Sudip Ghoshal

 84 total views

মাটির আদর

সুদীপ ঘোষাল

বিশু আজ আমাদের সকলের শৈশবের বন্ধু। মা, মাটি, মানুষের আদরে মানুষ হয়েছে বিশু। কারণে অকারণে গ্রামের মাটি সে সারা অঙ্গে মেখে নিত। মাটিমাখা কৃষক, খেটে খাওয়া মজুর তার বন্ধু ছিল। ছোটো থেকেই সেবা করত মানুষের। কেউ খেতে না পেলে নিজের টিফিন খাইয়ে দিত অক্লেশে।

বিশু আজ আমাদের তার জীবনের কাহিনী বলছে, বন্যা এসেছে। আমাদের তখন মাটির দোতলা বাড়ি। আমি, বিরাজুল, সামিম সবাই শুনছি।

সে বলছে, কাকিমা রান্না সেরে নিচ্ছেন। বন্যার ঢেউ মাটির দেওয়ালে ধাক্কা মারছে। মাটির দেওয়াল জলের ধাক্কায় পরে গেলো। মা কান্নাকাটি শুরু করলেন। বললেন,কত কষ্ট করে এই বাড়ি হয়েছে। আর হবে না আমার বাড়ি। কাকু বললেন,চলে এসো পাকা বাড়িতে।

বেঁচে থাকলে আবার হবে বাড়ি। আমাদের সবাইকে নিয়ে মা কাকুদের বাড়ি চলে এলেন। দুদিন আমরা অই বাড়িতে ছিলাম। আখের গুড় আর ছোলা ভিজে খেলাম সবাই। গোপালদা গরু মোষ দেখার জন্য নীচে ছিল।

সে বলল, আমি দেখ এখানে বসে আছি। বাবু বলল, গোপাল দা তোমার পাশে শাঁখামুটি সাপ। গোপাল দা বলল,ভয় নেই আমার।ওরাও জলে থাকতে পারছে না। থাকুক কিছু করবে না।

সারারাত সে সাপের সঙ্গেই ছিলো। কিছু ক্ষতি হয় নি। বিপদে সবাই মিলেমিশে থাকে।বললেন,গোপাল দা। তারপর বন্যার জল নেমে গেলে বাবা,গোপালদা দুজনে মিলে পাকা ঘরটার কাদা বালি পরিস্কার করে জিনিসপত্র নিয়ে এলেন। মাটির বাড়িটা পরে গেছে। বড্ড ফাঁকা লাগছে।

পাকা ঘর একটা সেখানেই আমরা সবাই একসাথে বাস করতে লাগলাম। আমরা এখন পাঁচজন। তিন ভাই আর বাবা, মা। কাকিমা দুই বোনকে নিয়ে কাটোয়ায় থাকেন। কাকিমা চাকরি পাওয়ার পর কাটোয়া চলে এলেন যাতায়াতের অসুবিধার জন্য। তারপর আবার প্রকৃতির নিয়মে নতুন বছর এলো।

নতুন বছরে নতুন মন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্পৃহা জেগে ওঠে মনে। তারপর এই ইচ্ছেটা ধরে রাখাই খুব কঠিন কাজ বলে মনে হয়। প্রথম প্রথম কবিতা লিখতে এসে, নতুন কবির পাতার পর পাতা ভরে যায়। কিন্তু যখন কোবিতা, কবিতা হয়ে ধরা দেয় ভাষা যায় ফুরিয়ে। ছমাসে,নমাসে হয়ত একটা কবিতা ধরা দেয়।

এখানেই মহাপুরুষের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য। তাঁরা হাল ছাড়েন না। লেগে থাকেন। আর লেগে থাকলেই হবে। যে কোনো কাজে সফল হওয়া যাবেই। প্রেমে লেগে থাকলেই হবে। পড়াশোনায় তাই। লেখা,জোখা সমস্ত কিছুতেই লেগে থাকলেই,চর্চা করলেই সফলতা পাওয়া যায়। তাই লেগে থাকতে হবে।

বিফলতাগুলো সফলতার এক একটা স্তম্ভ। বাবা এইসব কথা আমাদের বলতেন। বাবা চাষবাস দেখাশোনা কোরতেন আর বড়দা লিলুয়ায় চাকরী করতেন একটা বড় স্টিল কারখানায়। আমি গ্রামের স্কুল থেকে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে হাওড়া নরসিংহ দত্ত কলেজে ভরতি হলাম।

লিলুয়া শহরে যখন ভাড়াটে হিসাবে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতাম চার ভাই, তখন আমরা নিজেরাই রান্নাবান্না করে নিতাম। উনুন ধরিয়ে আঁচ দেওয়া,বাসনমাজা সবকিছু নিজেরাই করতাম। খাবার জল আনতে যেতে হত দু কিলমিটার দূরে। বালতি নামাতে,নামাতে আনতাম খাবার জল।

কোনদিন আমার পালা পরত। ছোটোবেলা থেকেই এখানে কাটিয়েছি মা, বাবার সঙ্গে। তখন ভাল লাগত। আর এখন মা বাবা এখানে নেই। ভাল লাগত না। মনে হত যাই ছুটে মায়ের কোলে। যেতে পারতাম না। রোজগার করতে হবে। বসে বসে খেলে ত হবে না। বড়দা বলতেন,তোর যখন মন হবে বাড়ি চলে যাবি।

মেজদা বলতেন,যা,মায়ের কাছে যা। এখানে তোর ভালো লাগবে না। কিন্তু আমার মনে একটা অপরাধবোধ কাজ করত। বসে বসে খাব। এটা চিন্তা করতেই মন খারাপ হয়ে যেত। তখন গ্রাজুয়েট হয়ে গেছি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র পড়াই।আর ফাঁকা ঘরে আমি একা পড়তাম   বিভূতিভূষণ, ,তারাশঙ্কর,রবীন্দ্রনাথ,মাণিক,শরতচন্দ্র,নিমাই,শীর্ষেন্দু,শঙ্কর ও আরো অনেকের লেখা।মায়ের অভাব, তাদের লেখাই ভুলিয়ে দিতো নিমেষে।কিন্তু অতিরিক্ত নাটক,কবিতা,গল্প পড়ার ফলে আমার চাকরী বাকরী হয় নি। গোড়া,গৌতম,গোবিন্দ,অসীম আসতো বাসায়।

দাদার কাছ থেকে চলে এলাম মায়ের কাছে ছোটো ভাইয়ের হাত ধরে। শিবলুন স্টেশনে নেমে মাটির গন্ধে আমি আত্মহারা হয়ে গেলাম। মাটির স্পর্শ পেলাম। তারপর বাড়ি গিয়ে মা কে দেখে চোখে জল চলে এল। মায়ের চোখেওজল। তারপর সহজভাবে গ্রাম্য পরিবেশে মিশে গেলাম। ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েদের নিয়ে খোলা মাঠে বোসতাম। গল্প শোনাতাম।

এদিকে শুরু করলাম তিন ভাই মিলে গানের ক্লাস। তারপর আমার বিয়ে হোলো কাশীরাম দাসের জম্মস্থান সিঙ্গি গ্রামে। মনে আছে বন্ধুদের পাল্লায় পরে কাটোয়া এনিস সেলুনে ফেসিয়াল করেছিলাম। ফলে বিয়ের ছবিগুলো খুব সুন্দর হয়েছিল। বিয়ের তিন বছরের মধ্যেই পুত্র সন্তান হোলো। ভাই নাম রাখলো সৈকত।

এবার জীবিকার সন্ধানে চলে এলাম কাটোয়া শহরে। সস্তার জায়গা দেখে বাড়ি বানালাম। বেড়া দিয়ে ঘিরলাম জমি। কিছু গাছ লাগালাম। গ্রামের পরিবেশ। এটাই আমার সাদা কালো জীবনে বেশ খাপ খায়। তারপর মরণের সঙ্গে সহবাস। সস্তার সাত অবস্থা। সাপের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হলেও পালাবার পথ বন্ধ। মায়ার শেকল পায়ে জড়িয়ে গেছে। সামনে গঙ্গা নদী।

ভয়ের চোটে আমি স্বপ্নে দেখছি আমি গঙ্গা নদীর জলে ডুবে গেছি। কিছুক্ষণ জলের তলায় পরে থাকলাম।তারপর ফুলে ফেঁপে ভেসে উঠলাম।পেট ফোলা দেখে একটা কাক এসে বসলো আমার উপরে। তারপর খুঁটে খেতে লাগলো পেটের চর্বি। পেট ফুটো হলেই জল ঢুকতে শুরু করলো। আবার আমার দেহ চলে গেলো জলের তলায়। এবার কুমীর, বোয়াল মাছে খেতে লাগলো আমার দেহের মাংস। শেষে কুমীরটা গিলে ফেললো আমার কংকাল শরীর।

কুমীরটা, খাওয়ার পরে সাঁতার কেটে চলে গেলো আনন্দে। আমি দেহ শূন্য হয়ে উড়তে উড়তে আকাশের পথে চলেছি। আমি এখন আমার মৃত দাদু,বাবা,ঠাকুমা সবাইকে দেখতে পাচ্ছি। তারা এক একটা তারা হয়ে জ্বলজ্বল করছে। আমি থমকে গেছি। তাদের কাছে যেতে পারছি না। দাদু এগিয়ে এসে নিজের আলো ছড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। আমি তার সঙ্গে চলতে শুরু করলাম। তাদের মাঝে আমারো জায়গা হোলো।

আমি মাঝে মাঝে গ্রামে যাই। মায়ের কাছে।মাটির কাছে।এবার গ্রামে গিয়ে দেখলাম,গোস্বামি বাড়িতে রাধামাধব এসেছেন।
রাধামাধাব আসলে আমাদের গ্রাম বৃন্দাবন হয়ে উঠত। ঘরে ঘরে হরিনাম হত। আমরা নিমন্ত্রন পেতাম সাতদিন ধরে। গোস্বামি বাড়ির পুজোতলায় রাতে বসত কির্তনের আসর। রাধার উজাড় করা প্রেমের কাহিনি শুনে মা, পিসির চোখে জল বাঁধ মানত না।

বিশু বলে চলেছে,আমার মা মহাভারতের অনেক গল্প বলতেন। আমাদের ছোটোবেলাতে অনেক গল্প শুনে মুখস্ত হয়ে গেছিল। রামায়ণের গল্প সুর করে পড়ে শোনাতেন আমার দাদু। দাদু ভাল গান করতেন একতারা বাজিয়ে। তখনকার দিনে যাত্রা শিল্পে মহিলা পাওয়া কঠিন ছিল। আমার দাদু মহিলা সেজে স্টেজে অভিনয় করতেন। বেশ ছিল ছোটোবেলার দিনগুলো। এখন বয়স বেড়েছে। আবেগ এখন পাগলামি বলে মনে হয়। অথচ এই পাগলামি ছিলো বলেই দাদু এত নামকরা শিল্পী হয়েছিলেন।

বিশুর দেশপ্রেম,মানবপ্রেম দেখে আমরা তার ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। সব জাতির মিলনে সে স্বছন্দ বোধ করত।
তারপর, বিশু সমাজসেবার দল করেছিলো। প্রায় কুড়ি বছর ছিলো মানুষের সেবক ।

বীরভূমের বাড়িতে থাকে সে । একদিন মা বাবাকে প্রণাম করে একদম আদুল গায়ে গামছা জড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে চলে গেলো বক্রেশ্বর নদীতে। ওর সঙ্গে আমিও ছিলাম। দেখলাম অনেক উঁচু লাল টিলা থেকে লাফিয়ে নদীর জলে ঝাঁপ দিলো। তার পরেই বন্ধুরা। তারপর বিশু গান ধরলো,”ও আমার দেশের মাটি,তোমার পরে ঠেকাই মাথা”।

আমি ওর গান শুনে মুগ্ধ।বড় মানবপ্রেমিক এই যুবক আমার সঙ্গেই বড় হয়েছে। আমার চোখে কেন জানি না জল এলো দু ফোঁটা।আমি ডুব দিলাম। নদীর জল আর চোখের জল মিলেমিশে ভালোবাসা তৈরি হলো।হিন্দু মুসলমান পরিবারের যৌথ জীবনের ভালোবাসা তাকে আঁকড়ে ধরেছিলো আজীবন। বিরাজুল, সামিম ছিল তার প্রিয় বন্ধু।

সরকারের সাহায্য নিয়ে সে যৌথ খামার দেখাশোনা করে।

সে এখন গ্রামের বাড়িতে চাষবাসও দেখাশোনা করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *