SOUMYA GHOSH.

 179 total views

আজ ১৫ই সেপ্টেম্বরে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি
“STORY AND ARTICLE”-এর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন:—-
*** **** ***** *** *** ***

অপমান ও ব্যক্তি-আক্রমণ সহ্য করতে হয়েছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে
=========================
সৌম্য ঘোষ
————————————————

শুধু ভারতবর্ষ নয় তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার সবচাইতে জনপ্রিয় এবং বহুলপঠিত লেখক। তাঁর সমসাময়িক সময়ে এমন বিপুল জনপ্রিয়তা অন্য আর কোন সাহিত্যিকের ভাগ্যে জোটেনি। তিনি ভারতবর্ষের বিপুল বাঙালি ও অবাঙালি পাঠকের কাছ থেকে যেমন পেয়েছেন প্রচুর প্রশংসা ও সম্মান, ঠিক তেমনি অন্য একশ্রেণীর লোকের কাছ থেকে পেয়েছেন তীব্র সমালোচনা ও আক্রমণ। শুধু যে তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য সমালোচিত হয়েছে তা নয়, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে বিকৃত করে বহু সমালোচক একাধিকবার আক্রমণ করেছেন তাঁকে। বিভিন্ন পন্ডিত, অধ্যাপক, সমালোচকদের সেইসব আক্রমণ শুধু যে লিখিতভাবে পত্রিকায় ছাপা হতো তাই নয় বরং প্রকাশ্য সভা করেও তাঁর সাহিত্য ও জীবনকে কুৎসিতভাবে অপমান করার একটা চেষ্টা সেই সময় নির্দিষ্ট এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন—
“আমার মনে পড়ে বয়স যখন আমার অল্প ছিল এ ব্রতে যখন নতুন ব্রতী তখন আমন্ত্রণ পেয়েও কত সাহিত্যসভায় দ্বিধা-সংকোচে উপস্থিত হতে পারিনি। নিশ্চিত জানতাম সভাপতির সুদীর্ঘ অভিবাসনের একটা অংশ আমার জন্য নির্দিষ্ট আছেই। কখনো নাম দিয়ে, কখনো নাম না দিয়ে। বক্তব্য অতি সরল আমার লেখায় দেশ দূর্নীতিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেল এবং সনাতন হিন্দু সমাজ জাহান্নামে গেল বলে।”

তিনি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে লোকেরা সামান্য ছুঁতো পেলেই তাঁকে নিয়ে বানিয়ে মিথ্যে গল্প প্রচার করতে সচেষ্ট হতেন ।‌ সেই মিথ্যে রটনা কিছু পত্রিকায় ছাপা হতো। শুধু সাহিত্য নয়, শরৎবাবু সম্পর্কে যেকোনো ঘটনায় সেইসময়ের শিক্ষিত সমাজের কাছে হটকেকের মতো বিক্রি হতো। পাঁচুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের একটি লেখা থেকে এ রকমই একটা ঘটনার কথা জানা যায়। তিনি লিখেছিলেন, ” একদিন শরৎ চাটুজ্জে নামে কোথাকার কোন এক লোক টাকা চুরির দায়ে ধরা পড়ল; খবরটা কাগজে ছাপা হতেই সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের নামে কুৎসিত আক্রমণ আরো বেড়ে গেল। একের পর এক চিঠি আসতে লাগল তাঁর কাছে।”

১৩৩১ বঙ্গাব্দের আরেকটি ঘটনা কথা লিখি। একদিন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে একটি রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি উপহার দিলেন। হাওড়ার বাজে শিবপুরে ট্যাক্সি করে ফেরার সময় মূর্তিটা শরৎচন্দ্র বাড়ী নিয়ে এলেন। বাড়ির কাছে এসে প্রতিবেশী হরেন্দ্র নাথ মজুমদারকে ডেকে মূর্তিটি ট্যাক্সি থেকে দুজনে নিয়ে নামালেন। পরের দিন সকালে রটে গেল —– ‘শরৎচন্দ্র গতকাল রাতে এতটাই মদ পান করে বাড়ি ফিরছিলেন যে, তাঁকে ধরে ট্যাক্সি থেকে নামাতে হয়েছে।’

কারো কারো নেপথ্য( এদের মধ্যে কেউ কেউ বাঙ্গালীর প্রণম্য) প্রচেষ্টায় এইসব মিথ্যা গুজব প্রচার করা হতো উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে। তাঁকে বিভিন্নভাবে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হতো ‌। ১৩৬০ বঙ্গাব্দে ‘মাসিক বসুমতি’ পত্রিকায় একজন লিখলেন —- “একদিন তিন চারজন যুবক শরৎচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন তাদের হাতে রয়েছে ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাস। যুবকরা গিয়ে বেশ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এসব লিখলে আপনার এই পাড়ায় থাকা চলবে না। এখানে ভদ্রলোকের বাস। লোকেরা ছেলে-বউ নিয়ে ঘর করে। এরপর যুবকরা লেখকের সামনেই ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটি কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।”
পত্রিকায় এমন ছাপা হলো বটে কিন্তু এই ধরনের কোন ঘটনা বস্তুত: ঘটেইনি। এর কোনো সত্যতা ছিল না। সম্পূর্ণটাই ছিল মনগড়া।বাস্তবিকপক্ষে, সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিগত জীবনকে বিকৃত করে সেইসময় বহু পত্রপত্রিকায় নিজেদের পেট চালাতো।

“পল্লীসমাজ” উপন্যাসে বিধবা মেয়ে রমা তার বাল্যবন্ধু রমেশকে ভালবেসেছিল বলে শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে সনাতন হিন্দু সমাজ ক্ষেপে ওঠে।
আবার “বামুনের মেয়ে” প্রকাশিত হওয়ার পর কুলীন ব্রাহ্মণেরা শরৎচন্দ্রের প্রতি তীব্র বিষবাক্য বর্ষণ শুরু করেছিল। “মহেশ” গল্প পড়ে হিন্দু জমিদাররা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল। সেইসঙ্গে শিক্ষিত মুসলমান সমাজ ও তাঁর প্রতি রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে শাসাতে লাগলো। এইসব ভয়ানক ঘটনা যে লেখককে ভুগতে হয়েছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় শরৎচন্দ্রের লেখা বহু চিঠিপত্রে।
একবার প্রকাশক হরিদাস চট্টোপাধ্যায়কে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন —- “জানেন বোধহয় আমার ভাগ্নির বিয়ে এই শুক্রবারের পরের শুক্রবার। তাতে আমারই সমস্ত দায়।….. এতদিন কথাটা আপনাকে বলিনি যে দেশে আমি “একঘরে”। আমার কাজকর্মের বাড়িতে যাওয়া ঠিক নয়। যাক সে জন্য ভাবিনি। কিন্তু টাকা দেওয়া চাই অথচ আমি না যাই এই গোপন ইচ্ছা।‌(২৯-০৬-১৯১৬)।

যে ব্রাহ্মসমাজের অধিপতি ও সম্পাদক ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। “গৃহদাহ” উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পর সেই ব্রাহ্মসমাজও শরৎচন্দ্রের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরেও ব্রাহ্মরা গৃহদাহ উপন্যাস লেখার জন্য শরৎচন্দ্রকে নানাভাবে আক্রমণ করতে ছাড়তো না। কলকাতার কোন ব্রাহ্ম লাইব্রেরীতে শরৎচন্দ্রের কোন বই কখনো জায়গা দেওয়া হয়নি।( এর পেছনে কি নির্দিষ্ট কারো গোপন নির্দেশ ছিল?)। “চরিত্রহীন” উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর শরৎচন্দ্রের একটি চিঠি থেকে জানা যায় —- “প্রথম যখন ‘চরিত্রহীন’ লিখি তখন পাঁচ ছয় বছর ধরে গালাগালির অন্ত ছিল না। তবে মনের মধ্যে আমার এই ভরসা ছিল যে, সত্যি জিনিসটা আমি ধরেছিলুম।”
এমনকি যে বই সেইসময় বিপ্লবীদের কাছে গিয়ে গীতার সমতুল্য ছিল। সেই “পথের দাবী” রও তীব্র সমালোচনা করেছিলো একটি অংশ।

এত আক্রমণ ও অপমানের মধ্যে পড়েও তিনি কখনো নিজের অবস্থান
পরিবর্তন করেননি। এসব আক্রমণের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে তিনি চুপ করে থাকাকেই অধিক গুরুত্ব দিতেন। এমনকি তাঁর ভক্ত পাঠককুল এইসব নোংরা সমালোচনার প্রতিবাদ জানাতে চাইলে, তিনি তাদেরকেও নিশ্চুপ থাকার পরামর্শ দিতেন ‌।
তাঁর “শেষ প্রশ্ন” উপন্যাসটি নিয়ে রীতিমতো তীব্র সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল সেই সময় প্রত্যেকটি প্রথম শ্রেণীর সাহিত্য পত্রিকায়। এমনকি দলবেঁধে শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ করেছিল সেই সময় পন্ডিত সমাজ। বিশেষত ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার সজনীকান্ত দাস। তাতেও তিনি বরাবরের মতোই মৌনব্রত পালন করেন। এ ব্যাপারে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী তথা “শেষ প্রশ্ন” উপন্যাসটির প্রকাশক হরিদাস চট্টোপাধ্যায়কে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন——
“গালিগালাজ এর বহর দেখে হয়তো আপনিও ভয় পেয়ে থাকতে পারে কিন্তু এমনই একটা পন্ডিত সমাজ বইটিকে নির্বিচারে ভালো বলে যেমন, অন্যেরা নির্বিচারে মন্দ বলে। উপন্যাসটি ‘ভারতবর্ষে’ প্রকাশিত হয়েছে বলে আপনি বিন্দুমাত্র লজ্জিত হবেন না, এই অনুরোধ। সকল ব্যাপারেই দুই পক্ষ থাকে। তারাই যে প্রবল পক্ষ এ নাও হতে পারে এবং কালের বিচারে তারাই যে সত্য এ-ও না হতে পারে। ”

‘শনিবারের চিঠি’তে প্রায়শই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কার্টুন এঁকে লেখককে তীব্র আক্রমণ করা হতো। অকারণে তাঁকে নিয়ে নানা কুরুচিপূর্ণ আর্টিকেলের ধুম লেগে গিয়েছিল এই পত্রিকায়। এমনকি তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তাঁকে কুৎসিত আক্রমণ করতে ছাড়েননি সাহিত্যিক প্রবোধকুমার সান্যাল। কোন সাহিত্য সমালোচনা নয় —— তিনি সরাসরি ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছিলেন। এই সমস্ত লেখা যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত তা পড়লেই বোঝা যায়। প্রবোধকুমার সান্যালের সেই দুটি প্রবন্ধ ‘শ্রীহর্ষ পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়েছিল। তখন শরৎচন্দ্র অসুস্থ ছিলেন। একের পর এক আক্রমণ ও সমালোচনা তাঁর কানে ঠিক পৌঁছে গিয়েছিল। সব শুনেও তিনি নীরব ছিলেন। এই ঘটনার কিছুদিন পরেই তাঁর মৃত্যু হয়।।

=========================

লেখক •••• সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া। পশ্চিমবঙ্গ।
_______________________________

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *