Taimur Khan

 217 total views

🦄 প্রেমিক হৃদয়ের আন্তরিক উচ্চারণের পংক্তিমালা
___________________________
তৈমুর খান
________________________

সৌরভ লায়েকের সম্পাদনায় ‘এসো প্রেম এসো বিরহ'(শারদ ১৪২৮) প্রকাশিত হয়েছে। সংকলনটির একটি বৈশিষ্ট্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ তা হলো, সাম্প্রতিককালের তরুণ-তরুণীদের প্রেম ও বিরহ ভাবনা নিয়ে কাব্যচর্চা। মোট ৩৮ জন কবির দুটি করে কবিতা নিয়ে এই সংকলন। সব কবিতাই প্রথম শ্রেণির কবিতা তা না বললেও, কবিদের উপলব্ধিতে প্রেম-বিরহ কতখানি জীবনবাদী অভিপ্রেত এবং অনপনেয় তা সহজেই বোঝা যায়। প্রচ্ছদ শিল্পী শর্মিলী মোস্তাফি বেশ নতুনত্ব এনেছেন। মৃত্যুর কবর এবং তার পাশে গোলাপ গাছ। একদিকে ফণীমনসা, গোলাপ অন্যদিকে, মাথার ওপর মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। প্রেমিক-প্রেমিকা এখানেই অনন্ত শয়ানে শায়িত।
তাহলে প্রেমের ঠিকানা কি মৃত্যু? হয়তো মৃত্যুই, অথবা হয়তো জন্মান্তর। কেননা মিলনে প্রেমের মৃত্যু ঘটে, বিরহের প্রেম জাগরিত হয়। জটিল মানবজীবনে সরল প্রেমের ব্যাখ্যা বিভিন্ন ভাবে আমাদের কাছে এসেছে। কিন্তু পূর্ণপ্রেম অথবা সার্থকপ্রেম বলে কোনো কথা শুনিনি। প্রেম যে জ্ঞান নয় তা বহু আগেই রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন। প্রেমের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি এ বিষয়ে লিখেছেন: “প্রেমে অনেক প্রভেদ। জ্ঞানে আমাদের ক্ষমতা বাড়ে,প্রেমে আমাদের অধিকার বাড়ে। জ্ঞান শরীরের মত ,প্রেম মনের মত । জ্ঞান কুস্তি করিয়া জয়ী হয় , প্রেম সৌন্দর্য্যের দ্বারা জয়ী হয় । জ্ঞানের দ্বারা জানা যায় মাত্র , প্রেমের দ্বারা পাওয়া যায়। জ্ঞানেতেই বৃদ্ধ করিয়া দেয় , প্রেমেতেই যৌবন জিয়াইয়া রাখে। জ্ঞানের অধিকার যাহার উপরে তাহা চঞ্চল , প্রেমের অধিকার যাহার উপরে তাহা ধ্রুব । জ্ঞানীর সুখ আত্মগৌরব-নামক ক্ষমতার সুখ , প্রেমিকের সুখ আত্মবিসর্জ্জন-নামক স্বাধীনতার সুখ।” (——জ্ঞান ও প্রেম)
সুতরাং প্রেমে আত্মবিসর্জন দিলেও তা চিরন্তন। প্রেমে যৌবন অটুট থাকে। প্রেম সৌন্দর্যের পূজারী হয়। সাহিত্যে বারবার এই প্রেমেরই জয়গান ফিরে এসেছে। বিখ্যাত প্রেমের কবি এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং বলেছেন:
“I love thee with the breath, Smiles, tears, of all my life; and, if God choose, I shall but love thee better after death.”
(Sonnets From the Portuguese 43″ — Elizabeth Barrett Browning)
আমি তোমাকে আমার সারা জীবনের শ্বাস, হাসি, অশ্রু দিয়ে ভালবাসি; এবং, যদি ঈশ্বর পছন্দ করেন, তবে মৃত্যুর পরে আমি তোমাকে আরও ভালভাবে ভালবাসব।
বিখ্যাত মেটাফিজিক্যাল ভাবনার কবি জন ডান বলেছেন: “Come live with me, and be my love, and we will some new pleasures prove.”
(“The Bait” — John Donne)
অর্থাৎ আমার সাথে সহবাসে আসো, এবং আমার ভালবাসা হও, এবং আমরা কিছু নতুন আনন্দ প্রমাণ করব।
কবিদের কথায় স্পষ্ট হয় ভালবাসা সমস্ত জীবনের জন্য , এমনকী পরকালের জন্যও। বাঁচার প্রতিটি মুহূর্তেই উচ্চারিত হয় ভালবাসা। আর ভালবাসাকে নতুন রূপদান করাও প্রেমিক-প্রেমিকার একটা প্রয়াস। সুতরাং একটি মৌল আদিম প্রবৃত্তিকেই আমরা প্রেম নাম দিয়ে আজীবন বহন করে চলেছি। পাওয়ার থেকে না পাওয়ার মধ্যেই তার উজ্জীবন এবং মাহাত্ম্য উপলব্ধি ক’রছি। উক্ত সংকলনে এই ধারাকেই কবিরা সংবহন করে নিয়ে চলেছেন তাঁদের শিল্পকর্মে।
উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদ চট্টরাজ, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, উত্তম চৌধুরী, তরুণকান্তি চট্টরাজ, সৌম্যস্বপন চক্রবর্তী, শুভ্রপ্রকাশ নন্দী, মনোজ মজুমদার, আশীষকুমার ভট্টাচার্য, মনোজিৎ মজুমদার, নটরাজ দে সরকার, সুনন্দ বসু, শুভব্রত ব্যানার্জি, দেবলীনা অধিকারী, কৃতিকণা, দীপ্তি মুখার্জী, সুবর্ণ মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণা ব্যানার্জি, অনয়কৃষ্ণ সিকদার, শংকর ভট্টাচার্য্য, শুভমিতা বাগচী, শুভ্রা মজুমদার, শ্রুতি ঘোষ, মনোজ সিনহা, দেবানন্দ দে, তন্ময় বসু, জিতেন্দ্র নাথ, সৌরভ লায়েক, সুস্মিতা মাজি, কোয়েল সরকার, দ্বিতীয়া রায় প্রমুখ। প্রেম কেমন, কেমন করে তা আসে, তা জানিয়েছেন আশীষকুমার ভট্টাচার্য্য:
“সবে একুশে পা দিয়েছি গোঁফের রেখা একটু স্পষ্ট হতেই,
পাড়ার চুলখোলা ষোড়শী কন্যাগুলোকে দেখলেই—
বুকটা যেন কারেন্ট লাগার মত ঝটকা তোলে,”
হ্যাঁ এরই নাম প্রেম, ওইযে কারেন্ট লাগার মতো ঝটকা তোলা আর কিসে হয়? না আর কিছুতে তো হয় না। তা কেবল প্রেমেই হয়।
সৌরভ লায়েক লিখেছেন:
“হাজার মানুষের ভিড়েও নয়ন শুধু তোমাকেই খোঁজে”
এই খোঁজার শেষ নেই। একবার যাকে কারেন্ট লাগে সে জানে তার বুকের শূন্যতা কতখানি।
কোয়েল সরকার লিখেছেন:
“আমার অন্তর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে
পড়ে আছে শুধু বুক ভরা হাহাকার।”
এই হৃদয় দাহ করা ছাই নিয়েই চিরদিন হাহাকার করে যেতে হয় প্রেমের জন্য।
জিতেন্দ্র নাথ লিখেছেন:
“সেদিন তোমার কথা ভাবতে ভাবতে প্রেসারের ট্যাবলেট খেতে ভুলে গেছি,”
প্রেমের জন্য মৃত্যুও তাচ্ছিল্য হয়ে গেছে তাই কবি জীবনদায়ী ওষুধও সেবন করতে ভুলে গেছেন।
দেবানন্দ দে লিখেছেন:
“ভালোবাসার ঝড়ে পৃথিবীরও সমাধি হতে পারে”
অবশ্যই হতে পারে, ভালবাসার থেকে আর শক্তিশালী কিছু নেই। রামায়ণ মহাভারত থেকে ট্রয়ের যুদ্ধ ভালোবাসার কারণেই হয়েছে।
অনয়কৃষ্ণ সিকদার লিখেছেন:
“পরান সঁপিব হায়
সাজাবো সে যাহা চায়
কাটাব জীবন হেসে খেলে।”
কিন্তু যতই আমরা হেসে খেলে জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখি ততই আমাদের জীবনে দুঃখ বিরহ বিরাজ করতে থাকে। সুখের জন্য প্রেম নয়। প্রেম বিরহের জন্য। প্রেম যন্ত্রণার জন্য। প্রেম সোনার মুকুট নয়, কাঁটার মুকুট। লেবানিজ আমেরিকান কবি কাহলিল জিবরান এ সম্পর্কে বলেছেন: “I am a stranger in this world, and there is a severe solitude and painful lonesomeness in my exile.”
(Kahlil Gibran, The Treasured Writings of Kahlil Gibran)
অর্থাৎ আমি এই পৃথিবীতে একজন অপরিচিত, এবং আমার নির্বাসনে একটি তীব্র নির্জনতা এবং বেদনাদায়ক একাকিত্ব রয়েছে।
এই তীব্র নির্জনতা এবং বেদনাদায়ক একাকিত্ব প্রতিটি প্রেমিক জীবনেই বাহিত হয়ে চলেছে। উক্ত কাব্য সংকলনের প্রতিটি কবির মধ্যেই এই একাকীত্ব জেগে উঠেছে। শিল্পের দিক দিয়ে কবিতাগুলি কতখানি সিদ্ধির পর্যায়ে পৌঁছেছে সে বিষয়ে তর্ক থাকতে পারে। কিন্তু কবিরা যে প্রেমিক হৃদয়ের আন্তরিক উচ্চারণে পংক্তিমালা সাজিয়েছেন সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই।

❤️
এসো প্রেম এসো বিরহ: সম্পাদনা সৌরভ লায়েক, শব্দসাঁকো প্রকাশন, এগরা, পূর্ব মেদিনীপুর, মূল্য: ২০০ টাকা।
🌷🌷🌷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *