Sumana Chakraborty

 189 total views

শিরোনাম- মেঘের দেশে (পর্ব ৬)

সুমনা চক্রবর্তী

মেঘের দেশে (পর্ব -৬ )
পেদং খুব শান্ত এলাকা। পথ ঘাট খুব পরিষ্কার। হাসপাতালের সামনে বসার জায়গায় আবিরা বসল। মঙ্গল বাচ্চাটিকে নিয়ে ভেতরে গেছে। ওরা যখন ভেতরে ঢুকল তখন কিন্তু এখানে অনেক লোক ছিল। সবাই সব দেখল, জানল অথচ কেউ ভেতরে গেল না। ওদের কথায় বেশি ভিড় করলে হাসপাতালের পরিবেশ খারাপ হতে পারে। তার ফলে ডাক্তার, নার্স কাজ করতে পারবে না। এই সাধারণ ধারণাটুকুও যাদের মধ্যে আছে, তারা একদিন না একদিন উন্নতি করবেই। আবিরার অবাক লাগে এই ভেবে যে, এই জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে যারা আসে তারা সবাই কেন নিজেদের পাল্টাতে পারে না। এই যে এরা নিয়ম মেনে চলে, তারও কি সঠিক মূল্য এরা পায়? সারাজীবন কষ্ট করে উপার্জন করে পরিবার পরিজনের মুখে অন্ন তুলে দেয়। কখনও কখনও পুরো পরিবারই অসম্ভব কষ্ট করে। তাও এরা হার মানে না। মঙ্গলকে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে আবিরা উঠে পড়ল। জোরেই বলল, “ ওরা এলো না?”
মঙ্গল গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে বলল, “ টাইম লাগবে। ও আমার ছেলেরা একটু পরেই চলে আসবে। খবর দিয়ে দিয়েছি”।
আবিরা বারবার পিছনে দেখছিল। মঙ্গল হেসে বলল, “ আপনি বসুন ম্যাদামজি। দেরী হয়ে যাচ্ছে। এবার কোথায় যাবেন বলুন?”
আবিরা কিছু না ভেবেই বলল, “ চলো কোনও ভালো জায়গায়”।
মঙ্গল নিজে খুব সরল মনের। সহজেই সবকিছু মানিয়ে নিতে পারে। আনন্দ হলে যেমন শিশুর মতো লাফিয়ে ওঠে আবার কষ্ট হলেও কেঁদে ফেলে। আবিরা কিন্তু সেরকম নয়। তার মনে এখনও বাচ্চাটির জন্য চিন্তা হয়েই চলেছে। হয়তো সে ভালো হয়ে যাবে তবু আবিরার চোখ থেকে ঐ দৃশ্য সরছে না। অন্য সময় হলে সে মঙ্গলের সাথে অনেক গল্প করত কিন্তু এখন পারছে না। আসলে এদের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে সে পড়েনি বলেই বাস্তব জ্ঞান হয়নি।
মঙ্গল একটা জায়গায় গাড়ি থামিয়ে বলল, “ আসুন ম্যাদামজি এখান থেকে ভিউ খুব সুন্দর হবে”।
আবিরা গাড়ি থেকে নেমে সামনে এগিয়ে গেল। সত্যি জায়গাটা ভালো। আশেপাশে ঘরবাড়িও খুব কম। একটা গেস্ট হাউস আছে, তবে কোনও গেস্ট নেই। মালিক উৎসুক হয়ে তাকে একবার দেখল। তারপর মঙ্গলের দিকে চোখ যেতেই ম্লানমুখে ঘরের ভেতর চলে গেল।
আবিরা চারদিক দেখে আবার গাড়িতে উঠে বসল। তার মনটা চঞ্চল হয়ে আছে। এত সুন্দর পরিবেশও তাকে বেঁধে রাখতে পারছে না।
মঙ্গল গাড়িতে উঠে বলল, “ কুছ খাওগে ম্যাদামজি? চলিয়ে আপ কো হাম এক জাগা পর লে চলে”।
আবিরা উত্তর দিল না। ঘুরবে বলেই তো এসেছে। যেখানে খুশি নিয়ে চলুক, সে যাবে।
মঙ্গল আবার সহজভাবে কথা বলতে শুরু করেছে। “ ইস ইচ্ছেগাও মে হার কোয়ই জান্তা হ্যায় কে আনামিকা দিদি মেরা বহিন”।
এই কথা শুনে আবিরা বলল, “ তবে যে বললে তোমরা দুই ভাই, কোনও বোন নেই?”
মঙ্গল কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, “ এইখানে আছে সব। হাম, আপ ক্যা করে?”
আবিরার এমনিতেই কিছু ভালো লাগছিল না। তার ওপর মঙ্গলের হেঁয়ালি তার সহ্য হল না। কড়া গলায় সে বলল, “ কি হয়েছে বল তো? তখন থেকে ঘুরিয়ে কথা বলছ। ঠিক করে বলবে কি?”
মঙ্গল একবার পিছনে তাকিয়ে বলল, “ আরে নিজের বহিন না। আসতে যেতে আলাপ হয়ে গেছে। বেচারির ডিভোর্স হয়ে গেছে। এখন একটা গেস্ট হাউস চালায়। ওখানেই নিয়ে যাবো”।
আবিরা এতক্ষণে বুঝল যে কেন এত কথা মঙ্গল বলছিল। আবিরা বলল, “ তাই চলো, খিদে পেয়েছে খুব”।
গাড়িটা একটা সুন্দর সাজানো বাড়ির সামনে থামল। ওরা গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেল। কিন্তু বাড়ির সামনে দিয়ে না ঢুকে ডান পাশের ঢাল বেয়ে নেমে গেল। ভেতর থেকে আবিরার থেকে কয়েকবছরের বড় একজন মহিলা হাসিমুখে বেরিয়ে এলো।
মঙ্গল ওকে খাওয়ার কথা বলতেই মহিলা ওদের ঘরের ভেতর নিয়ে গেল। ঘর বলতে রান্নাঘর আর তার সাথে খাওয়ার ঘর। টেবিলে বসতেই মঙ্গল পরিচয় করিয়ে দিল ওর আনামিকা দিদির সাথে। সেই মহিলা হাসিমুখে চাপাটি আর ডিম ভুজি দিয়েই চা করতে চলে গেল। বুভুক্ষুর মতো চাপাটি শেষ করে আবিরা বসেই রইল। তার আর উঠতে ইচ্ছে করল না। মাঝে মাঝে এইরকম অজানা, অচেনা মানুষের কাছে থাকতে ভালোই লাগে। মনে হল, এখানে আজ থেকে গেলে আনামিকা দিদির সাথে বেশ গল্প করা যাবে। ওর জীবনের কথাও শোনা যাবে।
চা খাওয়ার পর আবিরা যখন টাকা দিতে গেল তখন অমায়িক হেসে আনামিকা দিদি বলল, “ জো আপ কো ঠিক লাগে উও দিজিয়ে”।
আবিরা বোকার মতো চেয়ে রইল। এখানেও তাকে সাহায্য করল মঙ্গল। সে হেসে বলল, “ মুঝে দে দিজিয়েগা। আব চলতে হ্যায় দিদি । আজ উপর মিটিং হ্যায়। থোরা জলদি ভি হ্যায়”।
আবিরা গাড়িতে উঠে বসে দেখল এক সব হারানো মন হাসিমুখে তাদের বিদায় জানাচ্ছে। সত্যি, এরা কত সহজে জীবনের ওঠাপড়া মানিয়ে নিতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *