Subrata Dutta

 38 total views

।। শারদ ফাগুন ।।
সুব্রত দত্ত
:::::::::::::::::
অরণ্যরা ফ্ল্যাট কিনে পাড়ায় নতুন এসেছে। পাড়ার ক্লাবের পুজো কমিটির অনেকেই তার পূর্ব পরিচিত। তাই পুজোতে সেও আমন্ত্রিত। সপ্তমীর দিন স্নান করে পাজামা পাঞ্জাবি পরে মণ্ডপে যায় সে। ক্লাবের কর্মকর্তারা ব্যস্ত আয়োজনে। বন্ধুস্থানীয় কল্লোলকে অরণ্য বলে,
—কোনো কাজে প্রয়োজন হলে বলিস। আমি ফ্রি আছি।
—বেশ তো! দাঁড়া দেখছি। (চারিদিকে খুঁজে একটা
মেয়েকে ডাকে) এই শর্মিষ্ঠা, এদিকে আয়।
ব্যস্ত শর্মিষ্ঠা হাতের কাজ ফেলে ছুটে আসে। নজরে পড়ার মতোই চেহারা। ফর্সা, কোমড় পর্যন্ত ঢেউ খেলানো
চুল। ডাগর চোখ, টিকালো নাক। লাল পেড়ে হলুদ
শাড়িতে এমন মেয়ে প্রথম দর্শনেই মনে দোলা দেয় বই কি! কল্লোল অরণ্যকে দেখিয়ে বলে,
— ওকে চিনিস না নিশ্চয়ই। পাড়ায় নতুন এসেছে। ওর
নাম অরণ্য। তুই বলেছিলি না, যজ্ঞের কাঠ ছোট
করে কেটে দিতে হবে! ওকে দে, করে দেবে। আমি
লাইটম্যানকে খুঁজি। এখনো সব লাইট লাগানো হলো
না। ওঃ, এদের নিয়ে পারা যায়?
কল্লোল চলে যায়। শর্মিষ্ঠা আগে অরণ্যকে দেখেছে ঠিকই। পাড়ায় এমন এক সৌম্য দর্শন যুবক এলে মেয়েদের নজরে পড়ে যাবেই। তবু আগে দেখেনি এমন ভাব করে হাত বাড়ায়। অভিভূত অরণ্য হাত জোড় করে নমস্কার করতে যাচ্ছিলো। শর্মিষ্ঠা বলে,
—উঁহু, দেব দেবীর সামনে প্রণাম, নমস্কার এসব করতে
নেই।
অরণ্যও হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে জিজ্ঞেস করে,
—পড়াশোনা?
—উচ্চ মাধ্যমিক দেবো এবার, আর্টস। তুমি?
—বি এ সেকেণ্ড ইয়ার।
—ও, ঠিক আছে, পরে কথা হবে। অনেক কাজ পড়ে
রয়েছে। তুমি কাঠ কাটতে পারবে তো?
—হ্যাঁ, পারবো না কেন? নবকুমার যদি কপাল কুন্ডলার
জন্য বনের গাছ কাটতে পারে, আর আমি এইটুকু
পারবো না?
—ওরে বাব্বাঃ! না, অরণ্যে গিয়ে বৃক্ষ ছেদন করতে হবে
না। ঐযে কতগুলো কাঠ রাখা আছে, সেগুলো একটু
ছোট করে কেটে দিতে হবে। যজ্ঞের জন্য লাগবে।
—যথা আজ্ঞা দৈত্য রাজকন্যা!
শর্মিষ্ঠা ভুরু কুঁচকে তাকায়। অরণ্য বলে,
—না মানে, শর্মিষ্ঠা তো দৈত্যরাজ বৃষপর্বার কন্যা। তাই ..
—ও, আমাকে পাল্টা দিলে তো! ঠিক আছে, পরে দেখা
যাবে!
অরণ্য কাঠ কাটতে শুরু করে। শর্মিষ্ঠা পুজোর সরঞ্জাম পুরোহিতের সামনে গুছিয়ে দিতে থাকে, আর মাঝে মাঝে আড় চোখে অরণ্যকে দেখে। কয়েকবার দু’জনের চোখে চোখ পড়ে যায়। আবার তারা চোখ সরিয়েও নেয়। হঠাৎ একটা চেঁচামেচির শব্দে শর্মিষ্ঠা ঘুরে দেখে, অরণ্যকে ঘিরেই সবাই কথা বলছে। অজানা আশঙ্কায় তার বুক কেঁপে ওঠে। ছুটে যায় সেখানে। কাঠ কাটতে গিয়ে অরণ্য তার নিজের বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলেই কোপ মেরেছে। সমানে রক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে! হতভম্ব হয়ে সে বলে,
—ইস,এটা কি হলো! ছি ছি, এটা আমার জন্যই ঘটলো।
কেন যে এরকম আনাড়িকে এগুলো কাটতে বললাম!
শর্মিষ্ঠা একটা পরিষ্কার কাপড়ের টুকরো এনে অরণ্যের আঙুলের রক্ত মুছে সেটা দিয়ে শক্ত করে চেপে রাখে। রীতিমত তার হাত কাঁপছে ভয়ে। সে বলে,
—ওঠো তো! ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
—আরে এতো দুশ্চিন্তা করার মতো কিছুই হয় নি।
বাড়িতে গিয়ে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে নেবো।
—হুঁ, একা একা?
—না, মা বোন আছে তো।
—থাক, চলো। এই শ্রী, একটা টোটো ডাক তো।
হৈ চৈ শুনে কল্লোলরা হাজির হয়। সব শুনে সে শর্মিষ্ঠাকে বলে,
—তোর যেতে হবে না। তুই এদিকটা দেখ। আমরা নিয়ে
যাচ্ছি।
কল্লোল আর বিজন টোটোতে চাপিয়ে অরণ্যকে
ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। শর্মিষ্ঠা প্যান্ডেলে থেকে গেলো ঠিকই, তবে পুজোর কাজে মন নেই। বেচারির আঙুল কেটে যাওয়ার ঘটনায় নিজেকেই দোষারোপ করে সে। শ্রী আর সুমি সামনে আসে। দু’জনের চোখের ইশারায় রহস্যের গন্ধ! সেটা দেখে শর্মিষ্ঠা ভুরু কুঁচকে কপট রাগ প্রকাশ করে। শ্রী বলে,
—এতো দুশ্চিন্তায় কার কথা ভেবে কাল গুনছেন দেবী?
—যাঃ! সব সময় ইয়ার্কি, তাই না?
সুমি হেসে বলে,
—ইয়ার্কিটা আবার লাইফ-কি হয়ে যাচ্ছে না তো?
শর্মিষ্ঠা সুমির পিঠে থাপ্পড় মেরে বলে,
—এতো বাজে কথা বলিস কেন? এতোটা ভাবার কিছু
হয় নি রে। আরে বাবা, আমারই জন্য এরকম
এক্সিডেন্ট হলো, একটু খারাপ তো লাগবেই।
শ্রী তার মাথায় মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলে,
—সত্যিই কি তাই? এই সুমি, ও এমনি এমনি চিন্তা করছে
রে!
শর্মিষ্ঠা কথা ঘোরাতে ওদের তাড়া দেয়,
—এই, চল তো। পুজোর কাজগুলো শেষ কর। এরপর
পুরুত মশাই চেঁচামেচি শুরু করবেন কিন্তু!
পুজোর কাজ করতে করতে শর্মিষ্ঠার চোখ বার বার চলে যায় রাস্তায়। কিছুক্ষণ পর অরণ্য আঙুলে ব্যান্ডেজ
বাঁধা অবস্থায় ফিরে আসে। শর্মিষ্ঠা ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস
করে,
—ডক্টর কি বললেন? ক্ষতটা বেশি ডিপ হয় নি তো?
কল্লোল বলে,
—না, চিন্তার কিছু নেই। তাড়াতাড়ি সেরে যাবে। সব
রকম ওষুধ দিয়েছেন। (হেসে অরণ্যকে) তোর আর
অন্য কাজ করতে হবে না। তোকে শঙ্খ বাজানোর
প্রতিযোগিতার জাজ করে দেবো।
শর্মিষ্ঠা আঁচলে মুখ ঢেকে হাসে। সেটা অরণ্যের চোখ
এড়ায় না। ওদিকে পুজো শুরু হওয়ায় শর্মিষ্ঠাকে সেখানে থাকতে হয়। পুজো শেষ না হওয়া পর্যন্ত অরণ্য ঠায় চেয়ারে বসে থাকে। অঞ্জলির সময় সে কাছে যায়।
শর্মিষ্ঠা বলে,
—পারবে অঞ্জলি দিতে?
—হ্যাঁ, কেন পারবো না।
—ঠিক আছে তো শরীর। অনেক রক্ত বেরিয়েছে তো!
—হ্যাঁ, ঠিক আছি।
—ইস, আমার জন্য এই অবস্থা হলো।
—তা কেন? আমি অন্যমনস্ক হয়েছিলাম হয়তো!
ঠাকুর মশাই শান্তির জল ছিটিয়ে দেন। শর্মিষ্ঠাই অরণ্যেরর হাতে অঞ্জলির ফুল বেলপাতা তুলে দেয়। অঞ্জলি শেষে সবাই প্রতিমাকে প্রণাম করে। সুমি শর্মিষ্ঠাকে বলে,
—কিরে, মায়ের কাছে কি চাইলি?
—আবার শুরু করলি?
—হুঁ, জানি জানি। বলতে হবে না।
—চুপ!
বাড়ি যাওয়ার আগে অরণ্যের হাতে প্রসাদের প্যাকেট দিয়ে বলে,
—সন্ধ্যাবেলায় কোথাও যাবে, নাকি এখানে এসে বসবে?
—পার্কে বন্ধুদের আসার কথা আছে। সেখানে যেতে
বলেছে।
—আজ এখানে বসে রেস্ট নিলে ভালো হয় না? কাল
না হয় পার্কে যাবে।
—উম, দেখি। শরীর পারমিট করলে যাবো। ওঃহো,
ভুলেই গিয়েছিলাম। আগে মা আর বোনকে কাছের
পূজোগুলো দেখিয়ে নিতে হবে। তারপর যা করার
করবো।
—ঠিক আছে। হাতে যেন চোট না লাগে।
—ঠিক আছে। চিন্তা নেই। আসি।
—হুঁ
অরণ্য বাড়ি চলে যায়। শ্রী বলে,
—কিরে, কি ব্যাপার? ওকে ছাড়তেই ইচ্ছে করছে না।
তাই না?
—মোটেও না। ওইটুকু কথা না বললে হয়?
—হ্যাঁ, তাই তো!
টুকটাক বাকি কাজ সেরে মেয়েরাও বাড়ি চলে যায়।
অরণ্য বাড়িতে ঢুকতেই মা আর বোন চিৎকার করে ওঠে। মা বলে,
—কি হয়েছে তোর?
—কিছু না। একটু কেটে গিয়েছে।
বোন লিপি বলে,
—কাটলো কি ভাবে?
—আরে পুজো মন্ডপে গিয়েছিলাম। কল্লোলকে বললাম,
কোন কাজ থাকলে করতে পারি। তাই যজ্ঞের কাঠ
কাটতে গিয়ে একটু লেগেছে। তা ওরাই ডাক্তারের
কাছে নিয়ে গেলো। ওষুধও দিয়েছে।
মা বলে,
—তোর কি দরকার ছিলো আগ বাড়িয়ে কাজ করার?
—মা, এটা তো হওয়ার কথা ছিলো না। হয়ে গেছে। আর
কিছু করার আছে?
—আমার কথা শুনবি কেন? বউ এলে তার সব কথা
ঠিক শুনবি।
লিপি বলে,
—হ্যাঁ তো। তখন আমরা কে?
—এই, তোরা একটু চুপ করবি? মা, খেতে দাও। বাবা
কোথায়?
—উনি কি বাড়িতে থাকার মানুষ? গেছেন আড্ডা
মারতে!
—তাহলে বাবা এলেই খাবো। দাঁড়াও, আমি কল করছি।
হ্যালো বাবা, তুমি কোথায়? … হুঁ, ঠিক আছে,
তাড়াতাড়ি এসো।
লিপি বলে,
—কেমন লাগছে দাদা এই পাড়ার পুজো?
—ভালোই।
—আর কিছু?
—মানে?
—মানে, এখানে কাউকে দেখতে পেলি, যাকে তোর…
—মা, দেখেছো তো, পেছনে লাগছে। এরপর যখন
মারবো…
মা ঝুমাদেবী ওদের থামিয়ে দিয়ে বলে,
—থাক, আর মারপিট করতে হবে না। তোরা কবে বড়
হবি, বল তো?
অরণ্যের বাবা মাধববাবু বাড়িতে চলে এলেন। বলেন,
—কি হলো আবার তোদের? এত ঝগড়া কেন দু’টিতে?
—দেখো না, লিপি ওর স্বভাব মতোই আমার পেছনে
লেগেই থাকে।
লিপি বলে,
—না বাবা, তেমন কিছু বলিই নি। শুধু জিজ্ঞেস করেছি,
নতুন পাড়ার পুজো প্যান্ডেলে কাউকে পছন্দ হলো
কিনা। তাতেই ও ক্ষেপে গেলো।
—ওকে তো বলাই আছে, আগে আমাদের দেখাবে।
আমাদের পছন্দ হলে ও এগোতে পারে।
অরণ্য বিরক্ত হয়ে বলে,
—ওঃ বাবা, সেরকম কিছু ঘটেনি। তুমি স্নানে যাও তো।
খিদে পেয়েছে।
—হুঁ, যাচ্ছি।
সন্ধ্যে নামতেই অরণ্য মা আর বোনকে নিয়ে বেরোয়।
প্রথমেই পাড়ার পুজো প্যান্ডেলে যায়। অরণ্য বোনকে বলে,
—তোরা ভেতরে যা, আমি কল্লোলদের সাথে আছি।
লিপি মাকে নিয়ে ভেতরে ঢোকে। দেখে শর্মিষ্ঠা সর্দারনীর মতো মেয়েদের এটা ওটা কাজ করতে বলছে। লিপিকে দেখে সে এগিয়ে এসে বলে,
—কিরে তুই? আজই পুজো দেখতে বেড়িয়েছিস?
—হ্যাঁ, ভাবলাম, পাড়ার পুজোটাই আগে দেখি!
—পাড়া মানে? এ পাড়ায় থাকিস নাকি?
—হ্যাঁ, এই তো, পরের গলিতে “পারিজাত” নামে একটা
নতুন আবাসন হয়েছে না? সেখানেই আমরা ফ্ল্যাট
নিয়েছি।
অন্যমনস্ক হয়ে শর্মিষ্ঠা বলে,
—ন-তু-ন ফ্ল্যাট?
—হ্যাঁ, কেন তোর কেউ থাকে সেখানে?
—না।
—মা দেখো, এই যে শর্মিষ্ঠা। আমাদের ক্লাসে পড়ে।
মাধ্যমিকে দারুণ রেজাল্ট করেছে!
বিরক্ত হয়ে অরণ্য ভেতরে এসে বলে,
—কিরে, এতো দেরি করছিস কেন?
অবাক হয়ে সে দেখে লিপি শর্মিষ্ঠার সাথেই কথা বলছে। লিপি বলে,
—দাদা, এই যে শর্মিষ্ঠা। আমাদের ক্লাসের টপার।
শর্মিষ্ঠা অরণ্যকে জিজ্ঞেস করে,
—আঙুলের ব্যথা কমেছে?
—হ্যাঁ, অনেকটাই।
লিপি এবার অবাক হয়ে বলে,
—দাদা, তুই ওকে চিনিস সেটাতো বলিস নি! কিরে?
—বলার মতো কি আছে। আজই প্রথম কথা হয়েছে।
তাছাড়া আমি জানবো কেমন করে যে ও তোর
ক্লাসমেট?
—হুঁ বাড়িতে চল আগে! (শর্মিষ্ঠকে কানে কানে বলে)
কিরে, আমার দাদার সঙ্গে কি মিষ্টি মিষ্টি প্রেম সৃষ্টি
হয়েছে নাকি?
—যাঃ! তুই না, খুব বাড়িয়ে বলছিস। আসলে ওর আঙ্গুল
কেটেছে আমার জন্য।
—সেকি! কি করে?
শর্মিষ্ঠা পুরো ঘটনাটা বলে। ঝুমাদেবী বলেন,
—হুঁ, বাড়িতে গিয়ে এতোসব বলেও নি।
অরণ্য রাগ করে বলে,
—হয়েছে? মা, এবার বেরোবে?
লিপি বলে,
—দাঁড়া, ওর সাথে একটু কথা আছে।
লিপি শর্মিষ্ঠাকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে বলে,
—কাল অঞ্জলির আগে আমাদের ফ্ল্যাটে আসবি। ফার্স্ট
ফ্লোরে বাঁদিকে।
—এমা, কেন?
—হ্যাঁ আসবি। তারপর আমরা সবাই মিলে অঞ্জলি দিতে
আসবো। কোনও আপত্তি শুনছি না।
পরের দিন শর্মিষ্ঠা সকালের দিকে স্নান সেরে অরণ্যদের বাড়িতে যায়। লিপি বাবাকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দেয়। শর্মিষ্ঠা অরণ্যের বাবা মা দু’জনকে প্রণাম করে। বাবা বাদে সবাই যায় অঞ্জলি দিতে। না চাইলেও শর্মিষ্ঠার দৃষ্টি চলে যায় অরণ্যের দিকে। চোখে চোখ পড়লে অন্য দিকে মুখ ফেরায়। পুজো শেষে শর্মিষ্ঠা
লিপিকে বলে,
—সন্ধ্যের পর পার্কে যাবি? বেশ সময় কাটবে কিন্তু!
—হুঁ, যাওয়াই যায়। আর কে যাবে?
শ্রী আর সুমি বলে,
—আমরাও যাবো।
অরণ্য কল্লোলদের সাথে কথা বলছিলো, তাই ওদের কথা শোনে নি। সে বন্ধুদের সাথে পার্কে যায়। মাঠে এদিকে ওদিকে ছেলে মেয়েরা দলে দলে বসে আড্ডা মারছে। চা কফি আর নানান খাবার খাচ্ছে কেউ কেউ।
অরণ্যের বন্ধু পীযুষ তাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। পীযুষের আসল উদ্দেশ্য পুজোটা আনন্দে কাটাতে টেম্পোরারি প্রেমিকা খুঁজে দেখা। শর্মিষ্ঠা, লিপিদের বসে থাকতে দেখে অরণ্য দাঁড়িয়ে পড়ে।
পীযুষ কিছু না বুঝেই বলে,
—দেখ দেখ, ঐযে লাল রঙের কামিজ পরা মেয়েটা বসে আছে। কি দারুণ না?
—ওদিকে একদম নজর দিবি না।
—কেন রে, তোর বুক করা?
—তা বলতে পারিস।
শর্মিষ্ঠা অরণ্যকে দেখে লিপিকে ইশারায় দেখায়। লিপি
বলে,
—ও, তোর নজরে তোর মানুষকেই খুঁজে পেলি?
—যাঃ! এভাবে বলছিস কেন!
—হুঁ, বুঝি রে বুঝি। দাঁড়া দাদাকে ডাকি।
—এই এই না, খবরদার না!
—তুই জানতিস যে দাদা এখানে আসবে?
—না, মানে, ওই আর কি।
লিপি অরণ্যকে ডাকে,
—দাদা, ওই দাদা, শোন। এদিকে আয় একটু।
—কেন ডাকলি? বন্ধুদের সঙ্গে সুন্দর আড্ডা মারছিলাম।
—ও তাই? তাহলে যা!
—না ঠিক আছে। বল, কি বলবি।
—ফুচকা খাওয়াবি?
—শুধু ফুচকা? হ্যাঁ চল।
—আমাকে তো ফুচকাও খাওয়াতে চাস না। কিপটে
কোথাকার! আজ আরও কিছু খাওয়াতে চাইছিস, কি
ব্যাপার?
শর্মিষ্ঠা বলে,
—না না, আমি কিছু খাবো না।
—বেশি ন্যাকামো করিস না তো! দাদা চল।
—হ্যাঁ চল।
পীযুষ বলে,
—আমি আমাদের দলে যাই। তুই সব সেরে আয়।
শর্মিষ্ঠা মাথা নিচু করে কয়েকটা ফুচকা খায়। লিপি বলে,
—দাদা, তুই একটু শর্মিষ্ঠাকে এই প্রতিমা দেখিয়ে নিয়ে
আয়। আমার আর হাটতে ইচ্ছে করছে না।
শর্মিষ্ঠা বলে,
—না, তুইও চল।
—বেশি কথা বলিস না তো। ওদিকে গিয়ে ওর সাথে
যতো খুশি বকবক কর।
—ওঃ, তুই না বড্ড বাজে বকিস।
অরণ্য বলে,
—আমার সাথে যেতে আপত্তি আছে নাকি? তাহলে
থাক!
—এমা, আপত্তি থাকবে কেনো?
লিপি, সুমি আর শ্রী হো হো করে হেসে ওঠে।
শর্মিষ্ঠা কপট রাগ করে থাপ্পড় দেখিয়ে বলে,
—দাঁড়া, আসি আগে, তারপর বোঝাবো মজা!
মন্ডপের সামনে যাওয়া পর্যন্ত শর্মিষ্ঠা চুপ করে থাকে।
অরণ্য জিজ্ঞেস করে,
—কি ব্যাপার, কথা বলছো না যে? আমার সঙ্গ ভালো লাগছে না?
—ইস, একথা আমি বলেছি?
—তাহলে?
—তোমার আঙুলের ব্যথা কমেছে?
—এই তো একটা কথা খুঁজে পেয়েছো! ধন্যবাদ।
—লিপি মনে হয় আমাদের বিষয়টা বুঝে ফেলেছে!
—কোন বিষয়টা?
—ওঃ, এতো মহা মুশকিল। সব কথা কি বলা যায়?
—অবশেষে ধরা দিলে!
—তুমি তোমার ফোর্স লাগিয়েছো যেভাবে!
—আর তোমার ঐ দু’জন কি সোর্স নয়?
—ওঃ, কথায় তোমার সাথে পেরে উঠবো না।
—থাক, তোমায় আর অরণ্যে রোদন করতে হবে না।
শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর দাও। “কি দেখলে তুমি
আমাতে?”
—অনেক কিছ… জানি না। বলতে পারবো না যাও।
শর্মিষ্ঠা দু’হাতে মুখ ঢাকে। লিপিরা চুপি চুপি যে পেছনে চলে এসেছে, ওরা খেয়াল করে নি। একসাথে বলে ওঠে,
—কি জানিস না রে?
শর্মিষ্ঠা লিপিকে জড়িয়ে ধরে মুখ লুকোয়। শরতের হিমেল বাতাসে শরীরের সাথে শর্মিষ্ঠার মনটাও শিরশির
করে ওঠে। এবারের শারদীয়া অরণ্য আর শর্মিষ্ঠার জীবনে ফাগুন-হাওয়া বয়ে এনেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *