Subrata Majumdar

#অদ্ভুতুড়ে

#পটলপুরের_পটচিত্র (পর্ব ১২)

#সুব্রত_মজুমদার

পুঁটিরামের বৌ ময়না এমনিতে বেশ গোলগাল সুশ্রী, কিন্তু স্বভাবে চক্রধারী নাগ। ওর বিষের জ্বালায় নীল হয়ে গেছে পুঁটিরাম। তাই রোজগারপাতি না হলে ঘরমুখো হয় না।

আজ তিন চারদিন ধরে কোনও পাত্তা নেই পুঁটিরামের, ময়না তাই রাগে গজগজ করছে।

রাগে গজগজ করতে করতে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে ময়না। তার যত ক্ষোভ যত অভিযোগ পুঁটিরামের উপর। বিশ্বে যদি অপদার্থ কেউ থেকে থাকে তো ওই চোর ব্যাটা, ময়নার জীবনটাকে তছনছ করে দিল।

-“মুখে ঝাঁটা মারি মুখপোড়ার, ঝাঁটা মারি। আমার জীবনটা শেষ করে দিল গো ! ও মা গো তুমি এ কার হাতে তুলে দিলে গো !”

ঝাঁটাখানা হাতে ধরেই চিলচিৎকারে কান্না জুড়ল ময়না, ওর কান্নার আওয়াজে আমগাছে বসে থাকা কাকগুলো কানে ডানা দিল।

কৃষ্ণকটাহ মুখ বেঁকিয়ে বলল, “আ মরি মর ! সাতসকালে চিৎকার জুড়েছে দেখ। স্বামীটাকে তাড়িয়ে এখন আমাদের তাড়ানোর ফন্দি এঁটেছে। ও কালকটাক্ষী চল গো বাঁড়ুজ্জেদের পেয়ারাগাছে গিয়ে বসি ।”

কৃষ্ণকটাহ আর কালকটাক্ষী কা-কা করতে করতে উড়ে গেল। ময়না তার হাতের ঝাঁটাখানা কাকদুটোর দিক উঁচিয়ে চিৎকার করতে লাগল,”সকাল হতে কা-কা করে কাল ডাকছিস ? ঝেঁটিয়ে মুখ ভেঙ্গে দেব। যা না পারিস তো খালভরাকে নিয়ে যা।”

কাকেদের ক্ষমতা নেই খালভরাটিকে নিয়ে যাওয়ার, পুঁটিরাম অত সহজে মরবে না। সে বেশ খোশ মেজাজেই এসে দাঁড়াল ঘরের দরজার সামনে। সঙ্গে অতিথি। তবে দরজার সামনে এসেই নিজেকে বড় অসহায় লাগল। মিছরির দিকে তাকিয়ে বলল,”আমার বৌ, একটু রাগী তবে মনের দিক হতে ভালো।”

বেশ ভয়ে ভয়েই ঘরে ঢুকল পুঁটিরাম। আর পুঁটিরামকে দেখতে পেয়েই ঝাঁটা হাতে দৌড়ে গেল ময়না, পিঠে সপাসপ বাড়ি মারতে মারতে বলল, “হতচ্ছাড়া, এতদিন পরে ঘরের কথা মনে পড়ল ! মেরে বাপের নাম ভুলিয়ে দেব তোর।”

পুঁটিরাম তার বৌকে চেনে, তাই আসবার সময় ঢুকেছিল রঘু কামারের ঘরে, কতগুলো লোহার জিনিসপত্র আর বলিদানের খড়্গটা নিতে পেরেছে। খড়্গ আর কিছু কাস্তে কুড়ুল বিক্রি করে একথলে বাজার করেছে সে । বৌয়ের ঝাঁটা এড়িয়ে সেই থলেটাকে দাওয়ার উপর আজড়ে দিল।

দাওয়ার উপর একরাশ শাকসব্জি নটকনপাতি দেখেই মনটা গলে গেল ময়নার। ছুটে গেল সেদিকে । সব্জিপাতির উপর হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “কি সুন্দর বেগুন, হা গো আলু গুলো কি চন্দ্রমুখী ? বাসমতি চাল ! সোনা মুগের ডাল ! কি সুন্দর চুলের ফিতে ! আমি কি স্বপ্ন দেখছি গো ? এই একটু চিমটি কাট না.. ”

কাছেই একটা থলে হাতে দাঁড়িয়ে ছিল মিছরি। ওর হাত হতে থলেখানা নিয়ে ময়নার হাতে দিল পুঁটিরাম। থলের ভেতর হতে বঁটি, নারকেলকোঁরা, হামানদিস্তার মতো সাংসারিক জিনিস বেরিয়ে আসতেই আবার আব্দার করে বসল ময়না,”দাও না গো একটু চিমটি কেটে, জেগে আছি না ঘুমিয়ে একটু পরখ করে দেখি ।”

সাহসে কুলোল না পুঁটিরামের। সাপ পোষার চেয়েও সাপের লেজে পা দেওয়া বেশি রিস্কের। কিন্তু ময়না যখন বলেছে তখন তো আর উপায় নেই। আগেকার দিনের মুনিঋষিদের মতো ময়নার কথাও অমোঘ, কারোর ক্ষমতা নেই সেই কথার অন্যথা করা। পুঁটিরামের তো নেইই।

খুব সন্তর্পণে এগিয়ে গেল পুঁটিরাম, তারপর একটা রামচিমটি লাগালে ময়নার হাতে। ‘আ’ করে চিৎকার করে উঠল ময়না, তারপর পুঁটিরামের গালে লাগাল কষে দু’চড়। এরপর ধাতস্থ হয়েই পুঁটিরামের লাল হয়ে যাওয়া গালেদুটোতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “আমার গুলুমুলুটা, আমার সোনা ।”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিছরি আর নিজেকে সম্বরণ করতে পারল না, বলল, “আপনাদের কথাবার্তা শেষ হয়ে থাকলে আমাকে কিছু খেতে দেন।”

এতক্ষণে মিছরির দিকে দৃষ্টি গেল ময়নার। মিছরির আপাদমস্তক জরিপ করতে করতে পুঁটিরামকে বলল, “ও মা, এ কে ? তোমার বন্ধু ? তা গাঁটকাটা না ছিঁচকে ?”

পুঁটিরাম এগিয়ে এল ময়নার কাছে, বলল, “কানটা এদিকে নিয়ে এস।”

ময়না তার বাদুরমার্কা কানজোড়া পুঁটিরামের মুখের কাছে আনতেই পুঁটিরাম খুলে বলল সব কথা, বিশেষ করে সোনার খবর। সব শুনে চোখ কপালে উঠে গেল ময়নার। পুঁটিরামের থুতনিটা ধরে বলল,”আমার হাবলু গাবলু। ”

সন্ধ্যা হতেই বেরিয়ে পড়ল পুঁটিরাম। তবে মিছরিকে নিয়ে গেল না। মিছরি যে এই লাইনের লোক নয় তা বেশ বুঝেছে পুঁটিরাম। কিন্তু ওর দেওয়া সোনার খবরটা মিথ্যা নয়, মিথ্যা কথা বলতে যে বুদ্ধির দরকার তা মিছরির নেই।

মনোহর ঠাকুরের ঘরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল পুঁটিরাম। বেশ ভালো করে লক্ষ্য করতে লাগল ঘরটাকে। মাটির ঘরে খড়ের চাল, যজমানি করে খাওয়া বামুনের ঘরে সোনা পাওয়াটা আশ্চর্যের। তবে এই পৃথিবীতে কোনও কিছুই আশ্চর্যের নয়, পুঁটিরামের শ্বশুর মাগন দাস যদি সাধু হতে পারে তবে সবই সম্ভব।

পুঁটিরামের শ্বশুর মাগন দাস লোকটা একসময় এ তল্লাটের ত্রাস ছিল। চুরি ছিনতাই হতে শুরু করে লোকঠকানোর মতো ব্যবসাতেও সিদ্ধহস্ত ছিল সে। কিন্তু ওই লোকটা হঠাৎ করে যে সাধু হয়ে যাবে তা বুঝে উঠতে পারেনি কেউ। আর সাধু হয়েই নিজেকে ভগবান ঘোষণা করে দিল।

গ্রামের যে লোকগুলো এতদিন ধরে গালাগালি দিয়ে এসেছিল তারাই ভক্ত হয়ে হাতচাপড়ে পরমদয়াল ভগবান মাগনের চরণে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছে। দলে দলে লোক ঘুরছে বাবার মন্ত্রে দীক্ষা দেওয়ার জন্য।

পুঁটিরামের খুব রাগ হয়, একদল লোক ভণ্ডামি করে আরাম আয়েশে বসে বসে খাচ্ছে আবার পুঁটিরামের মতো মানুষ পেটের জ্বালায় চুরির মতো অসৎ পেশায় আসতে বাধ্য হচ্ছে। সেবকের বেশে রাজনৈতিক নেতা, অসৎ রাজকর্মচারী, সত্য প্রচারের নামে অসৎ মিডিয়া আর মূর্খ জনতা গণতন্ত্রকে হাস্যকর জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।

রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে, মনোহর ঠাকুরের ঘরের সামনের নিমগাছটাতে দুটো প্যাঁচা কিচকিচগিজগিজ শুরু করে দিয়েছে। মনোহর ঠাকুর খেতে বসেছেন। লোকটা পুঁটিরামের মতোই অসহায়। পুজোআচ্চা করে যেটুকু রোজগারপাতি করে তাতে কোনোরকমে দিন চলে যায়।

দুর্গাপুজোর সময় বহুটাকা খরচ করে প্যান্ডেল হয়, প্রসাদ, ফলফুল, জামাকাপড়, বাজিপটকা এমনকি মদের জন্যও বরাদ্দ হয় প্রচুর, কিন্তু মনোহর ঠাকুরের দক্ষিণা বাড়ে না। যেটুকু তিনি পান সেটুকু আদায় করতেও চটির ফিতে ছিঁড়ে যায়। এরাই নাকি সমাজের উৎপীড়ক শ্রেণী, – ক্রিমি লেয়ার।

বসে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুঁটিরাম। নজর যায় বারান্দায় খেতে বসা ঠাকুরের পাতের দিকে। লাল করে মাখা আলুসেদ্ধ আর পাতলা মুসুরির ডালের সাথে ভাত। পুঁটিরামের ইচ্ছা হয় একখাবল খাওয়ার।

ভগবানের জামাই হলেও ওই পাপের ইনকাম সে গ্রহণ করেনি কোনোদিন। সমাজের কাছে যেটা ঘৃণ্য পেশা সেটাই পুঁটিরামের কাছে রক্তজল করা মেহনতের রোজগার।

নিমগাছের তলায় অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাবছিল পুঁটিরাম। আর এদিকে তার মাথার উপর প্যাঁচাদুটোর লড়াই লেগে গেছে। সেই লড়াইয়ের অভিঘাতে একটা শুকনো নিমডাল এসে পড়ল পুঁটিরামের মাথায়। বিকট চিৎকার করে পড়ে গেল পুঁটিরাম। ভাতের থালা ফেলে ছুটে এল ঠাকুর।
চলবে….

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *