story and article

Subrata Majumdar

 4 total views

#অদ্ভুতুড়ে

#পটলপুরের_পটচিত্র (পর্ব ১৭ )

#সুব্রত_মজুমদার

ভালো নেই কাকেরাও। তাদের সর্দার কৃষ্ণকটাহের দুটো ডিম নিখোঁজ, সন্দেহ ওপাড়ার পরভৃৎ আর তা বৌয়ের উপর।

পরভৃৎ কোকিলদের মধ্যে সবচেয়ে চালাক আর সুন্দর গলার অধিকারী। কিন্তু ওই একটাই রোগ পরভৃতের বৌ কখনও নিজের ডিমে তা দেয় না। চোখের সামনে ডিমজোড়াকে তো আর নষ্ট হতে দেখা যায় না, অগত্যা পরভৃতকেই মাঠে নামতে হয়।

মানে ডিম নিয়ে মাঠের উপর দিয়ে উড়ে যেতে হয় বটগাছের উপর কোনও কাকের বাসায়। কাকের বাসায় নিজের ডিমদুটো রেখে কাকের ডিমদুটো ফেলে দিয়ে আসে দূরে কোথাও।

কৃষ্ণকটাহের কাছে খবর আছে যে পরভৃৎ তাদের ডিমদুটো ফেলে দিয়ে এসেছে নদীর ধারের ভাঙ্গা শিবমন্দিরে। তবে জায়গাটা খুব নিরাপদ নয়, কি যেন একটা শক্তি ঘিরে থাকে জায়গাটাকে। বৃহস্পতিবার কাকেদের গুরু কর্কটানন্দ আসবেন। তাকে নিয়েই বেরোতে হবে অভিযানে।

নদীর ধারে শিবমন্দিরের পাশেই একটা গাছে বাস করে একজোড়া পেঁচা। পাঁচি আর পেঁচো। ওরা দিনভর গাছের কোটরে ঘুমোয় আর রাত হলেই বেরিয়ে এসে গাছের ডালে বসে। পেঁচো যায় শিকারে। মেঠো ইঁদুর, ব্যাঙ ইত্যাদি টাটকা তাজা শিকার এনে পাঁচির সামনে রাখে। পাঁচি সারারাত ডালে বসে পশুপাখি জন্তুজানোয়ার মানুষজনের যাতায়াত দেখে আর হাঁকে, “কে ওওওওওওও….”

পাঁচির খেয়ালের কাছে পেঁচোর নাজেহাল অবস্থা। হাজার করেও মন পাওয়া যায় না বৌয়ের। সংসার নামক সমুদ্রে নুনের পুতুল হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে সে, গলতে যতক্ষণ ।

আজ দুটো ধেড়ে-ইঁদুর এনেছে পেঁচো, কিন্তু তবুও পাঁচির মন ওঠেনি। মাথাখানা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে বেজার ভঙ্গিতে বলল,”রোজ রোজ মেঠো ইঁদুর আর মেঠো ইঁদুর। শিবমন্দিরের ভেতরে যে সুরঙ্গ আছে সেখানে বিস্তর ইঁদুর, অন্ধকারে গা’হতে কত সুন্দর আলো বের হয়।”

-“তুমি জানলে কিভাবে ? সেই টুপিওয়ালা লোকটার খাতা হতে ?”
পেঁচোর কথায় হেসে উঠল পাঁচি। মাথাটা আরেকপাক ঘুরিয়ে ঠোঁটটা সামনে নিয়ে এসে বলল,”খুব সুন্দর লিখেছে কিন্তু অলপ্পেয়েটা। পি-আর-ও-এম-আই-টি আরও কি কি সব যেন। ”

পাঁচি দু’চারকলম লেখাপড়া জানে বলে পেঁচোর সঙ্গে ঢং করে কথাবার্তা বলে। দেমাক দেখায়। পেঁচোর পোড়া কপাল, নইলে যে কেউ বিবাগী হয়ে যেত এতদিন। শিকার ধরে মুখের সামনে দিয়েও নাম নেই। না, একদিন সাহস করে শিবমন্দিরের ভেতরে ভেতরে গিয়েই দেখবে। যা হয় হবে।

এহেন দাম্পত্য কলহের মাঝেই কোথা হতে উড়ে এল একটা বাদুর, হেঁটমুণ্ড হয়ে ঝুলে পড়ল পেঁচির পাশেই। বাদুরটাকে দেখে একটু সরে বসল পেঁচি। বাদুরটা আরেকটু সরে এল। পেঁচি আবার সরে গেল। এভাবে কয়েকবার চলার পর ঝেঁঝিয়ে উঠল পেঁচি, “কি রে হাড়হাবাতে, তোর মতলবটা কি বল তো ? যে মুখে খাস সে মুখেই হাগিস, ছি ছি ছি…! সর্ সর্ সর্ ! আমার কাছ হতে সরে যা।”

বাদুরদা আর সরে এল না বটে কিন্তু নির্বিকার ভাবে ঝুলতে লাগল। দেখে বিকট শব্দে হেসে উঠল পেঁচো, সেই হাসির শব্দে উত্তাল হয়ে উঠল গোটা এলাকা। নিশিপাখিরা ক্যাঁ-ক্যাঁ করে চেঁচিয়ে উঠল।
নিশিপাখিদের এমন ডাক শুনে পুঁটিরাম বলল,”এ লক্ষণ বড় খারাপ। আজ আর বের হব না, ওপাড়া হতে মুরগি ধরে এনেছি, ঝোল আর ভাত বসাও তো।”

ময়নার আজ মন ভালো, মিছরি আর পুঁটিরামকে মুড়ি আর নারকোল খণ্ড দিয়ে বলল, “শুরু কর। তেলে বেগুনি ছেড়ে দিয়েছি, এক্ষুনি হয়ে যাবে।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই গরম গরম বেগুনি, লঙ্কার পকোরা আর বাদাম-পাঁপড় ভেজে এনে দিতেই হামলে পড়ল দুজনে। বেগুনিতে কামড় দিতে দিতে মিছরি বলল, “খুব সুস্বাদু হয়েছে বৌদি। আমার মা-ও এরকম ফুলো ফুলো বেগুনি বানায়।”

চমকে উঠল পুঁটিরাম, মিছরির স্মৃতি ফিরেছে তাহলে ! খাওয়া থামিয়ে প্রশ্ন করে, “হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ কোথায় ? কোন গ্রামে মনে পড়ছে ?”

মিছরি একগ্রাস মুড়ি মুখে ভরে চিবোতে থাকে। মুখের মুড়ি শেষ হলে জলের ঘটিটা টেনে নিতে নিতে বলে,”না মনে পড়ছে না। তবে কিসের সঙ্গে কি যেন মেশাতাম। আলফা বিটা গামা….. আর মনে নেই।”

এসব কথার মানে বোঝে না পুঁটিরাম, তবে মনোহর ঠাকুর জানতে পারে। ঠাকুরের সঙ্গে একবার কথা বলতে হবে।

ছয়
আজ বৃহস্পতিবার, সন্ধ্যা হতেই গোটা গ্রামে চরম ব্যস্ততা। গ্রামের ছোটো ছোটো গ্রুপগুলো নিজেদের কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত। সবাই সবাইকে লুকোতে চায়, নিজের গ্রুপের বাইরে আলোচনা করতে চায় না কিছুই।

সন্ধ্যা হতেই পুঁটিরাম, মিছরি আর জগাই এসে জড়ো হয়েছে প্রফেসরের ঘরে। প্রফেসরের দেওয়া অদ্ভুত দেখতে পোষাকগুলো পরে নিচ্ছে একে একে। নিজের গায়ে পরে থাকা পোষাকের দিকে তাকিয়ে পুঁটিরাম বলল, “এসব চটের বস্তা না পরলে হবে না ? এত জায়গায় চুরিতে গেছি এরকম কিছু তো পরিনি ?”

প্রফেসর কিছু বলার আগেই জগাই বলে উঠল, “এ পোষাক না পরলে উপরে উঠে যাবে বাপধন। আলফা বইটা গামা রশ্মি তোমার শরীরটা একদম এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবে।”

আলফা বিটার কথা শুনতেই পুঁটিরামের মনে পড়ে গেল মিছরির কথা। একদিন মুড়ি খেতে খেতে এরকম কথা বলেছিল বটে। পুঁটিরাম বলল, “কি বললে জগাইদাদা, আলপা না কি যেন ? এরকম কথাই তো বলেছিল মিছরি। কি যেন মেশায় ও।”

-“আলফা বিটা গামা মেশায় ?” অবাক হলেন প্রফেসর।
পুঁটিরাম বলল, “হ্যাঁ, ওরকমই তো বলেছিল। কি গো মিছরি ?”

মিছরি নির্বিকার গলায় বলল, “না না, কেমিক্যাল মেশাই। আলফা বিটা গামা বের হয়। ডাকাত। রক্ত। ”
-“আচ্ছা মিছরি, তুমি কি কোনও পারমাণবিক গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করতে ?”

প্রফেসরের প্রশ্নের উত্তরে কিছুক্ষণ নির্বাক থেকে মিছরি বলল, “নিউক্লিয়ার রিসার্চ ইনস্টিটিউট।”

চোখদুটো গোলগোল হয়ে গেল প্রফেসরের। ড্রয়ার হতে একখানা পুরোনো খবরের কাগজ বের করে মিছরির সামনে ধরে বললেন,”চন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, ন্যাশনাল রিসার্চ ফেলো। তুমিই কি সেই লোক ?”

প্রফেসরের কথা শুনেই মাথার ভেতরটায় তীব্র যন্ত্রণা করতে লাগল মিছরির। দু’হাতে কপালটা ধরে বসে পড়ল মেঝেতে। মুখে তীব্র যন্ত্রণার ছবি। আস্তে আস্তে চোখের সামনেটা ঘোলাটে হতে হতে কালো হয়ে এল।

পুঁটিরাম লেগে গেল মিছরির শুশ্রূষায়। আর প্রফেসর বলতে লাগলেন মাসখানেক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার ব্যাপারে। আজ হতে একমাস আগে ‘নিউক্লিয়ার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে’ একদল দুষ্কৃতী হানা দেয়। তারা লুঠপাট চালায়, আর যাবার সময় নিয়ে যায় সিনিয়র সাইনটিস্ট ডঃ চন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তীকে। এই মিছরিই সেই চন্দ্রনাথ। অন্তত খবরের কাগজের ছবি তাই বলে।

মিছরির জ্ঞান ফিরে আসে। এখন সে সবকিছুই মনে করতে পারছে। ডাকাতদের ল্যাবে ঢোকা, রিসার্চারদের সাথে ধস্তাধস্তি ও চন্দ্রনাথকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া।

-“আমাকে নিয়ে গিয়েছিল বন্ধক হিসেবে নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে। এই গ্রামের কাছাকাছি আসতেই আমার মাথায় আঘাত করে ওরা। আর জানি না।” বললেন চন্দ্রনাথ।
চলবে…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *