Subrata Majumdar

 8 total views

#অদ্ভুতুড়ে

#পটলপুরের_পটচিত্র (পর্ব ১৫)

#সুব্রত_মজুমদার

অনেক আলাপ আলোচনার পর কুকুরের দল ঝাঁপিয়ে পড়ল ছায়ামূর্তিগুলোর উপর। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল কামড়াকামড়ি আঁচড়াআঁচড়ি চিৎকার । ছায়ামূর্তিগুলোর সঙ্গে থাকা খাবারের প্যাকেটগুলো নিয়ে কেটে পড়ল কুকুরের দল।

আর ছায়ামূর্তিরা ? ওরাও বাবার মা-রে করে জুড়ল প্রেতের নৃত্য। নৃত্য দেখে অজ্ঞান হয়ে গেলেন ঠাকুর। পুঁটিরামের অবস্থাও তাই। একমাত্র মিছরিই দাঁড়িয়ে রইল নির্বিকার ভাবে। জগাই ওর দিকে চেয়ে বলল, “তুমিই বা কেন…. অজ্ঞান হয়ে যাও।”

জগাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল পুঁটিরাম আর মনোহর ঠাকুরের জ্ঞান ফেরানোর কাজে। এদিকে হৈচৈ শুনে দরজা খুলে বাইরে এসেছেন প্রফেসর। হাতে তার একটা পাঁচসেল টর্চ। সঙ্গে চরণদাস।

-“কে… কে ওখানে ? কারা কথা বলে ?” এগিয়ে এলেন প্রফেসর।

প্রফেসরকে দেখে আঁতকে উঠলেন ঠাকুর, আর রক্ষা নেই। পুঁটিরামও ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে। কিন্তু এখন আর পালানোর উপায় নেই। একদম কাছে এসে পড়েছেন প্রফেসর। চরণদাসের হাতে আবার তেল মাখানো লাঠি।

-“আ.. আমি গো প্রফেসার… ” হাত তুলে সামনে এগিয়ে এলেন ঠাকুর। পুঁটিরামও ওইরকম আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতেই পেছন পেছন বেরিয়ে এল। কিন্তু জগাই আর মিছরি এল বিজয়ীর ভঙ্গিতে । ওদের ভয়ডরের বালাই নেই।

কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিলেন ঠাকুর কিন্তু প্রফেসর হাত তুলে চুপ করতে বললেন। বললেন,”ভেতরে আসুন ।”

প্রফেসরের বসবার ঘরে বসল সকলে। ঠাকুর খুলে বললেন আদ্যোপ্রান্ত। সবশুনে প্রফেসর বললেন, “কিছু যে একটা ঘটছে তা টের পাচ্ছিলাম। সন্ধ্যা হলেই আমার ঘরের আশপাশে ভুতেদের তান্ডব শুরু হয়ে যায়। এমনকি দিনের বেলাতেও ঘরের ভেতরে ওদের উৎপাত। কিছু তো একটা ঘটছেই ঠাকুরমশাই। আচ্ছা একটা চাবি পেয়েছেন বললেন না, দেখি তো চাবি খানা।”

চাবি আর ধাতব তাগাখানা প্রফেসরের দিকে এগিয়ে দিলেন ঠাকুর। প্রফেসর সেদুটোকে বিভিন্নভাবে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন। এরপর অণুবীক্ষণের নিচে রেখে কি যেন দেখতে লাগলেন। বিভিন্ন রাসায়নিক দিয়ে পরীক্ষা করলেন।

পরীক্ষা শেষ হতেই চাবি আর তাগাখানা ঠাকুরের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, “কমকরে আড়াইশো বছরের পুরোনো। তাগা আর চাবিতে রেডিয়েশনের ট্রেস পাওয়া যাচ্ছে। লোকটা এমন কোনও জায়গায় গিয়েছিল যেখানে তেজস্ক্রিয় মৌলের অস্তিত্ব রয়েছে।”

-“কি বলছেন প্রফেসর, রেডিওঅ্যাক্টিভ এলিমেন্ট ? আমি জানি।” বলে উঠল জগাই।
-“এখানে ? পটলপুরে রেডিও অ্যাক্টিভ এলিমেন্ট ?” প্রফেসর চমকে উঠলেন, কিন্তু তিনি অবিশ্বাস করলেন না, কারণ পাগল হলেও যথেষ্টই জ্ঞানী জগাই। জগাইয়ের জ্ঞানের উপর আছে প্রফেসরের।
-“কোথায় ?”

প্রফেসরের প্রশ্নের উত্তরে একবার মাথা দোলাল জগাই, বলল,”নিয়ে যেতে পারি, কিন্তু মরার ইচ্ছা নেই। ”
জগাইয়ের পিঠে হাত রাখলেন প্রফেসর। বললেন, “সে পোষাক আমার কাছে আছে। একবার পরে নিলে একটাও তেজস্ক্রিয় কণা শরীরে ঢুকতে পারবে না। তাহলে সামনের বৃহস্পতিবার রাতেই। ঠিক তো ?”
দু’হাতের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জগাই বলল, “ডান।”
উপস্থিত সবাই হাত তুলে সম্মতি জানাল।

পাঁচ

একটা আলোআঁধারিতে মাখা ঘরে জনাচারেক ছায়ামূর্তি, ঘরের লাল আলো ওদেরকে আরও রহস্যময় লাগছে। ঘরের মাঝখানে টেবিলের সামনে একটা হাতলভাঙ্গা কাঠের চেয়ারে বসে ছায়ামূর্তিটা সম্ভবত ওদের সর্দার ।

সর্দার ছায়ামূর্তিটা বলল, “কি রে কিছু খবর পেলি ?”
একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে এসে বলল, “না বস, কে একজন ঘেঁটে ঘ করে দিয়েছে আমাদের পরিকল্পনা। এখন তো আমাদের মতো অনেকেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। কারোর দরকার লাবড়ো তো কারোর অন্যকিছু।”

-“কার কাজ হতে পারে ?” জলদগম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন সর্দার।
ছায়ামূর্তিটি বলল,”তা তো জানি না। তবে আমাদের লোক খবর নিচ্ছে। খুব তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে যাবে ও।”

-“থাক, প্রমিথিউসের সেই আলোকবর্তিকার সন্ধান আমি পেয়ে গেছি। এটা বিজ্ঞানের যুগ, আর এইযুগে দরকার আরও আরও শক্তি। প্রমিথিউসের সেই আলো আমাদের দেবে শক্তির সাথে সাথে লক্ষ্মীর সন্ধান। তৈরি হয়ে যাও, সময় আসন্ন। তৈরি হও… ”

পটলপুরের চণ্ডিমণ্ডপে বসেছে গোপন বৈঠক। গোটা গ্রামে যে ভৌতিক কান্ড চলছে সেই ভৌতিক কান্ডের নিরসনে একটা সদর্থক কিছু করা উচিত। তা না হলে গোটা গ্রাম পিশাচদের ছায়ামূর্তিতে ভরে যাবে।

-“ধরতে পারলে শালাদের ল্যাজে আগুন লাগিয়ে দেব। আমাকে চেনে না ব্যাটারা। কপাল শাস্ত্রী হে হাম।” হামবড়াই প্রকাশ করলেন শাস্ত্রীমশাই।
জগাই খ্যাপা দাঁত বের করে একচোট হেসে নিয়ে বলল, “সবাইকে কি বাঁদর পেয়েছেন শাস্ত্রীজী ? ওরা খ্যাপা ষাঁড়, গুঁতিয়ে কোমর ভেঙ্গে দেবে।”

কপাল শাস্ত্রী বিরক্ত হয়ে বললেন,”হ্যাঁ, তোর মতো।”
দুটো হাত মাথার কাছে এনে শিং বানিয়ে শাস্ত্রীজীকে গুঁতোতে গেল জগাই, সবাই হো হো করে হেসে উঠল। সভার সভাপতি অবিনাশ ডাক্তার এক ধমক দিয়ে সবাইকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললেন,”সব চুপ…. সব চুপ। এ কি সভা না আলকাপের আসর ? যে যা পারছে সংলাপ বলে যাচ্ছে। কে কি করতে পারবেন সেটাই বলুন। তবে শাস্ত্রীজী আপনার কপালচর্চা বাদ দিয়ে। ও দিয়ে কিস্যু হয় না।”

মনেমনে মনে ক্ষুব্ধ হলেও মুখে কিছু বললেন না শাস্ত্রীমশাই। যদু মাষ্টার উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,”আজ সকালবেলা জঙ্গলের দিকে গিয়েছিলাম, সেখানে যা দেখলাম তাতে তো এখনও বুক কাঁপছে আমার।”

-“কি দেখলেন ? কি দেখলেন ?” সবাই কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করল।

যদু মাষ্টার চোখ বড় বড় করে বললেন, “ওই যে বাদুরভর্তি জিওলগাছটা আছে না, ওটার তলাতে একটা আস্ত কঙ্কাল। আমাদের পাড়ার মেধো কাল সন্ধেতে কয়েকটা লোককে ওই কঙ্কাল নিয়ে টানাটানি করতে দেখেছে। ওদের পেছন নিয়েছিল মেধো। লোকগুলো প্রফেসারের ঘরে বসে সামনের বৃহস্পতিবার রাতে কোথায় যাবার প্ল্যান করছিল।”

যদু মাষ্টারের কথা শুনে গম্ভীর হয়ে গেলেন ডাক্তার। বললেন,”বৃহস্পতিবারই এর ফয়শালা হবে। হাতেনাতে ধরব ব্যাটাদের। চোর হোক আর ভুত, কারোর রক্ষা নেই।”

সবাই সম্মিলিত হাততালিতে প্রস্তাব সমর্থন করল। বারবেলাতেই ময়দানে নামবে পটলপুরের খেলুড়েরা।”

পুঁটির মায়ের মনটা আজ ভালো নেই। মাথার ভেতরের ভুতটা আজ আসব আসব করেও আসছে না। এভাবে চললে বেঁচে থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের সব ছন্দ হারিয়ে যায়। না, এরকম হতে দেওয়া যাবে না। কিছু একটা করতেই হবে।

-“কি রে পুঁটির মা এত রাতে এই পুকুরপাড়ে বসে বসে কি করেছিস ?”

পুঁটির মা চেয়ে দেখল তার পাশেই একটা ছায়ামূর্তি। বিশেষ ওঝা। বিশে ওঝা এসময় বের হয় সাধনভজন করতে। নদীর ধারে নরকপালে করে মদ খায়। সেকাজেই যাচ্ছে হয়তো। পুঁটির মা বিরক্ত হয়ে বলে, “এই পুঁটির মা কে ভয় দেখানোর ক্ষমতা কারোর নেই। আমিই ভুত, আমিই পিশাচিনী আমিই…..”

-“থাক থাক থাক। তোর ঘাড়ে সমর দত্তর বৌয়ের ভুত চাপেনি বলেই যত সমস্যা। তবে এর সমাধান আমার কাছে আছে।”
চলবে……

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *