Sumit Modak

 108 total views

রাঢ়ভূমির জমিদার লিখলেন দেহাতি প্রজাদের কথা

––
সুমিত মোদক
হাঁসুলী বাঁকের উপকথা , গণদেবতা , সপ্তপদী , চাপাডাঙার বউ , ডাকহরকরা  – নাম গুলো শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা মুখ । রুক্ষ-শুস্ক শক্ত চোয়াল এক জমিদারের মুখ । জনজাতি গোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখা এক মুখ । সে মুখ অন্য কারো নয় । মুখটা সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের । ছবিতে দেখা মুখটা জীবন্ত হয়ে ওঠে । যখন তাঁর লেখাগুলোর পাতা উল্টাতে হয় দেখা মেলে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি । এক এক করে দেখিয়ে দেন বীরভূমের লালমাটি , কাঁকড় ,  বালি , জনপদ , দেহাতি মানুষজন , তাদের জীবন-জীবানাচার , প্রেম-যৌনতা ,  নবীন-প্রবীণ , আদিম বিশ্বাস , সরলতা … বাঁশবাগানের অন্ধকারে ডুবে থাকা অন্ধকার সমাজ । একের পর এক যেন হাত ধরে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দেয় স্থান-কাল-পাত্র । হারিয়ে যেতে হয় রাঢ়ভূমির জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে । বীরভূমের লাভপুরের জমিদার হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক পুত্র ও এক কন্যা রেখে প্রথম স্ত্রী মারা যান
। পরবর্তীকালে পুত্রটিও মারা যায় । তাহলে জমিদারি রক্ষা করবে কে ! বংশ রক্ষা করবে কে ! এদিকে যে দ্বিতীয় স্ত্রী প্রভাবতী দেবীর গর্ভে কোন সন্তান এলোনা । জমিদার ভেবে পান না শেষ পর্যন্ত কি হবে ! ঠিক এ সময়ে এসে হাজির হন এক সন্ন্যাসী । তাঁর কথা মতো গ্রামের বাইরে আম বাগানে তারাদেবীর পূজা করেন ।শরৎকালের দেবীপক্ষে চতুর্দশী দিনে । এ পূজা পত্তনের দু’বছর পর জন্ম নিল এক পুত্র । জমিদারের বিশ্বাস , যেহেতু সে তারাদেবীর আশীর্বাদে জন্মগ্রহণ করেছে তাই তার নাম রাখা হয়েছিল তারাশঙ্কর । পরে আরেক পুত্র-কন্যা জন্মগ্রহণ করে । তারাশঙ্করের বয়স যখন পাঁচ বছর তখন জমিদার কয়েক দিনের মেনিনজাইটিস রোগ মারা যান । জমিদারের বয়স তখন মাত্র একচল্লিশ বছর । নাবালক তারাশঙ্কর হয়ে যান পিতৃহারা । অসহায় হয়ে পড়েন প্রভাবতী দেবী । একদিকে অল্প পরিসরে জমিদারি , তার উপর লেগে থাকে মামলা-মোকদ্দমা । এমনকি কিছু গজিয়ে ওঠা ধনী সমাজের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে ছিল জমিদারির উপর । জমিদারের বিধবা তরুণী বধূ ও চার শিশুর সম্পত্তি কিভাবে রক্ষা করবেন । ঠিক করে উঠতে পারছিলেন না । ঠিক করলেন চার শিশুকে নিয়ে পাটনায় বাপের বাড়ি চলে যাবেন । ঠিক তখনই বাদ সাধলেন তারাশংকরের বিধবা পিসিমা শৈলজাদেবী । কলেরায় স্বামী পুত্র হারিয়ে এক সময় চলে এসেছিল লাভপুরে ।তিনি ভাবলেন এরা যদি পাটনায় চলে যায় তাহলে জমিদারি রক্ষা করবে কে । তাই তিনি নিজে হাতে জমিদার পরিবারের দায়িত্ব নেন । ব্যাক্তিত্ব দিয়ে , বুদ্ধি দিয়ে দায়িত্ব পালন করেন ।
কৈশোরে বাবার অভাব অনেকটা মিটিয়ে দিয়েছিলেন পিসিমা । তাঁর আদর-স্নেহে বড় হয়ে উঠেছিলেন ।  সবসময় থাকতেন কোলের কাছে । কিন্তু যখন পিসিমা গঙ্গাস্নানে গেলে তখন তাঁকে রাতে ঘুমাতে যেতে হত মার কাছে । ঠাঁই নাড়া হওয়াতে ঠিকমতো ঘুম আসত না । তখন মা শোনাতেন মহাপুরুষের জীবনকথা । আদর্শের কথা । সে কথা শুনতে শুনতে কৈশোর মনের বড় মনের মানুষ হওয়ার স্বপ্ন লালিত হতে থাকে । লেখাপড়া শুরু করেন গ্রামের স্কুলে ।মেট্রিকুলেশন পাশও  সেখানে । তার ফলে গ্রামে আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের মত বড় হয়ে ওঠা ।গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশার ফলে অভিজ্ঞতা লাভ করেন গ্রামের দেহাতি মানুষের রোজনামচা । তারপর চলে আসেন শহরে ।বর্তমানে আশুতোষ কলেজে পড়তেন । সেই সময়কার উত্তাল রাজনৈতিক  আদর্শ থেকে দূরে থাকতে পারেনি । প্রথম বর্ষে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হন । সেই সময় মহামারী আকার ধারণ করে গোটা শহর জুড়ে । ফিরে এলেন গ্রামে । সে সময় তিনি আকৃষ্ট হন গ্রামীণ সংস্কৃতি , লোক সংস্কৃতির প্রতি । নাট্যদলের যোগ দেন । নাটক রচনা ও অভিনয় শুরু করেন । পাশাপাশি শুরু করেন সমাজসেবা মূলক কাজ । ছুটে যেতেন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে । তার ফলে তাদের জমিদারের সঙ্গে গড়ে ওঠে নিবিড় সম্পর্ক । সুখ দুঃখের সঙ্গী । আপনজন ।বীরভূমের অনগ্রসর সম্প্রদায় তথা সাঁওতাল , কাহার , বাউল , বেদে , সাধু-সন্ন্যাসী , ডোম প্রভৃতি অন্ত্যজ শ্রেণী মানুষদের সঙ্গে । একের পর এক শুরু হলো তাদের নিয়ে লেখা । এত ঘনিষ্ঠ ভাবে তাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন যে কে জমিদার কে প্রজা তা আলাদা  করে দেখা যায়নি । সেটা অন্যান্য জমিদারদের আলোচনার বিষয় হলেও তারা তারাশঙ্করের কাছে  হয়ে উঠল হাতিয়ার ।  জমিদার ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন লেখক । লেখা প্রকাশের জন্য চলে এলেন শহর কলকাতায় । পুরো পরিবারটিকে নিয়ে । একের পর এক প্রকাশ পেতে থাকে বিখ্যাত উপন্যাস গুলো । শহরে বসে  লিখলেও তিনি উপাদান খুঁজে নিতে  , এমনকি সঠিকভাবে চরিত্রগুলো ও তাদের জীবন-জীবনাচার গুলো কে ফুটিয়ে তুলতে প্রায় সময় চলে আসতেন গ্রামে । জমিদারের সঙ্গে লালমাটির পথে কিংবা বণিক মাতুয়ার  চায়ের দোকানে । তাদের প্রিয় জমিদার তথা কাছের মানুষকে পেয়ে উজাড় করে দিত বুকে জমে থাকা সকল কথা । মূলত নিজের প্রজাদের সুখ-দুঃখ , জীবনাচার , বিশ্বাস , দ্বন্দ্ব গেঁথে গিয়েছেন একের পর এক উপন্যাসে । প্রতিটি চরিত্র তাঁর কাছের মানুষের । সে  কারণে , কোথাও তাঁকে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয় নি । স্থান-কাল-পাত্র প্রতিটি তার চেনাজানা । কাছের জন । আপনজন । নিজের গ্রামের ছবি একের পর এক এঁকে গেছেন সারা জীবন ধরে । আর পেয়েছেন অন্তজ শ্রেণীর মানুষের ভালোবাসা । থেকে গেছে তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি । রাঢ়ভূমি । লাল মাটির পথ । রুক্ষ-শুষ্ক দেহাতি মানুষজন । তাদের জীবনাচার । সে কারণে আজও তার প্রিয় পাঠক পাঠকবর্গ যদি বীরভূমের লাভপুর কিংবা আশেপাশে এলাকায় ঘোরেন তাহলে আজও খুজে নিতে পারবেন উপন্যাসে স্থানগুলি ।  কত জীবন্ত । প্রাণবন্ত  । উপন্যাস গুলো কেবল সম্পূর্ণ উপন্যাস নয় , এক একটা উপন্যাস একটা আঞ্চলিক ইতিহাস । সেই আঞ্চলিক ইতিহাস প্রমাণ করে গ্রামবাংলার কথা হয়ে থাকতে পারে কালজয়ী ।  শাশ্বত ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *