Shampa Saha

#আমবুড়ো_পর্ব_৭
#শম্পা_সাহা

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা আর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গলা ব্যথা হয়ে যায় তবুও সদাই দেয় না। আবার বেশি চেঁচালে মাল দেবার হাতা দিয়ে হাতের ওপর দুচার বারি বসিয়ে দেয়।আমবুড়ো সেই বয়সেই বুঝে গেছে, অনেক টাকা থাকলে ব্যাগটা যদি ওরকম সেন বাবুর মত ফোলা হয় তবে সবাই মানবে,সবাই সম্মান করবে, কেউ কিচ্ছু বলবে না ।

রাম মুদির দোকানে গেলে সবার আগে মালটা ওকেই দেবে ।আবার একটা সিগারেটও।যদিও সিগারেট বিড়ি ও এখনো খায় না কিন্তু তবুও ওটা যে সম্মান দেখানো সেটা ভালই বোঝে। তাই ওই রকম হবার ওর ভীষণ ইচ্ছে। কিন্তু কিভাবে? কিভাবে?

পেরেক, কাগজ কুড়াতে গিয়ে তো গায়ে ঘা হলো, চুরি করতে গিয়ে খেলো পেটানি! তাহলে?তেরো চোদ্দ বছরের আমবুড়োর মাথায় ঘুরতে থাকে টাকা রোজগারের চিন্তা !ততদিনে ওদের ঘরের সবাই বাড়ি তৈরীর টাকা জোগাড়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে ।ভাবনা চিন্তা চলছে আমবুড়োকেও একটা কাজে লাগানোর । শান্তি মামা অনেক খুঁজে পেতে একটা কারখানায় কাজ জোগাড় করলেও শেষে পিছিয়ে এল। কিন্তু খবরটা পাওয়া মাত্র ও নিজেই বাড়িতে জগড়াটগড়া করে ,গেল সেই কারখানায়।

যদিও কোনো কাজ ও জানে না,তাই কাজ যে সহজে জুটবে এমনটা ও নিজেও ভাবেনি।তবে জুটলো। ভ্যান টানার কাজ। যদিও ও ভ‍্যানট‍্যান কেন সাইকেলটাও চালাতে পারে না কিন্তু কার্যত কোম্পানি থেকে মাল বাসস্ট্যান্ডের দোকানে নিয়ে যাওয়াই কাজ। সে চালিয়েই হোক আর টেনে, ঠেলেই হোক ,মাল পৌঁছানো নিয়ে কথা। ভ্যান চালানো শিখে নিতে কতক্ষণ ?

এক কথায় রাজি ।বেশ আনন্দ উৎসাহ নিয়ে মাসের পয়লা তারিখ সকাল সাতটায় দাদা দিদি, বাড়ির অন্যসব বাচ্চাদের মত একটা কাপড়ের থলিতে,অ্যালুমিনিয়ামের টিফিন বক্সে ভাত ডাল আর আলু সেদ্ধ নিয়ে চলল সেনবাবুর মত মোটা ফোলা টাকার ব্যাগ বানাতে!

আমবুড়োর বোধ বুদ্ধি কম থাকলেও জীবনের মূলমন্ত্রটা কিন্তু ও বুঝেছিল ঠিকঠাক। তাই ওকে যতই হাবাগোবা,ক‍্যাবলা,মাথামোটা ,গাধা ,শেফালী মামীর ভাষায় আবলদা বলা হোক, জীবনের মূল আস্বাদ যে অর্থ, তার প্রয়োজনীয়তা বুঝেছিল একেবারে প্রথমেই। তাই যখন ওর বয়সী বন্ধুরা এদিক-ওদিক খেলে বেড়াতো ও কিন্তু নিয়ম করে কারখানার যেত।

শেফালী মামী , শান্তি মামা বারবার বারণ করলো
-তোকে ঠকিয়ে দেবে! কি দরকার?
আসলে এখানে ওদের একটা হিসাব ছিল। ও বাড়ি থাকলে ফুল ভাঙ্গাটা হয়। তাতে মামীর উপার্জন সহজ ।কিন্তু ও না থাকলে এত ফুল ভাঙবেই বা কে? আর জলই বা রাস্তার কল থেকে কে টানবে?

কিন্তু অনেক আইসক্রিম,কেক বা চাওমিন খাওয়ার লোভে আমবুড়ো লেগে গেলো কারখানায়,কাজে।ওর মাথায় তখন শুধুই ঘুরছে সেন বাবুর মোটা ফোলা টাকার ব‍্যাগ।

কাজ কিছু না জানলেও,শেখবার মতন বোধবুদ্ধিও যে ওর নেই ,তা মালিক দেখেই বুঝে গেল ।কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও বুঝলো যে ওকে দিয়ে যা খুশি তাই করানো যায় ।যেমন বাড়িতে বাজার পৌঁছে দেওয়া,ঘর ঝাঁট দেওয়া, কারখানার সামনে কুকুরের পায়খানা পরিষ্কার করা বা মালিকের বুটের কাদা!

যখন অন্য লোকেরা এটা তাদের কাজ নয় বলে এড়িয়ে যায় বা করতে বাধ্য হলেও করে বিরক্তি সহকারে তখন আমবুড়ো সেটা করে হাসি মুখেই। যেন এটাই ওর কাজ আর এর জন্যই ও কারখানায় আসে।
– সুজিত সামনে কাদা হয়েছে
ছুটলো সুজিত মানে আমবুড়ো বালি আনতে।
মালিকের মাথা ধরেছে বা পা ব‍্যথা, আমবুড়ো লেগে গেলো মাথা বা পা টিপতে। জল নেই ,জল আনার মেয়েটা আসেনি ?সঙ্গে সঙ্গে বলার আগেই সুজিত ছুটলো জল আনতে !এটা যে ও কোনো ধান্দায় বা বিশেষ উদ্দেশ্যে করে না তা ওর সঙ্গে দু এক মিনিট কথা বললেই বোঝা যায়।

ওর কথার সারল্য সহজেই ছুঁয়ে যায় সবার মন।এমনকি ওদের ঘরের চৌকির তলায়, টিনের ট্রাংকে বিশাল তালা দিয়ে যে বাড়ি করার টাকা জমানো হচ্ছে, তাও ও যে-কোনো লোককে এক দেখাতেই গল্প করতে করতে বলে দেয়। মালিক বা বাকি কর্মীদেরও ও খুব সহজেই প্রিয় পাত্র হয়ে উঠল দুদিনে। সে তো স্বাভাবিক। ওকে দিয়ে যে নিজেদের কাজও করিয়ে নেওয়া যায়।আর সেটাও ও করে হাসিমুখেই।এমনকি ছুটিছাটার দিনেও ও ঠিক কারখানায় চলে আসে ।কারখানার বাইরে বসে থাকে ,যদি কোনো কাজ থাকে?বাড়তি কাজ মানেই বাড়তি পয়সা!কোথাও অর্ডার পাঠাতে বা আনতে হবে?ও এক পায়ে খাড়া।শেষ পর্যন্ত ওই হয়ে উঠলো মালিকের নিশ্চিন্ত ভরসা।অন‍্য কাউকে দিয়ে করানোর বদলে ওকে দিয়ে করালে খরচ যে অনেক অনেক কম!

আসলে গরীব বড়লোক, বোকা চালাক, সবল দুর্বল সবাই চায় সুযোগ নিতে।অপরকে ঠকাতে,অপরকে দিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নিতে,ফাঁকতালে খাটিয়ে নিতে।এক্ষেত্রে মালিক বা কর্মচারী কেউই ব‍্যতিক্রম নয়।তবে আমবুড়োর তাতে কিছুই যায় আসে না।ওর মানিব্যাগে টাকা থাকলেই হলো।

ক্রমশ…
©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *