Subrata Majumdar

#অদ্ভুতুড়ে

#পটলপুরের_পটচিত্র (পর্ব ১৩ )

#সুব্রত_মজুমদার

নিমগাছের তলায় অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাবছিল পুঁটিরাম। আর এদিকে তার মাথার উপর প্যাঁচাদুটোর লড়াই লেগে গেছে।

সেই লড়াইয়ের অভিঘাতে একটা শুকনো নিমডাল এসে পড়ল পুঁটিরামের মাথায়। বিকট চিৎকার করে পড়ে গেল পুঁটিরাম। ভাতের থালা ফেলে ছুটে এল ঠাকুর।

পুঁটিরামকে দেখেই চোখ কপালে উঠে গেল ঠাকুরের, – “তুই ? তুই তো সেই পালিয়ে যাওয়া চোট্টা। তা এখানে কি করতে ?”

সব সত্যি কথা খুলে বলাই উচিত। এরকম পরিস্থিতিতে আর কিচ্ছু লুকিয়ে রাখা উচিত নয়। তাই সাতপাঁচ ভেবে পুঁটিরাম বলল, “জেল দেন আর ফাঁসি, আমি কিন্তু আজ সত্যি কথাই বলব।”

ঠাকুর হেসে বললেন, “কি সত্যি কথা রে ? আর তোকে জেল ফাঁসি দেওয়া কি আমার কাজ ? দেখে তো অভুক্ত লাগছে, অনেকক্ষণ বেরিয়েছিস মনেহয়, আয় খাবি আয়।”

পুঁটিরাম উঠে গেল ঠাকুরের সঙ্গে। ঠাকুরের বৌ আরেকটা থালায় করে ভাত ডাল আর আলুসেদ্ধ নিয়ে এল। পাশাপাশি দুজনে খেতে বসল। খেতে খেতে সমস্ত কথা খুলে বলল পুঁটিরাম। আর পুঁটিরামের কথা শুনে হাঁ হয়ে গেলেন ঠাকুর।

ভাতের গ্রাস নামিয়ে রেখে বললেন,”সোনা কোথায় পাব ? সোনাদানা টাকাপয়সা থাকলে কি এ দশা হয় আমার ? তবে মিছরি যখন বলেছে তখন কিছু তো একটা ব্যাপার আছে।
হয় তুই শুনতে ভুল করেছিস নয়তো বুঝতে। আরেকবার বল তো কি শুনেছিস।”

পুঁটিরাম মাথা চুলকে বলল, “কি যেন…. হ্যাঁ.. সূর্যদেব সোনা আর ঠাকুর… এ তিনটে কথাই বলেছিল ও।”

-“আর তুই ভেবেনিলি যে ঠাকুর মানেই মনোহর ঠাকুর। তোর কল্পনাশক্তির বলি আরিফ দিতে হয়।” হো হো করে হেসে উঠলেন ঠাকুরমশাই।

খাওয়া দাওয়ার পর রান্নাঘরের এককোণে শুয়ে পড়ল পুঁটিরাম। একঘুমেই রাত পার হয়ে গেল তার। কিন্তু ঘুম এল না ঠাকুরমশাইয়ের। তিনি শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলেন মিছরির বলা তিনটে কথার মানে।

ভোর হতেই নিজের ঘরে গেল পুঁটিরাম, সন্ধ্যা হতেই নিয়ে এল মিছরিকে। বসার ঘরের মেঝেতে তালাই পেতে তিনজনে বসল। মিছরিকে উদ্দেশ্য করে ঠাকুর বললেন, “ঠিক কি জান বল তো হে।”

অনেকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল মিছরি, তারপর বলল, “সূর্যদেবের মূর্তি। অনেক সোনা।”
-“তুমি কি সেখানে গিয়েছ ? জায়গাটা কোথায় ?”

আবার কি যেন ভাবতে শুরু করে মিছরি। ওর মাথার ভেতরের স্নায়ুগুলোতে বইয়ে যেতে থাকে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ঝড়। সেই ঝড়ের দাপটে তছনছ হয়ে যায় সমস্ত চিন্তাভাবনাগুলো। চোখের সামনে ফুটে ওঠে একটা অন্ধকার জায়গা, সেখানে কিছু লোক একসাথে জড়ো হয়ে কি যেন করছে। আর এরপরেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।

ঘোর কাটতে কথাগুলো বলল মিছরি। ঠাকুর আবার ভাবতে বসলেন। কি এমন জায়গা যেখানে সূর্যদেবের মূর্তি আছে ? অন্ধকারে যে লোকগুলো গল্প করছিল ওরা কারা ? রহস্য তো একটা আছেই।

ভাবতে ভাবতে দুপুর গড়িয়ে যায়। সন্ধ্যা নামে। হঠাৎই ঠাকুরের মাথায় আসে একটা কথা, তিনি গা ঝেড়ে উঠে পড়েন। পাশেই শুয়ে থাকা পুঁটিরাম আর মিছরিকে উঠিয়ে বলেন, “তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে, একজায়গায় যেতে হবে।”

-“কোথায় দাদাঠাকুর ?” ব্যস্তসমস্ত হয়ে শুধাল পুঁটিরাম।
ঠাকুর হেসে বললেন, “তৈরি তো হয়ে নে তারপর দেখাই যাক কোথায় গিয়ে উঠি।”

রাত একটু ঘনিয়ে আসতেই তিনটে ছায়ামূর্তি বের হল বাড়ি হতে। গ্রাম ছাড়িয়ে চলল বনের দিকে। জ্যোৎস্নালোকিত রাতে পথঘাট বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়। রাস্তাটা মনে হয় যেন বাড়ির নিকানো উঠান। এত ঝকঝকে আর তকতকে যে পিঁপড়েগুলোর চলনও স্পষ্ট দেখা যায়।

গ্রাম শেষ হতেই যেখানে বন শুরু হয়েছে সেখানটায় একটা বড় বটগাছ। বটগাছের পাশে প্রাচীন জিওলগাছের শাখাপ্রশাখা ধরে অধোমুখে ঝুলছে রাশিরাশি বাদুর। গাছটার কাছে এসেই মাথা চুলকোতে লাগল মিছরি। কি যেন ভাবছে ও।

-“কি হল মিছরি, কি ভাবছ ?” ঠাকুর জিজ্ঞাসা করলেন।
মিছরি মাথা চুলকে বলল, “চাবি।”
-“মানে ?”
-“হেঁটমুণ্ড নয় সে সাধু তবু খায় ফল,
কাছে তার আছে চাবি, – তরঙ্গেতে বল।”

ছড়াটা বারকয়েক আউড়েই চুপ করে গেল মিছরি। পুঁটিরাম ফিক করে হেসে বলল, “যতসব পাগলের কেত্তন। ওর কথায় কান দিলে আপনারও মাথাটা যাবে দাঠাকুর।”

ঠাকুরকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। কপালের ভাঁজ দু’খানা আরও বেঁকিয়ে বললেন,”না রে পুঁটিরাম এটা নেহাতই পাগলের প্রলাপ নয়। এর মানে আছে। হেঁটমুণ্ড কার বলতো ?”

-“তালগাছ করলেই যে কারোর হেঁটমুণ্ডু হয়ে যাবে। তাছাড়া ঘরের কেউ খারাপ কাজ করলেও মুণ্ডু হেঁট হয়।” চটজলদি জবাব পুঁটিরামের।

-“না রে, এখানে হেঁটমুণ্ড হল বাদুর। ওরা গাছের ফল খায়, আবার তরঙ্গেতে চলাফেরা করে। তাহলে চাবি কি ওদের কাছেই আছে ?”

-“হ্যাঁ দাঠাকুর, সেটাই সম্ভব। আসুন ব্যাটাদের তাড়িয়ে সোনার সিন্দুকের চাবিটা নিয়ে আসি।” উত্তেজিত হয়ে বলল পুঁটিরাম।
-“কিন্তু কিভাবে ?”

ঠাকুরের এই প্রশ্নের উত্তর পুঁটিরামের কাছে নেই। সে গালে হাত দিয়ে ভাবতে লাগল। অনন্ত সে ভাবনা, ভাবনা শেষ হলেই সৃষ্টি শেষ। সুতরাং সৃষ্টির স্থিতি নিয়ে যারা চিন্তিত তারা পুঁটিরামকে তাড়া দেবে না।

পুঁটিরামের এহেন ব্যস্ততার দিনে ঠাকুরের মনও বিচলিত হয়ে উঠল। সোনা কি হাতের কাছাকাছি এসেও হাতছাড়া হয়ে গেল ? আচ্ছা আগুন লাগিয়ে দিলে হয় না ? মনে মনে ভাবতে লাগলেন ঠাকুর।

-“সবার আগে তো আপনারই লেজ পুড়বে কাকা।”
মন যে এত তাড়াতাড়ি উত্তর দেবে তা বুঝতে পারেননি মনোহর ঠাকুর। তিনি চমকে উঠলেন। পরক্ষণেই খেয়াল হল ‘কাকা’ শব্দটি। মন তো আর তাকে কাকা বলে ডাকবে না। তাহলে ?

-“ও মিছেই ভাবছ কাকা, মনের এতও দায় পড়েনি যে তোমাকে কাকা বলে ডাকবে। আমি জগাই গো জগাই।”
-“ও পাগলা !” বুকভরে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলেন ঠাকুর। জগাই পাগলা মন পড়তে পারে, তাই তাকে কিছু লুকোনো অনর্থক পরিশ্রম মাত্র। তবে পাগলা যেমনই হোক বে-আক্কেলে নয়, তাকে গোপন কথা বলে বিশ্বাস করা যায়।

-“আসলে হয়েছে কি বাপ… ”
-“থাক থাক কাকা, আমি সব জানি।” ঠাকুরকে থামিয়ে দিয়ে বলল জগাই। এরপর গলায় হাত দিয়ে একটা সুর তুলল, সেই সুরের প্রাবল্যে যত রাজ্যের বাদুর ছুটে আসতে লাগল। শুধু জিওলগাছই নয়, আশেপাশে যেখানে যত বাদুর ছিল পড়িমরি করে ছুটে আসতে লাগল।

দেখতে দেখতে জগাই ঢেকে গেল বাদুরের আস্তরণে। বাকি বাদুরগুলো পাগলের মতো ছুটে বেড়াতে লাগল। বাদুরদের পাখার ঝাপটে অজ্ঞান হয়ে গেল মিছরি।
চলবে…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *