subrata majumdar

Subrata Majumdar

 6 total views

#অদ্ভুতুড়ে

#পটলপুরের_পটচিত্র (পর্ব ১৬)

#সুব্রত_মজুমদার

পুঁটির মায়ের মনটা আজ ভালো নেই। মাথার ভেতরের ভুতটা আজ আসব আসব করেও আসছে না। এভাবে চললে বেঁচে থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের সব ছন্দ হারিয়ে যায়। না, এরকম হতে দেওয়া যাবে না। কিছু একটা করতেই হবে।

-“কি রে পুঁটির মা এত রাতে এই পুকুরপাড়ে বসে বসে কি করেছিস ?”

পুঁটির মা চেয়ে দেখল তার পাশেই একটা ছায়ামূর্তি। বিশেষ ওঝা। বিশে ওঝা এসময় বের হয় সাধনভজন করতে। নদীর ধারে নরকপালে করে মদ খায়। সেকাজেই যাচ্ছে হয়তো।

পুঁটির মা বিরক্ত হয়ে বলে, “এই পুঁটির মা কে ভয় দেখানোর ক্ষমতা কারোর নেই। আমিই ভুত, আমিই পিশাচিনী আমিই…..”

-“থাক থাক থাক। তোর ঘাড়ে সমর দত্তর বৌয়ের ভুত চাপেনি বলেই যত সমস্যা। তবে এর সমাধান আমার কাছে আছে।”
-“কি সমাধান ?”

বিশে ওঝা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে, “জানি, তোর সমস্যা জানি। তবে শোন্, বৃহস্পতিবার ভালো যোগ পড়ছে, সেরাতে ওই ভাঙ্গা শিবমন্দিরে আয়। গোটাকয়েক পেত্নী আর পিশাচিনীকে ধরে সেটিং করে দেব।”

অট্টহাস্য করে উঠল পুঁটির মা, এরপর উঠ দাঁড়িয়ে “সাবাশ” বলে বিশের পিঠে এমন চাপড় মারল যে বিশের চোখের কোল দিয়ে জল গড়িয়ে এল।

আর বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল ও। পাগল ছাগলের কাছে বেশিক্ষণ থাকলে জীবন যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বিশে ওঝা চলে যেতেই অদ্ভুত সুরে গান ধরে পুঁটির মা।

আরে রে রে রে রে…..
সন্ধ্যা বেলায় ছাদনাতলায় কে এসেছে কে ?
আগডুম বাগডুম গানের তালে খ্যাঁকশেয়ালীর কোমর দোলে,
হুলো বরের নাচের তালে নাচতে এল সে।
ড্যাবড্যাবে চোখ লক্ষ্মী পেঁচা, আয় দেখি রে কোমর নাচা,
পেঁচায় দেখে সাপের বাছা দৌড়ে ভেগেছে।
রামভজনের মামার খুঁড়ো, বয়স আশি খুবই বুড়ো,
চুল বেঁধেছে মাথায় চুড়ো, ঢোলক এনেছে।
ঢোলক বাজে নাচছে সবাই, মন্ত্র পড়ে পুরুতমশাই,
লক্ষ্মী কনে শান্ত মেনি লজ্জা পেয়েছে।

সেই গানের সুরে আশেপাশের ঝোপঝাড় হতে বেরিয়ে শেয়ালের দল যে দিকে সম্ভব ছুটে যায়। ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙেরা তাদের কলরোল থামিয়ে যে যেখানে পারে লুকিয়ে পড়ে।

এতসব ঘটনার মাঝেও যে লোকটা সম্পূর্ণ উদাসীন তিনি হলেন সমর দত্ত। সংসারে বড় দাগা খেয়েছেন তিনি।
কৃপণ বাপের রেখে যাওয়া সম্পত্তির বৃদ্ধি তো হচ্ছেই না বরং ক্ষয় হয়ে চলেছে ক্রমাগত। মা লক্ষ্মী একেই চঞ্চলা, তার উপর এত অত্যাচার কি সহ্য হয় ?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন দত্তমশাই। কেউ তাকে বুঝল না।

এদিকে পুঁটিরামের বৌ ময়না স্বামীর চালচলনে বেশ সন্দিহান হয়ে উঠেছে। মিছরি নামের লোকটাও কিছু বলে না। ওকে জিজ্ঞেস করলেই বলে, “সোনা… ঠাকুর..”

মুখ ঝেমটিয়ে ওঠে ময়না, “সোনা না হাঁতি। মিনসের মন গিয়েছে কলাবাগানে। ওসব হরিসংকীর্তনে আর রুচি নেই বাবুর। একবার হাতেনাতে ধরি, তারপর বুঝিয়ে দেব আমি কেমন মেয়ে।”

-“তুমি যে কেমন মেয়ে তা আমি জানি গো বৌ, তুমি আমার ফুলেশ্বরী।” পুঁটিরাম এসে ঢোকে। হাতে তার একটা থলেতে কিছু ঘটিবাটি। আজ বেশ ভালোই দাঁও মেরেছে সে। কাল মহাজনের কাছে বিক্রি করে আসবে।

পুঁটিরামের গলার আওয়াজ পেয়ে চুপ করে যায় ময়না, মনের রাগ মনেই পুষে রেখে বলে, “কিছু হল ?”

-“হ্যাঁ, একঘর সারলাম। তামার ঘটিবাটি পেয়েছি । বেশ দাম।”

ময়না মুখ বেঁকিয়ে বলে, “সোনা হোক আর তামা, সমর দত্তর হাতে পড়লে তো সবই গেল। আধা দামও দেয় না শয়তানটা। নাকি বাকি টাকাপয়সা নিয়ে তুমি কিছু কর ? সংসার পেতেছ আরেকটা ?”

পুঁটিরাম নাককান মুলে বলে,”রাম রাম, তুমি থাকতে আবার অন্য কেউ। ভাত দাও তো, বড্ড খিদে পেয়েছে। তোমার মান অভিমান পরে হবে।”

ঘরের ভেতর হতে একথালা জল দেওয়া ভাত আর একটা পেঁয়াজ এনে ঠক করে নামিয়ে দিল ময়না। পুঁটিরাম বুঝল যে আবহাওয়া গরম, তাই লঙ্কা আর তেল নিজেই নিয়ে এসে খেতে শুরু করল।

-“মিছরিকে খেতে দিয়েছ তো ?”
কোনও উত্তর এল না। পুঁটিরাম আবার প্রশ্ন করল,”তুমি খেয়েছ ?”

ময়না এবার ঝঙ্কার তুলে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ সবাইকে দিয়েছি। আর আমার কথা ভাবার দরকার নেই। যার কথা ভাবলে ভালো লাগে তার কথা ভাবগে যাও।”
পুঁটিরাম আর কথা না বাড়িয়ে খেতে লাগল।

বিবাহিত আর জীবিত লোকের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক তা পুঁটিরামের চেয়ে ভালো কেউ বোঝে না। এ জীবনে একফোঁটাও শান্তি পেল না সে। সোনাদানা যদি কিছু পাওয়া যায় তবে একটা বিশাল বাড়ি তৈরি করবে সে। সামনে থাকবে একটা বাগান, বাগানে যত রাজ্যের গাছপালা। সারাদিন কেটে যাবে গাছপালার যত্ন নিতে নিতে।

এদিকে পুকুরের পাড়ে নির্জন একটা ঝোপে মুখ হাঁড়ি করে বসে আছে ভেউভেউ। শরীরটা ঠিক নেই । শরীরে সুখ না থাকলে মনেও শান্তি আসে না। চুরি করে ছিনতাই করে খাবার খাওয়া যে কতটা খারাপ আজ ওরা বুঝেছে।

ছায়ামূর্তিগুলোর কাছ হতে খাবার ছিনিয়ে এনে এই পুকুরপাড়েই ভাগ বাঁটোয়ারা করে খেয়েছে সবাই। ভেউভেউ সর্দার বলে পরিমাণে পেয়েছে বেশি। আর খাওয়া দাওয়ার পর সবার হাল দেখার মতো।

ভাগ্য ভালো কুকুরদের শুচিবাই নেই, নাহলে জল ঘেঁটে ঘেঁটে নিউমোনিয়া হয়ে যেত সবার। বুড়ো দুটো কুকুর আর ভেউভেউ এর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ, বাকিরা তাও ঘুরেফিরে বেড়াতে পারছে।

-“উঁউউউউ…. সবাইকে দেখে নেব, কাউকে ছাড়ব না। ভেজাল খাবার দিয়ে মারার চেষ্টা। ওই ওই ওই ওই…..” আবার হয়ে গেল ভেউভেউ এর।

বুড়ো কুকুরদুটোও আর্তনাদ করে উঠল। ওদের অবস্থাও ভালো নয়।

সারমেয়দের এই বিপদের দিনে আর কেউ থাকুক আর না থাকুক একজন এসে হাজির। সে হল জগাই । জগাইকে দেখে অনেক কষ্টে লেজ নাড়াতে নাড়াতে ভেউভেউ বলল,”আর পারি না ভাই, শরীরের সব গিঁট আলগা হয়ে গেছে। আর বোধহয় বাঁচব না।”

জগাই তার প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যাগটা নামাতে নামাতে বলে, “আমি যখন এসে গেছি তখন আর কোনও চিন্তা নেই ভেউভেউ ভাই। তোমাকে আর এই বুড়োদুটোকে বাঁচাতেই হবে।” ব্যাগ হতে একটা সিরিঞ্জ বের করে ইঞ্জেকশন রেডি করতে থাকে।

ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জটা নিয়ে এগোতেই ভেউভেউ একটা আর্তনাদ করে ওঠে। সাথে যুক্ত হয় পাশে পড়ে থাকা মৃতপ্রায় দুই বুড়ো কুকুরের আর্তস্বর। দূর হতে শুনলে মনে হবে যেন চিনা কুকুর উৎসবে কুঁতকুঁতে চোখের কেউ রামদা নিয়ে এগিয়ে আসছে কুকুরগুলোর দিকে।

একছুটে পুকুর পাড়ের রাস্তা ধরে ভেউভেউ। বাকি দুটো কুকুরও অনেক কষ্টে উঠে ভেউভেউ এর পেছন নেয়। জগাই কিন্তু ছাড়বার পাত্র নয়, সেও পেছন নিল কুকুরগুলোর। কুকুর দৌড়ে তো তার পেছন পেছন জগাই।

মিনিট পনেরোর মধ্যেই তিনটে কুকুর জিভ বের করে বসে পড়ল। জগাই লাগিয়ে দিল ইঞ্জেকশন। আর কোনও আওয়াজ বের হল না। তিনটে কুকুরই চোখ বন্ধ করে উল্টে পড়ল।

পশুপ্রেমীরা আবার জগাইয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বের হবেন না যেন, কারণ পাগল হলেও যে কোনও পেশাতেই জগাই সিদ্ধহস্ত ।

এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। সমর দত্তর বাড়ির পেছনের বটতলায় গেলে দেখতে পাবেন যে তিনজনেই একে অপরের সঙ্গে খুনসুটি করছে। কুকুরের যা স্বভাব। তবে কোনও বিপদে পড়লে যে আর জগাইকে ডাকবে না এটা নিশ্চিত। এ ব্যাথা কি যে ব্যাথা জানে কি আনজনে ?
চলবে…..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *