন ধরনের সবকিছু।অনলাইনে স্কুলের ক্লাস,নাচের ক্লাস,আঁকার ক্লাস বেশ হচ্ছিল।ভালোও লাগছিল সব।বাবা মা বেশীক্ষণ সঙ্গে থাকছিল যে!
জানো,আমি আস্তে আস্তে ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে গেলাম।একদম বন্দী।আমার বাইরে যেতে ইচ্ছে করছিল।স্কুলে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল।বন্ধুদের কতদিন দেখিনা।একটু ভুল বললাম,অনলাইন ক্লাসে সবাইকে তো দেখাই যায়।সবাই একটু যেন বড় হয়ে গিয়েছিল।আমার একটা বন্ধুর ছোট চুল ছিল,ওর না বড় চুল হয়ে গিয়েছিল।তবু নিজের চোখে সামনাসামনি তো দেখা হয়না! টিফিন ভাগ করে খাওয়াও হয়না।স্কুলের সবুজ মাঠে দৌড়ানোও যায়না।খুউউব মন খারাপ করছিল গো,খুব মন খারাপ করছিল।
মাকে বললাম -‘মা সব কবে ঠিক হবে?স্কুল কবে যাব?’ মা বলল -‘আর কিছুদিন পরে।’কিন্তু কবে?কবে আসবে সেই দিন?তারপর আস্তে আস্তে মনে হল সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে।কী মজা!আমি খুব খুশী।দেখতে দেখতে আমার আবার জন্মদিন চলে এল।সবকিছু আবার আগের মত হবে, আগের মত।অসুখটা নাকি আর হচ্ছেনা আগের মত।
কিন্তু  না! হঠাৎ অসুখটা পৃথিবীতে আগের মত ফিরে এল।একটু আধটু যাও বা বাইরে যেতাম, তাও বন্ধ হয়ে গেল।আমার স্কুল আর খুলল না।অনলাইন ক্লাসে পরীক্ষা দিয়ে নতুন ক্লাসে উঠে গেলাম।বন্ধু,মজা,খেলা,ক্লাস সব মোবাইল ফোনে বন্দী হয়ে গেল।জানালা খুললে যেমন আলো আসে,তেমনি মোবাইল ফোনেই যেন সারা পৃথিবী আমার কাছে আসে।
আমাকে কেউ কিছু বলেনা।কিন্তু  বড়দের মুখে শুনতে পাই,আমাদের পাড়ায় অনেকের অসুখ হয়েছে।খুব ভয় লাগে,আমার হবে নাতো?আমি চুপ করে থাকি।চেনাজানা কে জানি মারা গিয়েছে অসুখে।আমি আরও ভয় পাই।রোজ ভয় পাই।টিভিতে মাঝেমধ্যে খবর দেখে ফেলি।কত কান্না,কত দুঃখ মানুষের! আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি-সব ঠিক করে দাও আগের মত।কেউ যেন না কাঁদে।সবাই হাসবে,সবাই খেলবে।যেমন এখন আমার পার্কে গিয়ে সবার সাথে খুব খেলতে ইচ্ছে করছে।জানি যেতে পারব না।তবুও…..।
আমি এখন একটা ছবি আঁকছি, কীসের জানো?একটা সুন্দর পৃথিবী।নীল আকাশ,সবুজ মাঠ,কত সুন্দর ফুল ফুটেছে।দূর পাহাড় থেকে ঝর্ণা নেমে এসেছে।আর আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে খুব দৌড়াচ্ছি।মাঠটা কিন্তু শেষ হয়ে যাচ্ছেনা।অনেক বড় মাঠতো, তাই।আর আমাদের কারোর মুখে মাস্ক নেই।তাইতো খুব সুন্দর ফুলের গন্ধ পাচ্ছি।আমার ঘুম পাচ্ছে।আমি যেন সত্যি দেখতে পাচ্ছি-ঐতো দূরে পাহাড়টা।যেতেই হবে ঐ ঝর্ণা টার কাছে।আমি তাই দৌড়াচ্ছি,আরও জোরে…….আরও জোরে…..ঐতো, ঐতো সেই সেই সুন্দর পাহাড়……।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *