TAIMUR KHAN

 237 total views

বাংলা কবিতা উৎসব কোন্ পথে

তৈমুর খান
🗽

কবিতা উৎসবগুলি এক একটি গড্ডলিকা প্রবাহ। কবিগণ উৎসবে সামিল হন, অংশগ্রহণ করেন তারপর আবার হারিয়েও যান। কবিতা নামে লেখকর্মটির তাতে কোনো উৎকর্ষতা বাড়ে না, বরং অনেকের ভিড়ে তা চুপসে যায়, হতাশ হতে পারে। কবিতার জন্য যে নিভৃতি বা স্তব্ধতা দরকার,উৎসবগুলি সেই পরিবেশ নষ্ট করে দিতে পারে। যারা মনে করেন হইচই আস্ফালন জনসমাগমে কবিতার পরিপুষ্টি লাভ হয়, তাদের ধারণা সর্বার্থেই ভুল। কবিতা উৎসবে নেই, ভিড়ে নেই, এমনকী মাইকের সামনে সরব পাঠেও নেই। কবিতার পাঠক ও লেখক উভয়কেই কবিতার জন্য একটা স্পেস দরকার হয়। যেখানে একান্ত নিজস্ব সময়ের বাতাবরণ তৈরি হয়। অন্যকারও যেন উঁকি না ঘটে। কবিতা খুবই স্পর্শকাতর শিল্প। আগে উচ্চকিত পাঠে যে আবেগ ধারণ করে একমুখী কবিতা রচিত হত, বর্তমানে প্রকৃত কবিতায় তা আর থাকে না। কবির ব্যক্তিক্ষরণের সঙ্গে সময়ের এক নিবিড় জিজ্ঞাসা সেখানে উপস্থিত হয়। কবির ব্যক্তিক্ষরণের সঙ্গে সময়ের এবং সমাজের পরিচয়টিও উঠে আসে। হৃদয়ের সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম বোধের তীব্র মোচড়ে ভেঙে যায় ধারাবাহিক বক্তব্যও। কবি নাথিংনেস্ প্রজ্ঞায়ও পৌঁছাতে পারেন। সেখানে শূন্যতার অবধারিত প্রলাপে জীবনের নশ্বর মুহূর্তগুলি পাক খায়। কবিতা পাঠে সেগুলি ধরা যায় না। অনেক সময় তা অবাঞ্ছিত মনে হতে পারে। সুতরাং কবিতা সেই শ্লোগান থেকে বেরিয়ে এসে একান্ত অনুভূতির নিরীক্ষণে ভাষাহীন ভাষার মর্মরিত বোধে জারিত হতে চায়। উৎসবের আলো ঝলমলে মঞ্চে সাজসজ্জা পরিবেষ্টিত জবরজং কবিকে দেখা গেলেও তাঁর কবিতার সঙ্গে বসতি স্থাপন করা যায় না। এই মঞ্চ তো বিয়ে বাড়ির মতো আচার অনুষ্ঠানের মঞ্চ। পাঠকও স্থূল বরযাত্রীর মতো হতে বাধ্য। তাদের আত্মিক অন্বয় এবং চেতনার সর্বস্তরের বিকাশ সম্ভব নয়।
সারা বছর ধরেই কোথাও না কোথাও চলে কবিতা উৎসব। কবিরা বহুদূর থেকে আমন্ত্রিত হয়ে আসেন। অনেক ধৈর্য ধরে বসে থেকে একটা বা দুটো বা অধিক কবিতা পড়ার সুযোগ পান। কিন্তু সেই কবিতা পাঠ কতটা জরুরি ছিল তা ভাবেন না। শ্রোতারা তাঁর কবিতা শুনছেন কিনা সেদিকেও কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। অনেক সময় নিজের কবিতা নিজেকেই শুনে মঞ্চ ছাড়তে হয়। যতটা আড়ম্বর করে, টাকা-পয়সা খরচ করে উৎসবগুলি করা হয় এবং যেসব কবিদের আমন্ত্রণ জানানো হয় তার কোনো সদর্থক উপযোগিতা আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ কবিরা কখনো নিজেদের দীনতা স্বীকার করেন না। তাঁর যোগ্যতা কতখানি সে বিষয়ে তাঁর আত্মসমালোচনা বোধ করেন না। সর্বদা এক ধরনের অহংকারে আচ্ছন্ন থাকেন। ফলে রাজনৈতিক কারণে, কিংবা পরিচিতির কারণে বা কাব্য প্রকাশের কারণে এইসব উৎসবগুলিতে অকবিদেরও ডাক পড়ে। তখন তাঁরা নিজেকে শ্রেষ্ঠ কবি ভাবতে থাকেন। এতে তাঁর প্রতিভার অঙ্কুরেই বিনাশ ঘটে। প্রতিভা কখনো অহংকারকে সহ্য করে না। সুতরাং উৎসবগুলি উৎসাহ প্রদানের বদলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় কবিকে। সব অনুষ্ঠানে ডাক পান, বহু বইও প্রকাশিত হয়েছে, পত্রিকা সম্পাদনা করেন—এমন কবিকেও আমার কবি বলে মনে হয়নি। কারণ বহু প্রসবার মতো একদিকে তিনি কবিতার মাফিয়ায় পরিণত হয়েছেন। দালাল ও ব্যবসায়ী হিসেবে সব আসনগুলিই তিনি দখল করে নিতে জানেন। কিন্তু এমনও কবি আছেন, যাঁরা কখনোই কোনো অনুষ্ঠানে ডাক পান না, থাকেন কোনো প্রান্তিক শহর বা গ্রামে। তেমন নামকরা কোনো পত্রপত্রিকায়ও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয় না। সেরকম কবিকেই আমার প্রকৃত কবি বলে মনে হয়।
উৎসবগুলি উৎসব হিসেবেই পরিচালিত হয়। নাগরদোলার মতো তোলান পান কিছু সংখ্যক কবি। রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে তা অপব্যবহারও করেন। নিজের পছন্দের কবিদের ডাকেন (তাঁরা অকবি হলেও)। আর ভালো লিখেও কোনোদিন ডাক পান না, সারাজীবন উপেক্ষিত হতে হয়। কিন্তু শেষ জয় তাঁদেরই হয়। প্রতিটি উৎসবকেই আমার পক্ষপাতমূলক, আড়ম্বর সর্বস্ব, কবিতার ও কবির শত্রু বলে মনে হয়। দায়সারা এইসব উৎসব না হলেই ভালো। কবি তো জনতার ভিড়ে থাকতে পারেন না। উৎসবে যে জনতার মিছিল থাকে, সেখানে শুধু শ্লোগান-ই সাফল্য পায়, কবিতা নয়। আলাপচারিতার কিছুটা সুযোগ থাকে, বই আদান-প্রদান হয়, পত্রিকায় লেখার সুযোগ ঘটে, কিন্তু সেসব সুযোগে কবির বা কবিতার উৎকর্ষতা থাকে না। আলাপের পরবর্তী পর্যায়ে বিস্ময়কর বিস্মৃতি বাস করে। বইপত্রগুলি কোনো বড় কবিকে দিলেও তিনি সেগুলি পড়া তো দূরের কথা, ঘর পর্যন্ত নিয়ে আসেন না। কেউকে দিয়ে দেন, কিংবা আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেন। যেসব পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপানোর সুযোগ ঘটে বলে কবিরা মনে করেন, সেসব পত্রপত্রিকায় না লিখলেই ভালো হয়। কারণ লেখার গুণ ও মান বিচার করে সেসব পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয় না। তবে একটা বিষয় হয়, তা হলো উৎসবগুলিতে খানাপিনা ভালোই চলে। আড়ম্বরের পংক্তিতে বসে বাতেলা মারা সহজ হয়। নিজের গৌরব নিজেই প্রচার করতে পারেন কবিরা। কিছু টাকাও পাওয়া যায়।
এবছর একটা সরকারি কবিতা উৎসবের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজেকে খুব অসহায় লেগেছে। যে উদ্যোক্তারা সরকারি আনুকূল্যে আমাকে ডেকেছিলেন, তাঁদের কারোরই দেখা পাইনি। কতকগুলি বেতনভুক কর্মচারি ২০০০ টাকার ড্রাপ লিখে দিয়ে ফাঁকা মঞ্চে কবিতা পাঠ করালেন। টাকা নেওয়ায় এবং কবিতা পাঠ করে মনে যে অসন্তোষ জন্মালো তা সহ্য করা কঠিন। অবশ্য অন্যকারও মনে তা (এমনটি) নাও হতে পারে। তবে বেসরকারি কবিতা উৎসবগুলিতে নির্বাচিত কবিদের কবিতা পাঠে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা হতে পারে। সেসব ক্ষেত্রে কিছু পজেটিভ দিক অবশ্যই আছে। কবিতা পাঠ এবং আলোচনায় অনেক দিক খুলে যেতে পারে। তবে তা খুবই নির্বাচিত এবং নির্ধারিত বিষয় হলেই ভালো হয়।
তাহলে কি কবিতা উৎসবের দরকার নেই?
একথাটি ভেবে দেখা দরকার। প্রকৃত কবি কে তা নির্বাচন করা খুবই মুস্কিল। জনপ্রিয় কবি এবং প্রকৃত কবির মধ্যে বিস্তর তফাত আছে। জনপ্রিয় কবি তাে আমজনতার কবি। তিনি সরাসরি বক্তব্যপ্রধান কবিতা লেখেন। তিনি হাততালি পান। তাঁর কবিতা শ্লোগান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রকৃত কবি, প্রথমত তিনি কবির কবি; তারপর ভিন্নরুচির মানুষের। তিনি আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন। তথাকথিত যশ-খ্যাতির ঊর্ধ্বে তাঁর অবস্থান। অনুষ্ঠানে বা উৎসবে স্বাভাবিকভাবেই তিনি অনুপস্থিত হন। আর জনপ্রিয় কবি মঞ্চ আলো করে কখনো কখনো স্যুট টাই কোট পরে সেন্ট মেখে উপস্থিত থাকেন। তাঁর কবিতা আবৃত্তিযোগ্য, বিবৃতি ও বক্তব্য মানুষকে আকৃষ্ট করে। বর্তমানে যতগুলি কবিতা উৎসব হয় তার বেশিরভাগগুলিতেই এঁরা থাকেন, ডাকও পান। এঁদের কাব্যপ্রকাশও করেন অন্যান্য কবিরা। সুতরাং উৎসব কেবল তাঁদেরই উৎসবে পরিণত হয়।
কবিতার নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড নেই। বিচার করারও কেউ নেই। স্বাভাবিক কারণেই এই পক্ষপাত চলে আসছে। আর এঁরাই অভিজাত কবি, মেট্রো কবি, স্মার্ট কবি, পুরস্কৃত কবি হয়ে উঠছেন। অপরপ্রান্তে ভিন্নজগতের কবি হিসেবে নতুন পথের দিশারি কবি চিরদিন ব্রাত্যই থেকে যাচ্ছেন। উৎসব এখন রাজনৈতিক দলের মতোই ভিন্নমত ও ভিন্ন আদর্শে পরিচালিত একটি কর্মকাণ্ড। একজন নতুন কবিও এই অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় এভাবে ব্যক্ত করলেন:
“সেদিন কবি সম্মেলনে
বাঙালি সাজার উৎসবে সাজো সাজো রব…
ষোলোআনাই বাঙালিয়ানা…
একে একে শুরু হলো কবিদের কবিতা পাঠ।
থেকে থেকে গর্জে উঠলো করতালি।
আত্মশ্লাঘার তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে থেকে ঢেকুর ওঠে
পরস্পরের পিঠ চাপড়ে এগিয়ে যায়…
আবার আসে কবিতামঞ্চ…
আবার আসে কবিসম্মেলন…
আবার চলে কবিতা পাঠ…
কিন্তু
সবাই ঘরে ফেরে শূন্য হয়ে। শূন্য মনে।
কেউ কবিতা নিয়ে ফেরে না…
কেউ কবিতা হয়ে ফেরে না…”
(সংগ্রাম সিংহ)
এই অংশটিতেই ধরা পড়ে কবিতা উৎসবের ব্যর্থতা কতখানি। বাঙালি সাজের উৎসব, কবিতা পড়ার উৎসব এবং কবি হওয়ার উৎসব যে শূন্যতার দম্ভে পূর্ণ এবং অন্তঃসারশূন্য জাঁকজমকে শুধু হাততালি সর্বস্ব একটি অনুষ্ঠান তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হয়তো সেই কারণেই জীবনানন্দ দাশ কখনোই কবিতা উৎসবে যোগ দিতেন না। এখনও সেরকম অনেক কবিকেই আমরা উপস্থিত হতে দেখি না। এমনকী পুরষ্কারও প্রত্যাখ্যান করে দেন।

🐎

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *