Taimur Khan

 161 total views

দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের ইতিহাস
তৈমুর খান

২০০৮ সাল। ‘বর্ধমানের খবর’ পত্রিকায় গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা লিখি। সম্পাদক হাজি মোল্লা একরাম হোসেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বর্ধমানের অন্যতম কবি এবং বর্তমানে প্রয়াত দেবাশিস কোনার (১৯৬৩-২০১৯)। একদিন হঠাৎ দেবাশিস কোনার আমাকে ডেকে নিলেন হাজি মোল্লা একরাম হোসেনের বাড়িতে। প্রায় সারাদিনই তাঁর প্রেস অফিসে এবং রাত্রে বাড়িতে কথাবার্তায় খুব আনন্দময় মুহূর্ত কেটে গেল। দেবাশি কোনারই বললেন: ”বর্ধমানের খবর’ থেকে এবার একটা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হবে এবং সেটা তোমারই কাব্য। এক পয়সাও খরচ দিতে হবে না, সব খরচ পত্রিকা কর্তৃপক্ষ বহন করবে।’ শুনে অবাক হলাম। হাজি সাহেব এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। বললেন: ‘আপনার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে আমরা একটা ইতিহাস সৃষ্টি করতে চাই। কেননা ইতিপূর্বে কোনও বইই আমরা প্রকাশ করিনি।’ দেবাশিস কোনার আগে থেকেই আমাকে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে নিয়ে যেতে বলেছিলেন। ২৪ পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপি আমিও বের করে হাজি সাহেবের সম্মুখে রাখলাম। হাজি সাহেব পাণ্ডুলিপি গ্রহণ করে বললেন: ‘এক সপ্তাহের মধ্যেই বইটি আমরা বের করে দেবো।’ এই সেই বই যার ইতিহাসটি একটু বলার সুযোগ হলো। বইয়ের ভূমিকাটি লিখে দিলেন দেবাশিস কোনার। অনেক কথা লেখার সঙ্গে তিনি উল্লেখ করলেন: ‘কবি তৈমুর খান আমাদের প্রিয় কবিদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর জীবন কেটেছে প্রবল সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। তাই আমরা বেছে নিয়েছি তাঁকে। ‘তরঙ্গের লীলায় দেখি মাধুর্যের বসতি’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করতে পেরে ‘বর্ধমানের খবর’ প্রকাশনা সংস্থা গর্ব বোধ করছে।’ উল্লেখ্য লেখাটি ‘প্রকাশকের কথা’ হিসেবেই বইয়ের পৃষ্ঠায় থেকে গেল। কোথাও নিজের নামটি দিলেন না দেবাশিস কোনার।

দেবাশিস কোনার অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন। বহুদিন বর্ধমানে তাঁর বাড়িতে এবং তাঁর কর্মস্থল বর্ধমান রেল স্টেশনে রাত কাটিয়েছি পরম যত্নে আতিথিয়তায়। কখনও কখনও না ঘুমিয়েই কাব্য আলোচনায় কেটে যেত সময়। তিনি কবিতা লিখতেন, কবিতা পড়তেন এবং কবিদেরও সমাদর করতেন। বর্ধমানের ওপর দিয়ে কলকাতা গেলে স্টেশনে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করতেন। চা খাওয়াতেন। তাঁর আন্তরিকতা এবং মানবিকতা কতখানি ছিল তা যারা তাঁর সংস্পর্শে আসেননি, তাদের বলে বোঝানো যাবে না। নিজের লেখা প্রকাশের যতটা তাগিদ তাঁর না ছিল, অন্যের লেখা প্রকাশে সেই তাগিদ অনেক বেশি ছিল। এমন লোকটিকে অকালে চলে যেতে হলো বলে আমরা আজও এক বিরাট শূন্যতা অনুভব করি।

এই কাব্যের সব কবিতাতেই একটা রোমান্টিক বেদনার উপলব্ধি জারিত হয়েছে। একটা রহস্যময় জীবনের কাছে বার বার ফিরে এসেছি। সমস্ত মায়ামোহ থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব জীবনের ছায়াতেই আত্মঅন্বেষণ চলেছে। কিন্তু আত্মঅনুশোচনা তো সর্বদা আমাকে পুড়িয়ে চলেছে—

“আমার কি হৃদয় ছিল কোনও?

হৃদয়ের ভাষা আমি বুঝিনি কখনও—

অলীক সংলাপে শুধু বারুদ সময়

অনুতাপ এসে আমাকে পোড়ায়!”

story and article
 দেবাশিস কোনার 

২০০৪ সাল। চাকরিতে যোগদান করা খুব বেশিদিন হয়নি। মুর্শিদাবাদের একটি সীমান্ত এলাকায় থাকি। প্রতিদিনই খবর আসে ধর্ষণের। চোর-চোরাচালানি এবং নারীপাচারের সংবাদ আমাকে বিচলিত করে। সব সংবাদ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না।

দীর্ঘদিন বেকার জীবন অতিবাহিত করার পর সদ্য চাকরিতে প্রবেশ করে বেশ কিছু পরিবর্তন উপলব্ধি করতে থাকি। সমাজের চোখে এবং পরিবারের চোখে আগের দেখানো সহানুভূতি সব হাওয়া হয়ে যায়। অথচ মানবকাঙাল আমি এসব সহ্য করতে পারি না। ভাষায় না প্রকাশ করা এক কষ্ট আমাকে পেয়ে বসে।

অন্যদিকে সরকারি চাকরি করি বলে ইলেকশন কর্মী হিসেবেও আমাকে অংশগ্রহণ করতে হয়। সে এক মস্ত জটিল ব্যাপার। জনসমাগমে বরাবরই আমার একটা ভয় আছে। বরাবরই আমি একাকী থাকতে পছন্দ করি। কিন্তু সেই নীরবতা আমার ছিন্ন হয়ে যায়। কর্মরত বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই আর পদে পদে টক্কর খাই।

দীর্ঘদিন অবিবাহিত জীবন কাটালেও কোনও বিবাহের ঘটক কখনো শুভ সংবাদ নিয়ে আসেনি। কোনও মেয়ের পিতা-মাতাও কোনওদিন পাত্তা দেয়নি। প্রেমিকা ছেড়ে পালিয়েছে। নিজেকে নিজেই বিয়ে না করার পরামর্শ দিই। কিন্তু চাকরি পাওয়ার পর বহু নেতামন্ত্রী, বিয়ের ঘটক, পাত্রীপক্ষের লোকজন যাতায়াত শুরু করে। আমার কর্মস্থল অবধি তাঁদের দৌড় থামে না। সেসব অভিজ্ঞতা আমাকে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত করে দেয়।

এইসব অভিজ্ঞতা থেকেই কবিতার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটি স্তবক স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিখিত হতে থাকে। এই মুহূর্তেই ‘কপোতাক্ষ’ পত্রিকার সম্পাদক বন্ধুবর অতনু মুখোপাধ্যায় আমার একটা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আমিও না করতে পারি না। সেই কবিতাগুলিই পাঠিয়ে দিই তাঁকে। প্রকাশিত হয় ‘বিষাদের লেখা কবিতা’। এক ফর্মার বই হলেও বহু কবিতা সেখানে ঠাঁই পায়। বইয়ের মলাটও হয় বেশ পুরু। অতনু ভূমিকায় লেখেন: ”বিষাদের লেখা কবিতা’ নামকরণেই বলে দিচ্ছে যে, কবিতাগুলো তৈমুরের বিষাদঘন নানা মুহূর্তে লেখা হয়েছে। এবং খুবই পরিচ্ছন্ন ও নির্ভেজালভাবেই ব্যক্ত হয়েছে। তরুণ কবি তৈমুর খান এমনই একজন লেখক যিনি পুস্তকাবলীর সমালোচনা করেন দীপ্ত অভিব্যক্তিতে, স্পষ্ট উচ্চারণে।

কবি তৈমুর খান আমার সমসাময়িক হলেও লেখায়, বিদ্যায়, যোগ্যতায়, প্রচারে আমার অনেক অগ্রবর্তী। এ কথা বলা সম্ভব তৈমুরকে আমি জানি বলেই।’

সেই বিষাদঘন বিচিত্র অভিজ্ঞতার কবিতা পুরো এই কাব্যগ্রন্থটি জুড়ে। কাব্যের সূচনাটিতে একটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেই লিখেছিলাম:

‘সব যখন কেড়ে নিচ্ছ

আমাকে কে নেবে?

তোমার ছুরি উদ্ধত লিঙ্গ

রক্ত ঝরছে! কী বিচ্ছিরি ঘাম!

হাতের মুঠোয় তোমাকে আজ

সব তুলে দিলাম।

গোপন আর কী থাকে?

এই অশ্রু, এই ব্যর্থ কবিতা

সীমান্তে ঘর বাঁধা এই ছোট্টগ্রাম।’

তৈমুর খান 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *