Sudip Ghoshal

 49 total views

পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া জেলার রহিন বা রোহিন উৎসব।
সুদীপ ঘোষাল
______________________

নারীদের এই দিন বিশেষ কিছু কর্মসূচী থাকে । তারা প্রথমেই সূর্যোদয়ের পূর্বে বসত বাড়ির চারদিকের দেওয়ালে গোবরের ‘লাতা’ (ছোট টুকরো কাপড়ে গোবর দাগ) দিয়ে লক্ষ্মণ রেখার মতো বেষ্টনী দেয় । লোকবিশ্বাস , এর ফলে বাড়িতে পোকা-মাকড় বা সাপ-খোপ বাড়িতে প্রবেশ করতে পারবে না ,কাউকে কামড় বা ছোবল মারতে পারবে না । এরপর তারা গোবর দিয়ে বাড়ির সমস্ত মেঝে , আঙিনা , প্রবেশ দ্বার পরিষ্কার ও শুদ্ধ করে নেয় । তারপর মা লক্ষ্মীর পদচিহ্ন যুক্ত আলপনা আঁকে ।
বাড়ির পুরুষেরা ক্ষেতে মাটি তৈরি করে চারা নিতে এলে মহিলারা সেই চারা সুন্দর করে সাজিয়ে দেয় , গত বছরের ‘রোহিন মাটি’ (উৎসবের দিনে নিষ্ঠা সহকারে আনা ক্ষেতের সাদা মাটি) এনে ছড়িয়ে দেয় । বিশ্বাস , এতে চারার কোন ক্ষতি হয় না । অনেক মহিলা আবার চারা দিতে এবং পুরুষকে সহযোগিতা করতে মাঠেও গিয়ে থাকে । সেখানে চারা দেওয়ার পর নারীরা বলদ বা মহিষের পা ধুয়ে দিয়ে পূজা করে । তারপর মহিলারা মাথায় ঝুড়ি কোদাল নিয়ে বাড়ি ফিরে ।
এরপর বিকেলের দিকে আরম্ভ হয় মহিলাদের আসল কর্মসূচী ‘রোহিন মাটি’ নিয়ে আসার পালা । এই সময় বাড়ির কোন একজন মহিলা স্নান করে , কাপড় পাল্টে , হাতে বাঁশের ঝুঁড়ি বা ‘টকা’ (বাঁশের ছোট পাত্র) নিয়ে , পাড়ার সকলের সঙ্গে একত্রিত হয়ে মাটি আনতে মাঠে যায় । ঝুঁড়িটিকে কু-দৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন্য তারা সিঁদুর দেয় আর এক টুকরো লোহার দণ্ড রেখে দেয় । মাঠে গিয়ে নিষ্ঠা ও ভক্তি সহকারে মাটি তোলে । মাটি নিয়ে আসার সময় মুখ থেকে কথা বলা চলে না।তাদের নিষ্ঠা ভঙ্গ করার জন্য গ্রামের ছেলে-মেয়েদের দ্বারা নানা রঙ্গ-তামাশা , অঙ্গভঙ্গি ও নাচ-গান হয় ।
পুরুলিয়া জেলার রহিন উৎসবে নতুন ধানের চারা রোপণ করা হয়। মাটির দেওয়ালে গোবরের নানারকম নক্সা কাটা হয় সাপের কামড় থেকে রক্ষা পেতে।

জ্যৈষ্ঠ মাসের তেরো তারিখে বীচ পুহ্না বা বীজ বপন উপলক্ষে রহিন উৎসব উদযাপন করা হয়। কৃষকদের বিশ্বাস, রোহিনী নক্ষত্র সেই দিন পৃথিবীর নিকটবর্তী এসে পড়ায় ঐ দিন বীজ বপন করলে শস্য উৎপাদনে কোন বাঁধা থাকে না।

এই দিন ভোর বেলায় মহিলারা গোবর দিয়ে উঠোন নিকিয়ে রাখেন এবং গোবর গোলা জলে লতাপাতা ডুবিয়ে আলপনা আঁকেন। এরপর স্নান সেরে ভিজে কাপড়ে মাঠ থেকে রহিন মাটি এনে ঘরের চারকোণে ও তুলসি মঞ্চে জড়ো করে রাখা হয়। পুরুষেরা রোহিন ফল বা কেলেকড়া সংগ্রহ করে আনেন। যে বাড়িতে আয় বেশি এবং খরচ কম, সেই বাড়ির সদস্যকে দিয়ে বীজ বপন করাতে হয়। এরপর ছোট ছেলে মেয়েরা রঙ কালি মেখে বানর, ভালুক প্রভৃতি জন্তু জানোয়ার সেজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা ও খাবার সংগ্রহ করে আনে।

আর এই কৃষিবর্ষকে ঘিরে নানা নিয়ম,সংস্কার রয়েছে এই মানভূমে। এদিন বাড়ির সামনে গোবরের প্রলেপ লাগান মহিলারা। যাতে কোনও বিষধর কীট–পতঙ্গ ঘরে প্রবেশ করতে না পারে। এছাড়া সবুজ রঙের ‘আষাঢ়া’ নামে এক ধরনের ফলও খান। এই ফল খেলে শরীর পয়জন মুক্ত থাকে বলে বিশ্বাস৷ এইদিন থেকে কৃষিবর্ষের শুরু হয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষজনকে এবার চাষাবাদের কাজে বেশিরভাগ সময় মাঠেঘাটেই থাকতে হবে। ফলে কোনও কীটপতঙ্গ কামড়ালে যাতে তার বিষ শরীরে দানা বাঁধতে না পারে৷ সেক্ষেত্রে আষাঢ় ফল অ্যান্টিবায়োটিকের মত কাজ করে বলে বিশ্বাস এই এলাকার বাসিন্দাদের।
মেঘের ভারমুখ, ঝিরঝিরে বৃষ্টি, দমকা হাওয়া। প্রবল ঘূর্ণিঝড় উম্পুনে পুরুলিয়ার প্রাপ্তি ছিল এটুকুই। তাতে স্বস্তি পেয়েছে সাধারণ মানুষ। ফসল বেঁচেছে কৃষকের। বান্দোয়ানের কৃষক সনাতন সিং, ভূদেব মাহাতো বলেন, ‘টিভিতে উম্পুনের ভয়াবহ ছবি দেখছি। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হইনি, তবু খারাপ লাগছে।’ মাঠে নেমে পড়েছেন সকলে। খেতে রয়েছে তরমুজ, ভেন্ডি, টমেটো, বেগুন, লাউ, কুমড়ো। গাড়ি চললে এখান থেকে সব্জি যাবে কলকাতায়। সব্জির চাহিদা বাড়বে। যদিও এমন প্রাকৃতিক তাণ্ডব থেকে লাভ পুরুলিয়ার কৃষকরা চাননি। জেলার সর্বত্র কৃষকরা বলছেন, উম্পুনের জেরে বৃষ্টি পেয়ে লাঙল দিতে সুবিধা হয়েছে। মানবাজারের কৃষক মতিলাল মাহাতো বলেন, ‘আমন ধানের বীজতলা তৈরির পাশাপাশি এখন ডাঙা জমিতে লাঙল দিতে পারলে বিরিকলাই, অড়হর, মুগ, তিল, বাদাম ইত্যাদি মেঠো ফসল লাগাতে সুবিধা হবে।’

বাংলার আনাচে কানাচে এইরকম কত উৎসব আছে তা জানতে ইচ্ছে করে পাঠকদের।

তথ্যসংগ্রহ – উইকিপিডিয়া ও নানা পত্র পত্রিকা।
সুদীপ ঘোষাল
পূর্ব বর্ধমান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *