Sutapa Banerjee(Roy)

 8 total views

সাপ্তাহিক গল্প সম্মাননা
শিরোনাম-দুয়ার
কলমে-সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)
তারিখ-৩০/৭/২১

“কেউ আমায় একটু ধরে উঠিয়ে দে না”-পাড়ার কাতুঠাম্মির কাতর আবেদনে সাড়া দিতে দশ বছরের ঝুমঝুম এগিয়ে আসে। ওর ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল-“আস্তে করে ধর ঠাম্মি, আমি উঠিয়ে দিচ্ছি।” কাতু ঠাম্মি উঠতে গিয়ে একটা ‘উ’
আওয়াজ করে। “কী হল ঠাম্মি”
“গায়ে খুব জ্বর রে নাতিন, ঐ জন্য মাথাটা ঘুরে গেল।”
“সাবধানে চল”
“তোকে যে বলেছিলাম আমার একটা ঠিকানার ব‍্যবস্থা করতে, তার কি হল?”
“তুমি অন‍্য কোথাও কেন যাবে?এখানে তোমার ছেলে
হাবুলকাকা আছে, কাকি-টুকুনদা এরা আছে।”
ঝুমঝুমের ছোট্ট মাথায় এটা ঢোকে না ঠাম্মি কেন নিজের বাড়ি থাকতে চায় না। ওর দিদি বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি যেতে কত কেঁদেছিল। নিজের বাড়ি ছাড়ার দুঃখেই নিশ্চয়ই। আর এই কাতুঠাম্মি বাড়ি ছাড়তে চায়। ঘরের ভেতর থেকে বাজখাঁই গলা ভেসে এল-“দুয়ারে বসে বসে আর সহানুভূতি কুড়োতে হবে না, ভেতরে আসা হোক।”
কাতুঠাম্মি চোখ মুছে ভেতরে চলে যায়। ঝুমঝুম
ভাল করে বোঝার চেষ্টা করে কাতুঠাম্মির দুঃখটা কী।
বাড়িতে এসে বাবার কাছে-“বাপি তোমার কাছে একটা সুন্দর বাড়ির খোঁজ আছে?”
“কেন কী হবে রে?”
“কাতুঠাম্মির জন্য।”
“ঠাম্মির তো নিজের বাড়ি আছে, তুমি ঐ ঝামেলার মধ্যে যেও না।”
“কাতুঠাম্মি তো কত মিষ্টি, ঝামেলা হবে মানে?”
“ও তুমি বুঝবে না।”
“বাপি কাতুঠাম্মিকে আমাদের বাড়ি নিয়ে আসি, মা কত সুন্দর সুন্দর রান্না করে, কাতুঠাম্মি খাবে।”
বাবা অবুঝ মেয়েকে শান্ত করতে পারে না। পরদিন ঝুমঝুম মায়ের হেঁসেল থেকে পাকা আম, মিষ্টি নিয়ে
কাতুঠাম্মির সঙ্গে দেখা করতে গেল। ঠাম্মি
প্রথমে না করলেও ঝুমঝুমের আদর উপেক্ষা করতে পারল না। মিষ্টি দুটো আগ্রহের সঙ্গে খেয়ে সবে আমটা খেতে যাবে-“কী রে ঝুমঝুম এখানে কী করছিস? ঠাম্মিকে খাওয়াচ্ছিস, ঠাম্মি কি তোর কাছে খেতে চেয়েছে?”-কাকির বড় বড় রাগী চোখের প্রশ্নে ঝুমঝুম ঘাবড়ে যায়। তবু শান্তভাবে বলল-“না তো, গাছের আম গো তাই নিয়ে এলাম, এই দেখ তোমাদের জন‍্যও এনেছি।” আম পেয়ে আপাতত হাবুলকাকি শান্ত হয়ে ঘরে ঢুকে যায়। কাকি যেতে ঝুমঝুম বাকী আমটুকুও কাতুঠাম্মির হাতে দিয়ে বলল-“ভাল না?”
“হ‍্যা‍ঁ রে খুব ভাল, সময়ের ফল প্রথম খেলাম।”
ঝুমঝুম ভাবে কাতুঠাম্মি একটু আমও সময় খেতে পায় না,ওর ছোট্ট বুকটা কষ্টে ভরে যায়। কাতুঠাম্মি
টুকুনদার ঠাম্মি না হয়ে ওর ঠাম্মি হলে ভাল হোত।
ঝুমঝুম একদিন কাতুঠাম্মির খোঁজ নিতে এসে দেখল
শুধু হাবুলকাকা ছাড়া কেউ বাড়ি নেই, হাবুলকাকা
যত্ন করে কাতুঠাম্মিকে গ্লাসে করে দুধ খেতে দিয়েছে।
ঝুমঝুম খুব খুশী হয় ঠাম্মির জন্য হাবুলকাকার ভালোবাসা দেখে। এরই মধ্যে ধাঁ করে কাকি ঢুকে
ঠাম্মির দুধ খাওয়া দেখে বলল-“আমার টুকুনের দুধটুকুও খেয়ে নিলেন আপনি?” ঝুমঝুম আর থাকতে না পেরে বলল-“কেউ এক গ্লাস দুধ কেনে নাকি? দুধ তো প‍্যাকেটে আসে।”
“তুই এখানে ঘুরঘুর করছিস কেন? নিজের বাড়ি যা।”
কাকির বকুনি খেয়ে ঝুমঝুম কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে আসে। এরপর কাতুঠাম্মি কাকির হাড় জুড়িয়ে
দুয়ার ফাঁকা করে আকাশের তারা হয়ে যায়। ঝুমঝুমের এত কান্না পায় যে ঐ পথ আর ও মাড়ায় না। একসময় ঝুমঝুম শোনে যে পায়ের নার্ভ শুকিয়ে
টুকুনদার নাকি হ়াঁটার ক্ষমতা চলে গেছে, হাবুলকাকা ওকে সুস্থ করার জন্য প্রচুর চেষ্টা করছে। বাজারে একদিন কাকির সঙ্গে দেখা হতে কাকি বলল-
“কি রে তুই তো আর আমাদের বাড়ি যাস না, টুকুন সবসময় মন খারাপ করে থাকে, একবার যাস।”
ঝুমঝুম অনেক দিন পর ঐ পথে এল, গেট খুলতে যাবে, কাতুঠাম্মির মুখ মনে পড়ল সাথে কাকির ওকে তাড়িয়ে দেওয়ার স্মৃতি। আর কিছুতেই ঝুমঝুম এগোতে পারল না, যেমন এসেছিল তেমনই ফিরে চলল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *