গোল্ডেন আওয়ার কলমে সোমনাথ চ_্যাটার্জ্জী

Somnath Chatterjee

 191 total views

অনুগল্প:
গোল্ডেন আওয়ার
কলমে: সোমনাথ চ‍্যাটার্জ্জী
“”””””””””””””””””””””””””””””””

একটা স্টপেজ পরেই গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের সামনে নামবে সুদীপ। উল্টোদিকের রাস্তার ভিতরে ওর অফিস। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান স্ট্রীট।তারা চলে গেছে কবে তবে আমরা এখনো তাদের নাম বহন করে চলেছি। মিনি বাসের সিট ছেড়ে উঠে গেটের কাছে চলে আসে। পিছনের লোকটি তাড়া দেয় “নামুন দাদা, গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন” । বাসটি যথেষ্ট স্পীডে। সুদীপ বলে ওঠে “দেখছেন তো বাসটার স্পিড। তাছাড়া এখানে কোনো স্টপেজ নেই। আপনি কি রানিং বাস থেকে লাফ মেরে সার্কাস দেখাবেন? লোকটি বিরক্ত হয়ে ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে “আস্তে আস্তে” করে সুদীপের দিকে তাকিয়ে গজগজ করে নেমে গেল। নামা ওঠায় এরা সব এক্সপার্ট। বাস স্টপে নেমেই সুদীপের বুকটা কেমন ব‍্যাথা করে উঠলো। একটা হাল্কা ব‍্যাথা অনেকক্ষণ ধরেই হচ্ছিল। রাস্তা পেরিয়ে সামনের ফুটপাতে দাঁড়ালো। হাতে ব্রিফকেস। ব‍্যাথাটা একটু অন্য রকমের মনে হল। একটা ডাব কিনে খেল। বুকে বেশ চাপ লাগছে। গ‍্যাস হয়ে থাকতে পারে। মোড়ের দোকান থেকে এক প‍্যাকেট উইলস কিনে একটা সিগারেট ধরালো। যদি ব‍্যাথাটা কমে। এমনিতে রোজ সারা দিনে পাঁচ থেকে ছ’প‍্যাকেট সিগারেট উড়িয়ে দেয়। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেলস ম‍্যানেজার। সবে চল্লিশ পেরিয়েছে। এই কোম্পানিতে নতুন। তবে এরমধ্যেই ভাল কাজ দেখিয়ে সুনাম হয়েছে। এমডি, ডিরেক্টরদের চোখে পড়েছে। আসলে সেলসে থাকলে কোম্পানিকে ভাল ভাল মোটা অংকের অর্ডার এনে দিলে কদর বেড়ে যায়। কলিগরা বলতো দীপকদা আপনি যে কোনো ‘ডিলে’ বাজিমাত করেই আসেন। যেখানেই হাত দেন সোনা। সিগারেট জ্বালিয়ে জোরসে সুখটান দেয় দীপক। অনেক পুরনো অভ‍্যেস। শুরুটা কলেজের গোড়াতেই। একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম। হাজরায় পড়তে আসতো একটি কোচিং সেন্টারে। দীপক অপেক্ষা করতো বসুশ্রী সিনেমা হলের পাশে। ঠায় কতক্ষণ দাঁড়াবে। ছুটি হতে দেরি হতো মেয়েটির।টাইম পাসের জন্য সিগারেট কিনে খাওয়া শুরু। ব‍্যাস সেই শুরু। ধীরে ধীরে অভ‍্যেসে পরিনত। মেয়েটির কবে বিয়ে হয়ে গেছে অন‍্য কোথাও আর দীপকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেছে সিগারেট। তখন প্লেন চারমিনার। টিউশনির উপার্জনের পয়সা। একটা সিগারেট তিন চার বন্ধু মিলে শেয়ার হতো। দিনের কোটা ছিল তিনটি চারমিনার সঙ্গে এক বান্ডিল লাল সুতোর বিড়ি।

ব‍্যাথাটা কমছেনা। সিগারেটে হালকা টান। দীপক আস্তে আস্তে এগোতে থাকে অফিসের দিকে। মিনিট তিনেকের পথ। এবার ব‍্যাথাটা ক্রমশ বাড়তে থাকে। শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে। কোনোরকমে পুরোনো কাঠের সিঁড়ি ধরে দোতলায় অফিসের রিসেপশনে পৌঁছেই ভিসিটরদের বসার সোফায় ধপ করে বসে পড়ে এবং কাত হয়ে আধশোয়া হয়ে যায়। দীপকের এমন অবস্থা দেখে রিসেপশন থেকে দৌড়ে আসেন মিস শর্বরি। উত্তর দেবার অবস্থায় দীপক ছিলনা। মিস শর্বরির ডাকাডাকিতে অন‍্য স্টাফরা দৌড়ে আসে। ইতিমধ্যে ডিরেক্টর মি. কৃষ্ণানের নির্দেশে এক কলিগ ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসে। দীপকের অবস্থা দেখে তিনি তৎক্ষণাৎ হসপিটালে নিয়ে যাবার পরামর্শ দিলেন। মনে হচ্ছে হার্ট এ্যাটাক। কথাটা কানে গেল দীপকের। বুকের উপর চাপ বাড়ছে। কি হবে এখন। এ্যাম্বুলেন্স ডাকারও সময় নেই। ডিরেক্টর মি. কৃষ্ণান নিজে আর দুতিন জন স্টাফ নিয়ে নিজের গাড়িতে করে দীপককে নিয়ে তিরের বেগে ছুটলেন স্থানীয় হাসপাতালে। আর একটা ট‍্যাক্সিতে আরোও কয়েকজন কলিগ।

দীপকের জ্ঞান রয়েছে। আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে শ্বাস নিতে। বাড়িতে স্ত্রী অপর্না শুনলে কি করবে। দুটো বাচ্চা। ছেলে ক্লাস ফাইভ আর মেয়ে ওয়ানে পড়ে। আর কেউ নেই। রিসেপশন থেকে মিস শর্বরি খবর পাঠালেন বাড়িতে। আকাশ ভেঙে পড়ল অপর্নার মাথায়। ছেলে তখন স্কুলে। মেয়ের মর্নিং স্কুল। টালিগঞ্জের একটি বাড়িতে থাকে। কোম্পানিই দিয়েছে। অপর্নার আত্মীয়রা সব কাছাকাছিই থাকে। দীপকের মা আর বোন ছাড়া আর কেউ নেই। ওরা থাকে রানাঘাটে।

কলিগদের আন্তরিক চেষ্টায় আইসিইউতে একটা বেড পাওয়া গেল। দীপক প্রানপন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে শ্বাস নেবার। সরকারি হাসপাতালে চট করে বেড পাওয়া মুশকিল। ভাগ্য ভাল। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু হল। একটা ইন্জেকশন দেওয়া হল। ওতে নাকি হার্ট অ্যাটাকের রোগীর শ্বাসকষ্ট কমতে থাকে। দীপকের কানে আসছে সিনিয়র ডাক্তার তার দুচারজন জুনিয়রদের সঙ্গে নিয়ে দেখাচ্ছেন আর বলছেন “ক্লিয়ার কেস অফ মায়োকার্ডিয়াল ইনফারকশন”। দীপক ইশারায় বলার চেষ্টা করল ‘দম নিতে পারছেনা’। উনি দীপককে বললেন “এক্ষুনি সব ঠিক হয়ে যাবে। একটু পরেই শ্বাসকষ্ট চলে যাবে”। দীপকের চোখে ঘুম জড়িয়ে এল। চোখ খুলল তখন বিকেল। শার্টটি খুলে নেওয়া হয়েছে। ট্রাউজার রয়েছে। নাকে মুখে নল গোঁজা। বুকের উপর নানা রকম তার লাগানো। সেগুলো কয়েকটি মনিটরে গোঁজা। ওর মনে পড়ল সিগারেটের প‍্যাকেটের ভিতর ন’টি এখনো পড়ে আছে। ট্রাউজারের পকেটে ছিল। এরমাঝে কখন অপর্না এসে দেখে গেছে দীপক জানেনা। ডাক্তার বলেছেন এমনি ঠিক আছে তবে বাহাত্তর ঘন্টা না গেলে কিছুই বলা যাবেনা। বেশ রাতে ঘুম ভেঙে দীপক দেখলো দুই জুনিয়র ডাক্তার ওর সামনে বসে। বললো -কত প‍্যাকেট সিগারেট খেতেন? দীপক নিচু স্বরে জবাব দিল “পাঁচ প‍্যাকেট”। আপনার পকেট থেকে একটা প‍্যাকেট পাওয়া গেছে। ওটা আপনার স্ত্রীকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার একটা মনিটরের দিকে দেখিয়ে বলল “দেখুন আপনার ইঞ্জিনের অবস্থা। জীবনে আর একটা ও সিগারেট খেলে এই ভাবে দেখার সুযোগও আর পাবেন না”। দীপক বুঝতে পারে এখন বুকের চাপটা আর নেই। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে না। ওকে নাকি “গোল্ডেন আওয়ার” এর মধ্যেই হাসপাতালে আনা হয়েছিল। সকালে সহায়ক কর্মীরাই মুখ ধুইয়ে দিল আর সেই সময় চোখে পড়লো নার্স দিদিরা টেবিলে ব্রেকফাস্টের সব ডিমের ভিতর থেকে কুসুমগুলো বার করে অন্য ডিশে রাখছে। কি সাংঘাতিক! এতো “ডিমচুরিকান্ড” । হাতেনাতে পাকড়াও। বড় কেলেঙ্কারি ধরেছে। দীপক ডিমের পোকা। আগে দিনে চার পাঁচটা অনায়াসে খেয়ে নিত। আর সেই ডিমেরই কসুম গায়েব করে দিচ্ছে! একটু পরেই দুপিস পাউরুটি একটা কলা আর কুসুম ছাড়া ডিমের সাদা অংশটা প্লেটে করে দীপকের সামনে আনা হল। নিন ব্রেকফাস্ট। খাইয়ে দিচ্ছি। দীপক বাধ্য হয়ে সেই মিষ্টি মুখের নার্সকে বলেই ফেললো। এগুলো কি হচ্ছে সিস্টার? কুসুম খুলে নিয়েছেন কেন? উত্তর এল, অনেক খেয়েছেন কসুম, এখন থেকে কসুম বন্ধ। এসব কি বলে রে বাবা, সিগারেট বন্ধ, ডিমের কুসুম বন্ধ, বাঁচবো কি খেয়ে। দিন দশেক পর দীপক সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিল।

কেটে গেছে বহু বছর। ও এখন দিব‍্যি আছে। সঙ্গী হয়েছে ওষুধের দলবল। খাওয়া দাওয়ার উপর সেন্সর করা হয়েছে। অফিসের প্রত‍্যেকটি মানুষের কাছে ও কৃতজ্ঞ, যাদের তৎপরতায় এবং সেই সব সরকারি ডাক্তার যারা ওকে বাঁচাতে পেরেছিল। সিগারেট এখন অতীত। স্মৃতি হিসাবে একটা উইলশের প‍্যাকেট আর তার ভিতরে ন’টা সিগারেট ওপরের তাকে রাখা আছে। না, আর কখনো সিগারেট ছোঁয়নি দীপক। খাবনা মানে খাবনা।আসলে মনের জোরটা খুব দরকার। কমিটমেন্ট। সলমন খানের সেই ডায়লগটার মতো “একবার কমিটমেন্ট কর দিয়া উসকা বাদ খুদ কা ভি নেহি শুনতা হুঁ” । সংযমী হওয়াটা জীবনে বড় প্রয়োজন। আর হ‍্যাঁ, “গোল্ডেন আওয়ার” শব্দটি যেন বুঝিয়ে দেয় প্রতিটি কাজের জন্য একটি সঠিক সময় নির্ধারিত থাকে। মিস করলে ওই সুযোগ আর ফিরে আসে না।

©️সোমনাথ চ‍্যাটার্জ্জী
০৬-১০-২০২১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *