Subhash Ravidas

 58 total views

কবিতায় অসমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহার কবিতার একটি বর্তমান ধারা হয়ে গেছে। কিন্তু এই নিয়মের সঠিক ব্যবহার না হবার ফলে এবং অতিরিক্ত ব্যবহারে কবিতার সহজ মৃত্যু ঘটছে। বলা ভাল অপমৃত্যু ঘটছে।”
-সুভাষ রবিদাস।।

এই কথা লেখার পর একটা উৎসুক্য দেখা গেল। এটা আবার কেমন কথা! উদাহরণ না দিলে চলবে কী করে? কথাটা সহজবোধ্য কিন্তু সরল নয় হয়ত, কিংবা জটিল হয়ে যাচ্ছে কোন কারণে। একটা কবিতার পূর্ণাঙ্গ আলোচনা যখন প্রয়োজন তখন এক লাইন দু লাইন লিখে উদাহরণ দিলে কোন বক্তব্যই পরিস্কার হবে না। এ তো আর তেল আর জলের গল্পও নয় যে বলে দেব, জলের চেয়ে তৈলের অনু বড় তাই ওদের বনিবনা হয় না। কিন্তু গল্পটা এখানেই দাঁড়িয়ে গেল। কবিতা তো এখন নানা আঙ্গিকে লেখা হয়! সেই চেনা নিয়ম স্বরবিত্ত, মাত্রাবিত্ত যমক ধমক অন্ত্যমিল গুরুচণ্ডালী এসব এখন অতীত। (সত্যি বলতে কী আজও আমি একটা সনেট লিখিনি। তবে বড় বড় কবিরা লিখছেন। লিমেরিক, হাইকু, প্যারোডি, আমি পারি না।) তাই গুরুশিষ্য পরম্পরা আমি মানি না। আমি মনে করি কেউ কারু শিক্ষক নয়, কেউ কারও ছাত্র নয়। প্রকৃতিই আমাদের পাঠশালা। কবিতার হাতে খড়ি, কানে মন্ত্র কথাগুলো এখন অর্থহীন, বিষয়টিকে হৃদয় দিয়ে বুঝতে হবে। কবিতা আর পুরনো আঙ্গিকে লেখা হয় না। এখন নতুন নতুন ধারার প্রয়োগ চলছে সচেতন ভাবে।
কেউ বলেন কবিতায় ক্রিয়াপদ যত কম ব্যবহার হয় তত ভাল। এই ধারায় নুরুলদা লেখেন। নুরুল আমিন বিশ্বাস। এর জন্য একটা কবিতা নিতে হবে, কিন্তু এ মূহুর্তে তেমন কবিতা অমিল। তবুও একটা উদাহরণ চাই। তার আগে বলা ভাল, নিয়মানুসারে অসমাপিকা ক্রিয়া ব্যবহারের পরও বাক্যে সমাপিকা ক্রিয়া ব্যবহার করতে হয়। শুধু অসমাপিকা ক্রিয়া দিয়ে বাক্য গঠিত হয় না।
একটি বাক্যে যতোগুলো ইচ্ছা অসমাপিকা ক্রিয়া ব্যবহার করা যায়। কিন্তু একটি সমাপিকা ক্রিয়া থাকতে হবে। এবার কি হয়, কিছু কবি উত্তরাধুনিক কবিতার নাম করে উৎপাটাং কবিতা রচনা করে যান, সেখানে ভাবের ও বাক্যের পরিপূর্ণতা বজায় থাকে না। এবার এর একটা পোশাকী নাম দেওয়া হয়, বিমূর্ত কবিতা। এর পর কিছু বলার নেই। এবার আরেকটা উদাহরণ প্রয়োজন!
যাই হোক প্রসঙ্গানুসারে, একটি পংক্তি-
১) ” কার বসবার ঘর? সামাজিক চায়ের আপ্যায়ন?
দ্যাখোতো নিকষ গহ্বরের উপর
ইন্ডেন গ্যাসের সিলিন্ডার খাপে খাপে চমৎকার। ”

২) ” হেমন্তের মাঠে এতো ইউক্যালিপটাস–
পাতা উড়ছে। শুধু ইউক্যালিপটাস পাতা…
পাতায় পাতায় মানুষ-মানুষীর শরীর
শরীর ভেঙে ভেঙে পাতা উড়ে (যায়)।
উড়ে যায় অনির্দিষ্ট… ”
-তিলোত্তমা বসু।
এই কবিতাটার বন্ধনী যুক্ত করেছি আমি, শুধুমাত্র অসমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহার বোঝাতে।

প্রদীপ চক্রবর্তীর কবিতায়,
” আজ আবার রবিবাসরীয়, সেই খবর :১৯৯৬। হোয়াইট হাউসের একটি/
পার্টিতে মোনিকার সঙ্গে বিল ক্লিনটন। ”

শঙ্করলাল চক্রবর্তী লেখেন – দুর্গজয়ের ছক, “ঘোড়দৌড়ের উড়ন্ত মশাল, তরুণ কবির পুরস্কারপ্রাপ্তি–/
সবেরই সমালোচনা চলছে। ” প্রথম ও দ্বিতীয় বাক্যের মেলবন্ধনে দুই প্রকার ক্রিয়া পদের সঠিক ব্যবহার ঘটেছে।

আমার এই বোধ তখন এসেছিল, যখন আমি একটি দীর্ঘ কবিতায় লিখেছিলাম –
“আমি মৃত মাছ

আমাকে নিয়ে মাছের মাসি হাটে
আমাকে নিয়ে খদ্দের দর কাটে
আমাকে নিয়ে কতই মাপামাপি
না পোষালে বন্ধ করে ঝাঁপি।

জানালা খুলে হাওয়ার অপেক্ষায়
মৃতমাছ যদি আবার বেঁচে ওঠে
মাছের বাবা বুড়ো (বুড়ো) হাড়েও
মাছের মা ঘুমায় খালি পেটে”

আমার সাথে বইয়ের বৈরীতা অনেকদিন থেকেই। একরণে মাননীয় মলয় রায়চৌধুরীর পাঠানো “ডুব জলে যেটুকু সাঁতার” গ্রন্থটি আলোচনা করতে পারি নি। এই বইটির জন্য তিনি একাডেমী পুরস্কার পেয়ে, ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। বুদ্ধদেব, অমিতাভ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ভাই গৌতম দাশগুপ্তের পাঠানো একটি বই আলোচনা করতে পারি নি। যদিও বইগুলো পড়েছি। এটা আমার ব্যক্তিগত সমস্যা। তবু সম্প্রতি একটি অমনোগ্রাহী তর্কের জেরে এই লেখাটি আবশ্যক হল। আরও একটি আস্ত কবিতা তুলে দিলাম। –

“এত ঘনঘন পোশাক পাল্টালে
আমাদের মত নিম্নবিত্ত
হড়কা বানে হাবুডুবু ।

চারদিকে বিজ্ঞাপনের ঝড়
নোলকের ভেতর আস্ত চাঁদ
গোটা দিন মেঘে ঢাকা সূর্য ।

রাতের নক্ষত্র লজ্জা ঘৃণা ক্ষোভে
আরও উজ্জ্বল আরও কাছাকাছি।

আকাশের দিকে উপুড় করা হাতে
এক ফোটা শিশিরবিন্দু যেন তিনভাগ জল।”
(তিনভাগ জল/তুলসীদাস ভট্টাচার্য/07-05-2021)

আরও একটি কবিতা তুলে ধরতে চাই। এক সময়ের খ্যাতিমান কবি
~রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ –
ভালোবাসার ভিক্ষাপাত্র

ভালোবাসার ভিক্ষাপাত্র হাতে
পা রাখছি শহর থেকে গ্রাম,
বকুল ভোরে ঝ’রে পড়ছে নদী
পাহাড় কাটা জলের মতো দ্রুত
ঝ’রে পড়ছে দুই এক টুকরো শাদা
বকের মতো শেফালিকার পালক

ভালোবাসার ভিক্ষাপাত্র হাতে
উজান হাওয়ায় সুনীল সাহস মেলে
দাঁড়িয়ে আছি হাঁটছি একা নিরুদ্দিষ্ট
রাতের সম্মোহনে।

ভালোবাসার শূন্য পাত্র হাতে
দাঁড়িয়ে আছি তোমার দিকে মুখ
ভিক্ষাপাত্রে শিশির ঝরছে নিসর্গ রাত
সবুজ বীথি নদীর স্নেহ—
শংখচিলের রোদে ভেজা নরোম শরীর—

তুমিই শুধু ভালোবাসা রাখতে গিয়ে
ছড়িয়ে ফেললে চতুর্দিকে অসাবধানে
ভালোবাসা ছড়িয়ে ফেললে চতুর্দিকে…

৩০.০৬.১৯৭৫ (রাত্রি) মিঠেখালি মোংলা
(অপ্রকাশিত; অগ্রন্থিত কবিতা সমূহ)

ধারণার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যাপক পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্তে এলে, এই সিদ্ধান্তকেই জ্ঞান বলি। অন্যে কি বলে জানিনা। আপনাদের তার্কিক যুক্তি থাকতে পারে এবং তা ব্যক্ত করে আমার ত্রুটি শুধরে দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *