Sumana Chakraborty

 184 total views

বিভাগ – গল্প (ধারাবাহিক)
শিরোনাম- মেঘের দেশে (পর্ব ৭)
সুমনা চক্রবর্তী
মেঘের দেশে (পর্ব – ৭)
জীবনে এমন অনেক কিছুই ঘটে যার খোঁজ আমরা রাখি না। সে ভালো খাওয়া হতে পারে, ভালো কিছু শোনা হতে পারে, ভালো কিছু দেখা বা ভালো কিছু পাওয়াও হতে পারে। আমরা শুধুই লাভ লোকসানের খবর করি। আর লাভ লোকসান দেখতে গিয়ে নিজেদের কারও কাছ থেকে আঘাতও নিতে পারি না। কিন্তু এরা নিজেদের মনটাকে কঠিন বর্ম দিয়ে ঘিরে রেখেছে। আমরা তো নিজেদের মনের খবরই রাখা হয় না। কি যে এক গোলকধাঁধায় ঘোরা তাও জানা হয় না। এটাই ভাবছিল আবিরা যে, এখানে না এলে চোখ শুধু না মনও সার্থক হতো না। এখানকার নির্মল বাতাসের মতোই স্বচ্ছ মানুষের মন। এরা যেমন কাউকে ঠকাতে পারে না তেমন ঝুলকালি, ময়লা সব মনের বাইরেই থাকে, ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।
আনামিকা দিদির বাড়ি থেকে বেরিয়ে সব থেকে খুশি ছিল মঙ্গল। ও বোধহয় দিনে একবার ঐ বাড়ির সামনে দিয়ে গাড়ি নিয়ে আসা যাওয়া করে। আর প্রতিবারই দিদির সাথে ও দেখা করে। কোনও কিছু পাওয়ার আশায় নয়। শুধু দিদি ভালো আছে কি না, তার কোনও সমস্যা হল কি না এসব জানতে কত দূর থেকে সে এই রাস্তায় ছুটে আসে। আবিরার মনটা ভরে যায় এই চিত্র থেকে। সে তার বাবার কথা, বাড়ির কথা সব ভুলে যায়। পরিবার থাকা বা না থাকায় কিছু এসে যায় না। নতুন করে অজানা পরিবারের সাথে যুক্ত হতে পারে কজন? তবে হ্যাঁ, অবশ্যই সেটা নিঃস্বার্থ সম্পর্ক। তা না হলে সবই যে গোলকধাঁধায় ঢুকে যাবে।
আবিরা নিজের থেকেই জানতে চাইল, “ এখন কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
মঙ্গল হেসে বলল, “ জালসা বাংলো”।
আবিরা একটু ভেবে বলল, “ এই সরকারি বাংলোটা তো বন্ধ এখন। তাছাড়া শুনেছি ভূতের উপদ্রব আছে”।
মঙ্গল কথাটা শুনে শব্দ করে হেসে বলল, “ আপ ইয়ে সব বিসুয়াস করতে হ্যায়? আরে এখানে সিঙ্কোনা প্ল্যান্টেসানের কাজ নিয়ে খুব ঝামেলা হচ্ছিল। তাই সারকার সব বন্ধ করে দিয়েছে। ভূত বাংলা সাচ মে নেহি হ্যায়”।
আবিরা গম্ভীর হয়ে বলল, “ তুমি বাংলোর ভেতরে থেকেছ কখনও?”
মঙ্গল কথাটা শুনে চুপ করে গেল। শুকনো মুখে বলল, “ হাম তো সিধাসাধা আদমি ম্যাদামজি, জালসা মে হামারা কেয়া কাম? ফির গাড়ি ভি তো চালানা হ্যায়। বহুত সারা কাম ভি তো হ্যায়। ফুরসাত মিলে তো আ জাউঙ্গা”।
মঙ্গলের উত্তর আবিরাকে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিল। ওর বয়স কতই বা তিরিশ হবে। আবিরার থেকে ছোট। এই বয়সেও ওর কাছে সময় নেই। শুধু দৌড়ে যাচ্ছে নিজের গ্রামকে, এই পাহাড়ের মানুষকে, ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে ভালো রাখার তাড়নায়। ওর মুখে আবিরা অনেকবার শুনেছে ওদের পরিকল্পনার কথা। শুনে মনে হয়েছে বড় ব্যবসায়ীর মেয়ে হয়েও তার মনে এমন সাজানো পরিকল্পনা আসবে না। আসলে জন্মের পর থেকেই আবিরাদের মতো পরিবার সবকিছুর জোগান পেয়ে গেছে। অভাব বোধ সেই অর্থে হয়নি। আবিরা অবশ্য যত বড় হয়েছে, বাইরের জগতের সাথে মিশেছে, তখনই সে অভাবটা চিনতে শিখেছে। এখন তো সে প্রকৃতির সাথে নিজেকে একাত্ম করে নিয়েছে। এবার মরণও হবে তার এই প্রকৃতির বুকে। এটা ভেবেই তার শান্তি। মঙ্গলরা কাজের মধ্যে শান্তি খোঁজে, তার বাবার মতো লোকেরা পয়সায় আর সে এই পৃথিবীর এক কোণে। ভাবতে ভাবতে কখন সে হারিয়ে ফেলেছিল নিজেকে।

জলসা বাংলোর গেটে পৌঁছে তারা হাঁটতে শুরু করল। মঙ্গল অতি উৎসাহের সাথে সিঙ্কোনা গাছের ডাল আর পাতা ছিঁড়ে আবিরার হাতে দিতে থাকল। বেশ খানিকটা চরাই বেয়ে তারা যখন জলসা বাংলোর সামনে এসে দাঁড়াল, তখন বেলা গড়িয়ে এসেছে। পাহাড়ে সন্ধ্যে নামে ঝুপ করে। আর দেরী করা যাবে না। আর মঙ্গলের প্রতি আবিরার কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে। ছেলেটা সেই কত সকালে বেরিয়েছে। আবার কি সব মিটিং করবে। বাড়ি ফিরতে ওর অনেক রাত হয়ে যাবে। ওর ছোট্ট মেয়েটা বাবার কথা ভাবতে ভাবতে হয়তো ঘুমিয়েই পড়বে। আবিরা তাই মঙ্গলকে বলল, “ আজ থাক মঙ্গল, ফিরে চলো”।
মঙ্গল চট করে বলল, “ আরে, আপনার তো কালই এখানে লাস্ট তাই না? কিন্তু যাবেন কোথায়? শিলিগুড়ি তো নামতে পারবেন না। আর তামাংজির ওখানেও তো কাল থেকে নয়া বুকিং হবে। কি করবেন?”
আবিরা কিন্তু বিচলিত হল না। সহজ গলায় বলল, “ কিছু একটা হয়ে যাবে। এখন চলো তো। তোমার দেরী হয়ে যাচ্ছে”।
মঙ্গল অবাক হয়ে দেখল আবিরাকে। কেউ আবার ড্রাইভারের সময় নিয়ে মাথা ঘামায় নাকি?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *