স্বার্থপর ( ছোটগল্প ) -শেখ মোহাম্মদ হাসানূর কবীর

Sheikh Mohammad Hasanur Kabir

 193 total views

স্বার্থপর
( ছোটগল্প )
-শেখ মোহাম্মদ হাসানূর কবীর
আমার সাথে আগে কখনো হিমাদ্রির দেখা হয়নি। তবে অল্প কদিনের পরিচয়ে আমার অন্তরের গহীনে হিমাদ্রি যে নোঙর ফেলেছিলো, তা অদ্যাবধি অস্খলিতই রয়ে গেছে। নিরন্তর চেষ্টায় না তাকে ভুলতে পেরেছি, না সে অদৃশ্য বন্ধন থেকে এতটা বছরেও মুক্তি মিলেছে।

তখন সবেমাত্র আমার বিয়ে হয়েছে। পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় জড়াজীর্ণ দোতলা একটি বাড়িতে থাকি। নতুন বিয়ে হওয়া সত্ত্বেও আমার প্রতি খুব একটা মনোযোগ ছিলোনা জাহিদের। মন খারাপ করে সারাদিন বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকতাম। এভাবেই আমাদের দাম্পত্য জীবনের বছর কয়েক নিরুৎসব নিরানন্দেই কেটে গেছে।

জাহিদের এরূপ অবহেলা প্রথম দিকে আমাকে পীড়া দিলেও ধীরে ধীরে সেটা আমার নিয়তি বলেই আমি মেনে নিয়ে ছিলাম। অবশ্য মেনে না নিয়েও কোনো উপায় ছিলোনা। অভিমান করে বাবার বাড়ি চলে যাবো এমন দুঃসাহস দেখাবার সামর্থ আমার ছিলোনা। কারণ আমার বাবার আর্থিক অবস্থা খুব সঙ্কটাপন্ন ছিলো। অসুস্থ মা আর ভাই-বোনদের নিয়ে বাবা কোনো রকমে খেয়ে, না খেয়ে দিন পার করতেন। আর তাই বাধ্য হয়ে আমি জাহিদের সমস্ত অন্যায় আচরণ নিঃসঙ্কোচে মেনে নিয়েছিলাম।

একদিন অপরাহ্ণে জাহিদের কোনো এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে নিমন্ত্রণ শেষে ঘরে ফিরে শ্রান্ত হয়ে জানালার পাশে গিয়ে বসলাম। হঠাৎ আমার ফোন বেজে উঠলো। ও পাশ থেকে একটি ভীরু আগ্রহভরা কণ্ঠ কোনোরূপ ভণিতা না করেই সোজাসুজি আমাকে বললো-
কেমন আছেন? আপনি আমাকে চিনবেন না।বিয়ে বাড়িতে আজ আপনাকে প্রথম দেখেছি।
ময়ূরকণ্ঠী শাড়িতে আপনাকে বেশ লাগছিলো !

আমি কিছুটা বিব্রত, সেই সাথে বিরক্তও হলাম। অপরিচিত একজন অহেতুক প্রশংসা করছে। কারণ আমি জানি শাড়িতে আমাকে কখনোই মানায় না। তবে কোনো বিশেষ উৎসবে অভ্যাসবশত মাঝে মধ্যে পরি। শাড়ি পরার অভ্যাসটা আমার কলেজ জীবন থেকেই। ম্যাট্রিক পাস করে কলেজে যখন ভর্তি হই, তখন কলেজের নবীন বরণ উৎসব উপলক্ষে বাবা আমাকে শখ করে একটি শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন। শাড়িটি কিনে এনে বাবা আমার পড়ার টেবিলে রেখে বলেছিলেন-
বুড়ি, যা শাড়িটা পরে আয়; দেখি, তোকে আমার মায়ের মতন লাগে কিনা ?

খুব ছেলেবেলায় বাবা তাঁর মাকে হারিয়েছিলেন। আর তাই জন্মাবধি মায়ের সে শূন্যতা বাবাকে ভীষণ কষ্ট দিতো। আমি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই বাবা সবাইকে বলে বেড়াতেন, আমি নাকি দেখতে অবিকল তাঁর মায়ের মতন হয়েছি। আমার মাঝে দাদিকে কল্পনা করে বাবা তাঁর মায়ের শূন্যতা পূরণ করার চেষ্টা করতেন।

আমি রাগ করে ফোনটা রেখে দিলাম। পুনরায় ছেলেটি ফোন দিয়ে বললো-
রাগ করবেন না, প্লিজ ! আপনাকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করার জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
আমার মনটা খুব বিষন্ন হয়ে গেলো। মনে মনে ভাবলাম, ছেলেটির সাথে রাগ করে ফোনটা রেখে দেয়া ঠিক হয়নি।
তারপর বেশ কয়েকদিন পার হয়ে গেলো। ছেলেটি আর ফোন দিলোনা। ছেলেটির সম্পর্কে আমার কৌতুহল বেড়ে গেলো।

একদিন শ্রাবণের সন্ধ্যায় অবিরাম বৃষ্টি শেষে আকাশ ঘন মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। মনটা খুব অস্থির বিবাগী হয়ে গেলো। আপন জনের সান্নিধ্য পেতে মনটা আনচান করতে লাগলো। দীর্ঘ সময় জাহিদের অপেক্ষায় থাকলাম। জাহিদ অফিস থেকে বাসায় ফিরলো না। অবশেষে জাহিদের উপর বিরক্ত হয়ে ছেলেটিকে ফোন দিলাম। ফোন পেয়ে ছেলেটি ভয়ে সংকোচিত হয়ে পড়লো। আলাপচারিতায় জানতে পারলাম, ওর নাম হিমাদ্রি। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে জোওলজিতে পড়ে। সেদিন অনেক কথা হলো হিমাদ্রির সাথে। কথা বলে ভালোলাগলো হিমাদ্রিকে। তারপর থেকে সারাক্ষণ হিমাদ্রির ফোনের অপেক্ষায় বসে থাকতাম।

হিমাদ্রির সাথে পরিচয়ের পর থেকে আমার দিনগুলো ভালোই কাটছিলো। দুজনে শিকল ছেঁড়া বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়িয়েছি। একজনের প্রতি আরেকজন দারুণ টান অনুভব করেছি। এভাবে কখন হিমাদ্রির সাথে আমার সম্পর্ক চূড়ান্ত পরিণয়ের দিকে গড়িয়েছে টের পাইনি। হিমাদ্রিকে ছাড়া আমি একমুহূর্ত ভাবতে পারতাম না। আমার সমস্ত অস্তিত্ব, আমার সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে তখন হিমাদ্রির আনাগোনা।

হিমাদ্রিদের পারিবারিক অবস্থা স্বচ্ছল ছিলোনা। টিউশনির টাকায় কোনো রকমে ওর পড়াশোনার খরচ চলতো। আমি মাঝে মাঝে টাকা দিলে হিমাদ্রি নিতে চাইতো না। আপত্তি করতো। দরিদ্র হলেও হিমাদ্রির আত্মসম্মানবোধ ছিলো প্রবল। ওর এমন প্রাচুর্যময় ব্যক্তিত্ব আমাকে পাগল করে তুললো। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলাম সবকিছু ছেড়েছুড়ে হিমাদ্রির কাছে চলে যাবো।

একদিন হিমাদ্রিকে ফোন দিয়ে আমার মনের গভীরে অঙ্কুরিত আকাঙ্ক্ষার কথা জানালাম। হিমাদ্রি তেমন সাড়া দিলো না। ওর সাথে দেখা করার জন্য আমি ডাঙায় তোলা মাছের মতন ছটফট করতে লাগলাম।
দিন যতই গড়াতে থাকলো, হিমাদ্রি ততই আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগলো। আমি নিজেকে কিছুতেই বুঝাতে পারছিলাম না। অকুল সায়রে ভাসিয়ে দিয়ে হিমাদ্রির দূরে সরে যাওয়া আমাকে আহত করেছিলো খুউব। হিমাদ্রির বিচ্ছেদে অবশেষে আত্মঘাতিনী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। হঠাৎ ঝাঁঝালো রৌদ্রকরোজ্জ্বল এক দুপুরে হিমাদ্রি আমাকে ফোন দিলো। আমি ব্যাকুল হয়ে হিমাদ্রির ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে হিমাদ্রি নিরাসক্ত গলায় বললো-
নিউজিল্যান্ড সরকারের বৃত্তি নিয়ে আমি ইউনিভার্সিটি অব ওটাগোতে চলে এসেছি। সময় স্বল্পতার কারণে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। আমাকে ক্ষমা করে দিও, মিনতি।

হিমাদ্রির এরূপ আচরণে আমার নিজের উপর প্রচণ্ড ঘেন্না হলো। এতটা দিনেও স্বার্থপর হিমাদ্রিকে আমি চিনতে পারিনি ! আত্মঘাতিনী হওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলাম। কি হবে আত্মঘাতিনী হয়ে ? নিজেকে শেষ করে দিলে কারো কিছু যাবে আসবে না।
তারপর গড়িয়ে গেলো অনেক দিন। পৃথিবীর সব কিছুই স্বাভাবিক গতিতে চললো। কেবল আমার আর সংসার করা হলোনা। একই ছাদের নিচে থেকেও আমি আর জাহিদ যেন দুই ভুবনের দুই বাসিন্দাই রয়ে গেলাম !

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *