Taimur Khan

 191 total views

ঐশীলোকের সম্মোহনের বোধ
♨️
তৈমুর খান

পুষ্প সাঁতরার(১৯৫২) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘মৃগশিরার হিমশ্বাস'(২০২১) কাব্যগ্রন্থটি হাতে এসে পৌঁছেছে। কয়েক দশক ধরে তিনি কবিতা লিখলেও সেভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারেননি। এর একটাই কারণ বরাবরই তিনি প্রচার বিমুখ। কাব্যপ্রকাশেও এক অদ্ভুত উদাসীনতা লক্ষ করেছি। ৪ ফর্মার এই কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ৫৬ টি কবিতা আছে। নাতিদীর্ঘ প্রতিটি কবিতাই নির্মেদ শরীরে নির্মিত। সহজ-সাবলীল ভাষা প্রয়োগের কারণে ঝরঝর করে পাঠ করা যায়। অঙ্কন মাইতির সুন্দর প্রচ্ছদটিও বেশ আকর্ষণীয়।
পুষ্প সাঁতরার কবিতায় তথাকথিত উগ্র নারীবাদ নেই, বরং প্রকৃতি-দুহিতা হয়ে কবি প্রকৃতির অন্তরালে আত্মোন্মোচনের প্রজ্ঞায় এক ভাষা খুঁজেছেন যা তাঁকে মহানুভবতার দরজায় পৌঁছে দিয়েছে। কাব্যের নাম ‘মৃগশিরার হিমশ্বাস’ থেকেই বোঝা যায় প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতিও কবির সমীহ কতখানি। ক্ষীণপ্রভ পরস্পর কাছাকাছি তিনটি তারকা মিলে গঠিত হয়েছে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ২৮ নক্ষত্রের পঞ্চম এই নক্ষত্রটি। ঋগ্বেদে ঋষিরা নাম দিয়েছেন যজ্ঞসোম । সৈন্ধান্তিকরা একেই মৃগশিরা নামে চিহ্নিত করছেন। পৃথিবীর সুখ-ঐশ্বর্য-সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই নক্ষত্রের শুভদৃষ্টি প্রয়োজন হয়। কবিতায় মৃগশিরার হিমশ্বাস স্ফীত হতে দেখি। কেননা কল্যাণময় পৃথিবীর জন্য যে ক্ষেত্র রচনা তা সম্পূর্ণ হয়েছে। শ্যামশস্যে পৃথিবীও পূর্ণ হয়ে উঠবে। এই পূর্ণের নান্দনিক প্রভা থেকেই কবির বোধ জাগ্রত। কবিতায় তা উল্লেখ করে লিখলেন:
“পোয়াতি শরীরে শিশিরের ঘোমটা
টুপটুপ সবুজ গালিচায়
দুধ-ক্ষীরের সঞ্চিত স্তন
কুরুশে স্বপ্নবোনা রমণীশস্য
পিটুলিগোলা হেমন্তের পেতলবাটি
গরু-মই-নাঙল-পাখির
চিত্রকল্প
গোময় শুদ্ধ আনন্দ উঠোন”
দুধ-ক্ষীরের সঞ্চিত স্তন, কুরুশে স্বপ্নবোনা রমণীশস্য, পিটুলিগোলা হেমন্তের পেতলবাটি, গরু-মই-নাঙল এবং গোময় পরিশুদ্ধ উঠোন সবই মানবিক প্রকল্প। আমাদের পার্থিব আয়োজনেই যা সুখ-সমৃদ্ধির ধারক। জীবন ও আনন্দের পরিপূরক। এই ভাবনা থেকেই বোঝা যায়, তিনি মাটি-মানুষের জন্যই অমৃতসন্ধানী কবি। এই বাস্তবতাকেই অপার্থিব আলোকে স্নাত করতে চেয়েছেন। তাই প্রয়োজন হয়েছে মৃগশিরার।
প্রকৃতির প্রতিটি রূপকেই তিনি সর্বদা অনন্তের আলোকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। স্বাভাবিক সেখানে ঐশীলোকের সম্মোহনে আশ্চর্য হয়ে উঠেছে। এ তো এক মুক্তিরই পর্যায়। ক্ষুদ্রকে বৃহৎ এর দরবারে উত্তরিত করা। যা সাধারণ, যা দুঃখ যন্ত্রণায় কাতর—তাই তাঁর কাছে অসাধারণ অপার্থিব হয়ে উঠেছে। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে:
১) বনানীর পদ্যে ছাপা পাতার নীড়
২) ক্ষারীয় অন্ধকার ভাঙে অনন্তের ঘুম
৩) মেঘের কালো বেণী নব সৃষ্টির
৪) কালো অক্ষর সাদা আলোয় জ্বলে ওঠে
৫) খড়ি ওঠা ত্বকে মেঘ দাঁড়ায়
৬) চাঁদের কাস্তে তরণী ঠেলে
হাওয়ার রাখাল।
৭) মহাজগৎ আমার অধীশ্বর
৮) ঠাকুমা আকাশের অরুন্ধতী
৯) ভোরের আজানে ভৈরবপুর মঙ্গল আরতিতে তাই
১০) ঐহিক ডানা খসে পড়ে হলুদ রোদ
মৃত্যুও কবির কাছে এক চক্রের মতো, কতবার আসতে-যেতে হবে তার হিসেব নেই। এই অনন্তের চক্রেই চলতে থাকে জীবনচক্র। বহুমাত্রিক ভালোবাসা থেকে তাঁর কবিতারও জন্ম। সমূহ সংরাগেই তাঁর বিপুল প্রাণের ঐশ্বর্য ছড়িয়ে পড়েছে।
কবি উপলব্ধি করেছেন নিজের ভেতর শুধু এক ‘আমি’ নেই, বহু ‘আমি’রও সমাবেশ। সমগ্রজীবন তাই বীজঘর হয়ে ওঠে। যে বোধের দ্বারা তিনি চালিত হন তা সমগ্রের বোধ। স্থান-কালের ঊর্ধ্বে মানবিক ব্যাপ্তির প্রাচুর্যে তিনি শাশ্বত আদি-অন্তহীন উপলব্ধিকে ধারণ করেই যুগচৈতন্যের স্রোতে এক দক্ষ শব্দকুশলী নাবিক। নিজেই সে কথা বারবার বলতে চেয়েছেন:
“ভাঙাগড়ায় পাখি খুঁজে নেয়
আহ্লাদী আকাশ
একাকারে কোনো প্লাবন নেই
রোজ রোজ জন্ম হচ্ছে
বহুমাত্রিক ভালোবাসা আর কবিতা।”
বিরহ-প্রেমের ব্যাকুলতাকেও তিনি ধারণ করেছেন। অনুভূতির স্তরগুলি খুলে দিয়েছেন। তাই মৃগশিরা নক্ষত্রে চোখ রেখে তিনি হিমগন্ধী বাতাসে উড়ে যেতে চেয়েছেন। নীল সমুদ্রে সোনালি ভেলা ভাসাতে চেয়েছেন। জাগরণে শব্দের অনুরণন শুনতে পেয়েছেন। আর নিজস্ব ছন্দের কাছে লিখতে পেরেছেন:
“দ্বন্দ্ব-হুতাশ নীল শাড়ির ভাঁজে
চোখের পাতায় ফুলেল বাতাস
শায়েরি শরীরে দুলছে অমলতাস
আশ্রয়ী উত্তাপে গলে রঙ অভ্যাস।”
তাঁর সমগ্র কাব্য জুড়েই এক উচ্ছল যৌবনের উত্তাপ ছড়িয়ে আছে, তেমনি স্নিগ্ধ এক মনোরম পৃথিবীর আকর্ষণও অপার্থিব বাতাসে ঝলমল করে উঠেছে। বেশি কথা না বলেও বেশি শিহরন জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন।

মৃগশিরার হিমশ্বাস: পুষ্প সাঁতরা, কবিতিকা, খড়্গপুর, মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ। মূল্য: ১০০ টাকা।

♨️

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *