Sudip Ghoshal

 31 total views

অন্য গ্রহের কল্পনা ও প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা

সুদীপ ঘোষাল

টেলিভিশনের পর্দায় এমন দৃশ্য আমরা সবাই দেখেছি৷ মহাকাশে নীল মরুদ্যানের মতো শোভা পাচ্ছে পৃথিবী৷

‘‘বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে একমাত্র পৃথিবীতেই কি প্রাণের স্পন্দন রয়েছে? নাকি অন্য কোথাও প্রাণের বিকাশ সম্ভব?”

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গত কয়েক বছরে গবেষণা অনেক বেড়ে গেছে৷জার্মানির পটসডাম শহরের বিজ্ঞানীরা সদ্য আবিষ্কৃত বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু পরীক্ষা করেন৷

দূরের এই জগত প্রাণের বিকাশের জন্য কতটা উপযুক্ত? পৃথিবীর সঙ্গে মিল আছে, এমন গ্রহ খোঁজা কেন এত কঠিন?

গবেষক ভ্যার্নার ফন ব্লো বলেন, ‘‘এক্সট্রা-সোলার গ্রহ খোঁজার সমস্যা হলো, নক্ষত্রের আলো সংলগ্ন গ্রহের আলোকে পুরোপুরি ম্লান করে দেয়৷ রাতের আকাশে শুধু নক্ষত্রগুলি দেখা যায়, তাদের আশেপাশে গ্রহ থাকলেও সেগুলি দেখা যায় না৷”পৃথিবীর মতো যখন তারা তাদের সূর্যের আলোকে ঢেকে ফেলে৷ তাই মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা কেপলার স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠিয়েছিলেন৷ কেপলার স্যাটেলাইটে দেড় মিটার বড় টেলিস্কোপ ছিল৷ এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল প্রাণের বিকাশের উপযুক্ত গ্রহের সন্ধান করা৷ কোনো গ্রহ তার সূর্যের পাশ দিয়ে যাবার সময় আলো ঢাকা পড়ে যায়৷

অর্থাৎ নক্ষত্রের আলোয় সামান্য তারতম্য ঘটলেই স্যাটেলাইটকে তা টের পেতে হবে৷ তখনই গ্রহ আবিষ্কার করা যায়৷ যেমন আমাদের এই পৃথিবী সূর্য প্রদক্ষিণ করার সময় যে ছায়া সৃষ্টি করে, তার মাত্রা সূর্যের আলোর দশ হাজার গুণেরও কম৷ আরেকটি সমস্যা হলো, নক্ষত্রের উপর গ্রহের ছায়া পড়ার ঘটনা খুবই বিরল।তাই মহাকাশের একটা বড় অংশের উপর নজর রেখেছিল৷ সিগনাস নক্ষত্রপুঞ্জের আশেপাশে প্রায় দেড় লক্ষ নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল টেলিস্কোপ৷

স্যাটেলাইটকে এমন অবস্থান বজায় রাখতে হয়েছে, যাতে প্রত্যেকটি নক্ষত্র ডিটেক্টরে সরে না যায়৷ একমাত্র এভাবেই কেপলার গ্রহের ছায়ার কারণে আলোর সামান্য তারতম্য টের পেয়েছে৷ দূরের এই সব গ্রহে প্রাণের স্পন্দন সম্ভব কিনা, তা দেখার কাজ গবেষকদের৷ এটা অনেকটা নির্ভর করছে নক্ষত্র থেকে গ্রহের দূরত্বের উপর৷ পৃথিবীর মতো সেই গ্রহেও তরলকে তরল থাকতে থাকতে হবে, বাষ্প বা বরফ হয়ে গেলে চলবে না৷

ভ্যার্নার ফন ব্লো বলেন, ‘‘তরল পানি বা জল প্রাণের স্পন্দনের পূর্বশর্ত, যেমনটা পৃথিবীতে ঘটেছিল৷ অন্য কোনো গ্রহের তাপমাত্রা যতি আনুমানিক শূন্য থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঘোরাফেরা করে, তখন সেখানে তরল জল থাকা সম্ভব৷ এমন পরিবেশে প্রাণের বিকাশ ঘটা সম্ভব৷”কিন্তু কেপলার আর কারণ গত বছরের আগস্ট মাসে স্যাটেলাইটের দুটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে গেছে৷

চোখ ঘোরানোর ক্ষমতা ছাড়া ফোকাস করা সম্ভব নয়৷ অথচ ঠিক তার আগেই অভিযানের সময়কাল আরও ৩ বছর বাড়ানো হয়েছিল৷ কেপলার মোট ১৩৫টি নতুন গ্রহ আবিষ্কার করেছে৷ সবচেয়ে ছোট গ্রহটি আমাদের চাঁদের চেয়ে সামান্য বড়৷ সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার ছিল প্রায় আমাদের মতোই একটি সৌরজগত৷ সেই নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে পৃথিবীর মতো দুটি গ্রহ৷ এমন আদর্শ ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ আর পাওয়া যায়নি৷

তবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এমন আরও গ্রহের অস্তিত্ব রয়েছে বলে অনুমান করা হয়৷ ভ্যার্নার ফন ব্লো বলেন, ‘‘কেপলারের আবিষ্কার থেকে মোটামুটি অনুমান করা যায়, মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে সম্ভবত ৫,০০০ কোটি গ্রহ রয়েছে৷ তার মধ্যে ৫০ কোটি গ্রহে প্রাণের বিকাশ সম্ভব৷”তবে এই সব গ্রহের সঙ্গে পৃথিবীর মিল কতটা বা সেখানে প্রাণ আছে কিনা, ভবিষ্যতের অভিযানগুলিতে তা জানা আপনার কি প্রায়ই মনে হয় না যে পৃথিবীর বাইরে কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে? অন্য কোনো গ্রহে মানুষের মতো বা ভিন্ন ধরনের প্রাণীর উপস্থিতি সত্যিই আছে?

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (নাসা) বিজ্ঞানীরা আপনার সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন।যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত নাসার সদর দপ্তরে গবেষকেরা পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অনুসন্ধানে তাঁদের মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে সম্প্রতি বিস্তারিত জানিয়েছেন।

নাসার একাধিক দূরবীক্ষণযন্ত্র (স্পেস টেলিস্কোপ) এ লক্ষ্যে আগে থেকেই মহাকাশে স্থাপন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব টেলিস্কোপের সংখ্যা ও তৎপরতা আরও বাড়ানো হবে।যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) অধ্যাপক ও জ্যোতির্বিদ সারা সিগার বলেন, অদূর ভবিষ্যতে মানুষ কোনো একটি তারকা দেখিয়ে বলতে পারবে যে সেটি পৃথিবীর মতোই। প্রতিটি ছায়াপথে পৃথিবীর সঙ্গে তুলনীয় বৈশিষ্ট্যের অন্তত একটি গ্রহ থাকার সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা।

পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের সন্ধানে নাসার মহাপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিশেষ কৃত্রিম উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) উৎক্ষেপণ ও স্পেস টেলিস্কোপ স্থাপনের মতো উদ্যোগ। ২০১৭ সালে সৌরজগতের বাইরের নক্ষত্র পর্যবেক্ষণে উৎক্ষেপণ করা হবে কৃত্রিম উপগ্রহ ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভেয়িং স্যাটেলাইট (টিইএসএস)। পরের বছরই মহাকাশে স্থাপন করা হবে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ।

আর পরবর্তী এক দশকের মধ্যে ওয়াইড ফিল্ড ইনফ্রারেড সার্ভে টেলিস্কোপ-অ্যাস্ট্রোফিজিকস ফোকাসড টেলিস্কোপ অ্যাসেট (ডব্লিউএফআইআরএসটি-এএফটিএ) পাঠানোর প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

নাসার ওই স্পেস টেলিস্কোপগুলো সৌরজগতের বাইরের গ্রহের খোঁজ করবে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত জানাতে পারবে। ফলে সেসব গ্রহের জলবায়ু ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানা সম্ভব হবে।

নাসার বিজ্ঞান অভিযান অধিদপ্তরের সহযোগী পরিচালক ও মহাকাশচারী জন গ্রান্সফেল্ড বলেন, গ্রহ খুঁজে পেতে নাসা যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, সেগুলো বাস্তবের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ও অন্যান্য প্রযুক্তি নিয়ে এখনই কাজ চলছে। তাই বিষয়টিকে স্বপ্ন বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
২০০৯ সালে কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ স্থাপনের পর থেকেই সৌরজগতের বাইরের গ্রহ-নক্ষত্র সম্পর্কে মানুষ নতুন অনেক কিছু জানতে পেরেছে।

সৌরজগতের বাইরে অন্তত পাঁচ হাজার গ্রহ রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে এক হাজার ৭০০ গ্রহের অস্তিত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে।কেপলার স্পেস টেলিস্কোপই প্রথম পৃথিবীসদৃশ অন্য গ্রহের খোঁজ দিয়েছে।ওই গ্রহে তরল পানি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে অবস্থিত স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইনস্টিটিউটের পরিচালক ম্যাট মাউনটেইন বলেন, ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেলে সেটি হবে সত্যিই চমকপ্রদ ব্যাপার। সেই কাঙ্ক্ষিত আবিষ্কারের মুহূর্তে পৃথিবী ও মানবজাতি জেগে উঠবে। মহাবিশ্বে পৃথিবীর একাকিত্বের অবসানও ঘটবে তখন। বায়ুমণ্ডল থেকে পৃষ্ঠে অবতরণে এর ৭ মিনিট সময় লেগেছে। লাল মাটির গ্রহে’ পা রেখেই ইনসাইট মিশনের এ রোবটটি ছবি ও তথ্য পাঠানো শুরু করেছে, জানিয়েছে বিবিসি।

কম্পনের তথ্য ও তাপমাত্রা থেকে মঙ্গলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো বিষয়ে ধারণা নিতেই এ অভিযান চালাচ্ছে নাসা। মার্কিন এ মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটি জানায়, গ্রিনিচ মান সময় সোমবার রাত ৭টা ৫৩ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১টা ৫৩ মিনিটে) ইনসাইটের এ রোবটটি মঙ্গলে নামে। অবতরণের পরপরই মিশনটির নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ক্যালিফোর্নিয়ার জেট প্রোপালশান ল্যাবরেটরির (জেপিএল) বিজ্ঞানীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন।

নাসার প্রধান প্রশাসক জেমস ব্রিডেনস্টাইন ইনসাইটের সফল ‘ল্যান্ডিংয়ের’ এ দিনটিকে ‘অভূতপূর্ব’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন। ফোনে বিজ্ঞানীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ডট্রাম্প ওরোবটটি এখন মঙ্গলের বিস্তৃত, সমতল একটি অঞ্চলে অবস্থান করছে; নিরক্ষরেখার কাছের ওই এলাকাটিকে ‘এলিসিয়াম প্ল্যানেসিয়া’ নামে ডাকা হচ্ছে বলে বিবিসি জানিয়েছে।

মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময়ও এর গতি ছিল তীব্র বেগে ছুটে যাওয়া বুলেটের চেয়ে বেশি। চ্যালেঞ্জটা ছিল এরপরই- গতি কমিয়ে মঙ্গলপৃষ্ঠে নিরাপদে অবতরণের।একটি তাপনিরোধক যন্ত্র, প্যারাসুট আর রকেটের সমন্বয়ে মিনিট সাতেকের মধ্যেই সেই চ্যালেঞ্জ উৎরে যায় ইনসাইট। নাসা জানিয়েছে, তারা রোবটে থাকা ফরাসী-ব্রিটিশ সিসমোমিটার দিয়ে মঙ্গলের কম্পনের তথ্য জানতে চায়। এর মাধ্যমে লাল গ্রহটির কেন্দ্র সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

জানা যাবে, মঙ্গলের ভূ-অভ্যন্তরে থাকা বস্তুর কাঠামো সম্পর্কেও।গ্রহটি নিজের অক্ষের চারপাশে কীভাবে কম্পিত হয় তা জানতে ইনসাইটের রোবটটিতে রাখা হয়েছে রেডিও ট্রান্সমিশন সিস্টেমও।মঙ্গল এখন কতখানি সক্রিয় তা বুঝতে লাল এ গ্রহের মাটিও খুঁড়তে চায় নাসা। সে কারণেই রোবটের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ৫ মিটার পর্যন্ত খননে পারদর্শী এমন যন্ত্রও।

আপনি যদি একটি সাধারণ ডিম ও রান্না করা ডিম নেন এবং একসঙ্গে ঘোরান, তাহলে তাদের কম্পনে ভিন্নতা দেখতে পাবেন। এর কারণ হচ্ছে ডিমের ভেতর থাকা তরল পদার্থের অবস্থান। আজ পর্যন্ত আমরা জানি না, মঙ্গলের কেন্দ্র কী তরল, না কঠিন কিছু দিয়ে তৈরি। জানিনা এটি কত বড়। ইনসাইট আমাদের এসব তথ্য জানাবে,” বলেছেন নাসার ডেপুটি প্রজেক্ট সায়েন্টিস্ট সুজানে স্ম্রেকার।

তথ্যসূত্র -ইন্টারনেট ও বিভিন্ন গ্রন্থ,
সুদীপ ঘোষাল
নন্দনপাড়া খাজুরডিহি
কাটোয়া
পূর্ববর্ধমান

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *