Subrata Majumdar

 119 total views

        ভৌতিক গাছ ও বগলা (পর্ব ১)

                              বিপদ কখনও একলা আসে না, সে সঙ্গে করে নিয়ে আসে আরও আপদ। এবারেও তাই হল। বীরেশ্বরবাবু চলে যাওয়ার মিনিট পনেরো পরেই হাজির হল অঘোর।  এসেই ঘটাল ঘোরতর কান্ড। নিজের ভারি সুটকেসখানা বগলার শ্রীচরণে নামিয়ে একগাল হেসে বলল, “জবর খবর আছে।”

যন্ত্রনায় মুখ বিকৃত করে বগলা বলল, “সুটকেসটা সরাও, নাহলে আমিই খবর হয়ে যাব।”
-“কি কেস ?”

-“সুটকেস, যেটা আমার পায়ের উপর রেখেছ । সরাও একক্ষুনি। ”

পায়ের উপর হতে সুটকেসটা সরাতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বগলা। পায়ের পাতার উপর হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “নাও, এবার বল তোমার জবর খবর।”

বগলার পাশটাতে গিয়ে বসল অঘোর, বলল,”গোছগাছ করে নে, নলহাটি যাব। ওখানে আমার এক অফিস কলিগের বাড়ি।  অনেক করে বলেছে। নলাটেশ্বরী ঘুরিয়ে দেখাবে। রাতে মাঠের মাঝখানে হ্যারিকেনের আলোয় পিকনিক।”

অঘোরের কথা ফেলতে পারে না বগলা। তার এই খ্যাপাটে মাসতুতো ভাইটি বড় আদরের। যতই ব্লান্ডার করুক না কেন হাসিমুখে যখন দাঁড়ায় তখন ওই নিস্পাপ হাসিতে না ভুলে উপায় নেই।

পরদিন সকালেই বেরিয়ে পড়ল ওরা। বাসে করে প্রায় ঘন্টা আড়াইয়ের রাস্তা। নলহাটির কাছে সমরপুর।

বাঁশগাছের ঝোপ দিয়ে ঘেরা গ্রামটি সবুজে সবুজ। গ্রামের শুরুতেই বিশাল দীঘিতে ভেসে বেড়াচ্ছে শ’খানেক হাঁস। দীঘির বাঁধানো ঘাটে মেয়েদের ভিড়। তাদের কেউ বাসন মাজছে তো কেউ দীঘির কাজলকালো জলে করছে অবগাহন।

                  দীঘি পেরিয়ে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছেলেদের সন্মিলিত সরব পাঠের আওয়াজে মুখরিত হয়ে আছে। বিদ্যালয়ের পাশেই বাঁশের বন, আর বাঁশের বন শেষ হতেই একখানা মাটির দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে উঠোন বাঁশের বাখারি দিয়ে ঘেরা। এটাই অঘোরের কলিগ পলাশের বাড়ি।

ঢুকতেই একটা বিশাল গাছ আমাদের সুশীতল ছায়া দিয়ে আহ্বান করল। গাছটা যে কি প্রজাতির তা নির্ণয় করা কঠিন। আমি তো বাপের জন্মেও দেখিনি, এমনকি পলাশও জানে না গাছটার নাম।

বছর পঁচিশেক আগে হঠাৎ করেই নাকি এই গাছটার আবির্ভাব হয়। সেদিন হতে আজ পর্যন্ত একটুও ক্ষয়ব্যয় হয়নি এই গাছের।

-“বল কি হে, উড়ে এসে জুড়ে বসেছে ?” গাছটাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল অঘোর।

অঘোরের কথা শুনে পলাশের মুখচোখ যেন শুকিয়ে গেল। ও প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “ওসব ছাড়ুন তো, ঘরে আসুন। হাতমুখ ধুয়ে বিশ্রাম নিন। কই গো মদনদা , গেলে কোথা ?”

একটা বছর পঁয়তাল্লিশের কালো ঢ্যাঙা লোক এসে হাজির হল। সম্ভবত ওর নামই মদন। এসেই বগলাদের ব্যাগদুটো হস্তগত করে বলল, “আমার সঙ্গে আসুন।”

মদন আর পলাশ দুজনেই খুব মিশুকে। মদন তো কথার সাগর, ঢেউয়ের শেষ নেই। তবে মনের দিক হতেও খুব ভালো। দোতলার একটা ঘরে আমাদের নিয়ে গেল ও।

              তক্তপোষের উপর বেশ পরিপাটি করে পাতা বিছানা, শালকাঠের পাটা আর মাটি দিয়ে তৈরি সিলিং হতে কাগজের তৈরি দইয়ের ভাঁড় ঝুলছে। ঘরের এককোণে একটা টেবিল, টেবিলের উপর কাচের তৈরি কেরোসিন ল্যাম্প। পাশেই কতগুলো বই।

বগলাদের ব্যাগদুটো টেবিলের উপর নামিয়ে রাখল মদন। তারপর অঘোর আর বগলার দিকে ঘুরে আবার নিজের বকবকানি শুরু করল সে।

“এ বাড়িতে তো এখন আর কেউ থাকে না, বড়বাবুর আমলে ঘরে যেন সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মী বিরাজ করত। আসার সময় দেখলেন না ওই যে বড় দীঘিটা, ওই গোটা দীঘিটাই বাবুদের। কুটুমজন এলে মাছ ধরানো হত, আমার মা বসতেন বড় আঁশবঁটি নিয়ে।” মায়ের প্রসঙ্গ আসতেই চুপ করে গেল মদন, যেন ভুল করে কোনও নিষিদ্ধ কথা বলে ফেলেছে সে।

-“তোমার মা বুঝি এখানে কাজ করত ?” প্রশ্ন করল বগলা।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মদন বলল,”হ্যাঁ।” সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,”কি খাবেন বাবুরা, – চা না শরবত ?”

-“দুটোই । এখানে যখন এসেছি তখন কিচ্ছু বাদ দেব না। আগে শরবত আসুক, তারপর চা। মুড়িতে বেশ গরম গরম বেগুনি ভেজো তো। জমিয়ে ঝাল দেবে।” নিজের মনের কথা ঘোষণা করল অঘোর।

-“ঠিক আছে বাবু ” বলেই বেরিয়ে গেল মদন। যাবার সময় ওর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া চোখমুখ আমি লক্ষ্য করেছে বগলা, কাছে গোপন কিছু একটা ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভুগছিল ও।

অঘোরের কাছে এই আশঙ্কার কথা বলল না বগলা, অঘোর যা রাশপাতলা কোনও না কোনও একটা কীর্তি করে বসবে।

মিনিট পাঁচেকের ভেতরেই শরবত এল। লেবুর টাটকা গন্ধে ম’ম’ করছে গ্লাস। শরবতের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বগলা বলল, “লেবু কি ঘরের গাছের ?”

-“ঘরের গাছের লেবু কোথায় পাবেন বাবু, বাগানে কি কোনও গাছ লাগানোর…..” আবার যেন কি বলতে গিয়ে চুপ করে গেল মদন। বগলাও আর কৌতুহল প্রকাশ করল না।

খালি গ্লাসদুটো নিয়ে নিচে যাওয়ার সময় মদন বলল, “বেশি মাথা ঘামাবেন না বাবু, অতিথি ।”

চমকে উঠল বগলা, মদনের কথাটা সাবধানবাণী না ধমকি তা বোঝা গেল না। তবে এখানে এসে যে একটা বড়সড় কোনও ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে চলেছে তা বেশ বুঝতে পারল।

অঘোরের মতো আলাভোলা লোকও কথাটাকে স্বাভাবিকভাবে নেয় নি। সে গর্জে উঠল,”অ্যায় মদনা, কি ভেবেছি তুই ? আমি তোর বাড়িতে খেতে এসেছি ? আমার ঘরে ভাত নেই ? তোর সেই মালিক হতচ্ছাড়া কোথায় লুকোলো ? ডাক ওকে।”

মদন তো আর দাঁড়ালই না, ব্যস্তসমস্ত হয়ে বগলা বলল, “আহ্ অঘোর, পরের ঘরে এসে এরকম করা মানায় না। ও যাই বলে থাক, ব্যাপারটার এখানেই ইতি করে দাও।”

অঘোর দমবার লোক নয়, পলাশ আসতেই আবার চিৎকার শুরু করল,”তুমি কি আমাকে অপমান করার জন্য ডেকেছ ? সেটা স্পষ্ট করেই বলে দাও।”
-“কি হয়েছে কি ব্যানার্জীবাবু ? আমাকে বলুন।” শশব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করল পলাশ।

মদনের কথাটা ইনিয়ে বিনিময়ে পলাশকে বলল অঘোর। সব শুনে মুখ ঝুলে গেল পলাশের। ‘আমি দেখছি’ গোছের বলেই প্রসঙ্গে ইতি টানল সে। কোথাও যে একটা বড়সড় গলদ আছে তা বেশ বুঝতে পারছে বগলা। কিন্তু এ কথা জিজ্ঞাসা করাও ধৃষ্টতা। অঘোর যা রেগে আছে তাতে তুলকালাম কান্ড হবে ভেবে অঘোরকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল বগলা।

        দুপুরের মেনু দেখেই সমস্ত রাগ জল হয়ে গেল অঘোরের। ছত্রিশ চালের ভাত, নারকেল দেওয়া ঘন মুগের ডাল, বেগুন ভাজা, আলু পোস্ত, আর কচি পাঁঠার অমৃত সমান ঝোল অঘোরের জিভের মাধ্যমে মরমে প্রবেশ করল। তবে বগলার ফেভারিট দেশি টাটকা ঘিয়ের সাথে কাগজি লেবু।

খাওয়া শেষ করে একটা ভাতঘুম, তারপর বিকেল বিকেল চা-টা খেয়ে তিনজনে বের হল বৈকালিক ভ্রমণে। সমরপুরে কোনও ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য না থাকলেও যা আছে তা প্রকৃতিপাঠকের কাছে সোনার খনির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। যেদিকে দৃষ্টি পড়ে সেদিকেই সবুজের সমারোহ, মাঠ ভর্তি ফসল আর সেই সবুজ মাঠের সঙ্গে মিশেছে নীল আকাশ।

          আর দু’চারটে মাঠের পরে পরেই একটা করে ছোট্ট খড়ের কুঁড়েঘর। ওই ঘরগুলোতে থাকে পাহারাদাররা, চোর শেয়াল আর অন্যান্য উপদ্রব হতে ফসল আগলায় ।

এরকমই একটা মাঠপাহারার কুঁড়েতে পিকনিকের পরিকল্পনা হয়েছে । তবে সেটা আগামী কাল বা পরশু। ঘুরতে ঘুরতে পলাশদের জমির কাছাকাছি এল ওরা। পলাশদের যে মাঠপাহারার ঘর সেটা যেন অন্যগুলোর তুলনায় আলাদা, আর তার চারদিকের জমিও সবুজ নয়। মরুভূমির মতো বালুময়। আর সেই বালিতে জন্মেছে ফণিমনসার মতো কাঁটাগাছ।

পলাশকে জিজ্ঞাসা করতেই ও বলল, “ঠিক জানি না, তবে এটুকু জানি যে ওখানে যাওয়া নিষেধ। আমাদের পিকনিক হবে ঘোষাল কাকাদের শশাক্ষেতের পাশে । আমি কথা বলে এসেছি।”

পলাশ আর অঘোর একটু অন্যমনস্ক হতেই ওই বন্ধ্যা জমিগুলোর দিকে এগিয়ে গেল বগলা। সবুজ মাঠের পাশেই আচমকা একটুকরো মরুভূমির আবির্ভাব। বালিতে একটুও রসালো ভাব নেই। শুকনো ঝরঝরে বালি। একমুঠো বালি তুলে নাকের কাছে ধরল বগলা। একটা আঁশটে গন্ধ রয়েছে। হাত হতে ফেলে দিলেও হাতে একটা লালচে দাগ লেগে গেল।

দাগটা আপাতদৃষ্টিতে মরচে বা মোড়ামের দাগ মনে হলেও ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে যে সেটা তা নয়।

ফণিমনসার গাছগুলোও কেমন যেন, ঝোপগুলোর আকার নরকঙ্কালের মতো। পকেট হতে ছুরি বের করে ফণিমনসার একটা টুকরো কেটে নিল বগলা। কাটার সঙ্গে সঙ্গে রসের পরিবর্তে টাটকা রক্ত বের হতে লাগল। অন্য কেউ হলে এই দৃশ্য দেখে চিৎকার করে উঠত, কিন্তু বগলার এসবে অভ্যাস আছে। সে ছুরিটা মুছে পকেটে ভরে নিল, এগিয়ে চলল অঘোরদের কাছে।
চলবে….

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *