Taimur Khan

 78 total views

ভ্রান্তির ভূত – তৈমুর খান
_
আলো জ্বলা দেখে বাড়ির কাছাকাছি যাচ্ছি আর অমনি মনে হচ্ছে বাড়িটা সরে গেল। আর একটু এগিয়ে গেলে বাড়িটার কাছে পৌঁছাব। এমনি করে করে যতদূর এগিয়ে যাচ্ছি বাড়িটা সরে যাচ্ছে। গ্রামে ঢোকার রাস্তাটা দূর থেকে মনে হচ্ছে: হ্যাঁ আমাদেরই গ্রাম। রাস্তার দু’পাশে তালগাছ, গ্রাম ঢোকার মুখে বিশাল একটি বটগাছ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তেমনই ধারণা। মানিকের সাইকেল ভালো করার সেই আটচালা। বামদিকে কুতুবের চায়ের দোকান। তেমনই তো সব ঠিকঠাক আছে!
দাদু বললেন: সকালে তো এই রাস্তা দিয়েই এসেছি! আমাদের ভুল হবার কথা নয়! কিন্তু এতটা পথ হেঁটেও এখনো পৌছালাম না কেন?
আমিতো ভয়ে জড়োসড়ো। দাদুর বাম হাতের একটা আঙুল শক্ত করে ধরে আছি। রাস্তা কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আকাশে ঘন ঘোর মেঘ। আষাঢ় মাস। ব্যাঙের সঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকারা একটানা ডেকে যাচ্ছে। মানুষের কোনো সাড়াশব্দ নেই। একটা মালগাড়ি সো সো শব্দে পেরিয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে দাদুকে বললাম: এবার আমরা ঠিক পথেই চলেছি আর ভুল হবে না।
কিন্তু একটু পথে হেঁটেই বুঝতে পারলাম আমাদের পথটা ভুল। যে আলোটা নিকটেই মনে হচ্ছিল, এখনো সেটা তাই-ই মনে হচ্ছে। ওই যেমন বটগাছ, সাইকেল সারাইয়ের দোকান, চায়ের স্টল সবই মনে হচ্ছে আরও একটু দূরে। আমরা সেদিকেই লক্ষ্য রেখে হেঁটে চলেছি আর সেগুলিও ঠিক তেমন দূরত্বেই অবস্থান করছে।
আর কতদূর যাব দাদু?
আর একটু এগিয়ে যাই তারপর দেখি!
কিন্তু আমাদের যাওয়া যে ফুরোচ্ছে না? সেই রাত দশটায় ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমেছি। বড়জোর আধঘন্টা লাগে আমাদের বাড়ি ফিরতে। ট্রেনটা লেট না করলে আমরা সাড়ে-আটটাতেই নেমে যেতাম। স্টেশন থেকে সোজা পশ্চিম দিকে মাত্র তিন কিমি রাস্তা হাঁটলেই আমাদের গ্রাম। আসার সময় পিসি বারবার বলেছিল আজ থেকে যেতে। আমারও তাই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু দাদু থাকলেন না। জমিতে এখনো ধানের বীজ পড়েনি। কোন্ সময় বৃষ্টিতে সব ভর্তি হয়ে যাবে। তাই তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরে পরের দিন সকালেই মাঠে যাবেন। স্টেশনে নামার সময় কয়েকজন মাত্র প্যাসেঞ্জার তারা এদিক ওদিকে কোথায় চলে গেল। আমি আর দাদু পশ্চিম দিক বরাবর হাঁটতে শুরু করলাম। প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল আমাদের সামনে দিয়ে কেউ এগিয়ে যাচ্ছে। হয়তো সেও আমাদের গ্রামে যাবে। তার সঙ্গ ধরার জন্য দাদু খুব জোরে হাঁটতে লাগলেন। আমি হাঁটতে না পেরে পেছনে পেছনে লাগালাম ছুট। কিন্তু লোকটাকে ধরতে পারলাম না। সে এগিয়েই গেল। তার পেছন পেছন হাঁটতে গিয়ে আমাদের এই দশা। আন্দাজ করছি তখন রাত বারোটা। কতবার আমরা একই রাস্তায় ঘুরে ফিরে বারবার একই জায়গায় পৌঁছচ্ছি। আর কেবলই মনে হচ্ছে আর একটু গেলেই আমাদের গ্রাম।
অবশেষে আমরা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। আমি বললাম: আর হাঁটতে পারব না দাদু! পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা! চলো আবার স্টেশনে ফিরে যাই। ওই ট্রেন গেল ওই পথ দিয়েই রেললাইনে হেঁটে স্টেশনে যাব। তারপর স্টেশনেই রাতটুকু কাটিয়ে দেব।
দাদু রাজি হলেন। বললেন: স্টেশন মাস্টার দাসবাবু, আমার খুব পরিচিত। তাকে বলে একটা আলোর ব্যবস্থা করে নেবো।
রেললাইন মুখি আমরা তখন প্রাণপণে হাঁটছি। কিন্তু কোন্ দিকে যাচ্ছি সেটা ঠিক করতে পারলাম না। কেবলই মনে হল সামনেই রেললাইন। কিন্তু অনেকটা হেঁটেও রেললাইনের নাগাল পেলাম না। কেবল একইভাবে মনে হতে লাগল: এইতো! আর একটু গেলেই পৌঁছে যাব!
রাত তখন প্রায় দুটো। আবার আমরা হতাশ। কতদূরে স্টেশন? কতদূর রেললাইন? কে উত্তর দেবে? চারিপাশে চেয়ে দেখি শুধু অন্ধকার। সামনে শুধু আলো জ্বলছে। পেছনে, ডাইনে-বাঁয়ে সবদিকেই টিমটিমে আলো। তবে কেউ কি আলো জ্বালিয়ে এখন অপেক্ষা করছে? কাছাকাছি গেলেই মনে হচ্ছে আর একটু দূরে। এভাবে যে রাত কেটে যাচ্ছে। দাদু, কী হবে আমাদের?
এবার এগিয়েই যাব। একটা গ্রাম তো পাব? যেখানে মানুষ বাস করে। মানুষ থাকলেই সাহায্য পাব।
দাদুর কথা শুনে আমিও যেতে লাগলাম। দুই পা কাঁটায়-পাথরে ও মাটির ঢেলায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। কিছুই বলতে পারছি না। কতক স্থান থেকে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে আঁধারে তা অনুভব করছি। কতক্ষণে বাড়ি পৌঁছাব শুধু একটিই লক্ষ্য।
যেতে যেতে হঠাৎ একটা বাড়ি চোখে পড়ল। ছোটখাটো একটা কক্ষ। খড় দিয়ে ছাউনি করা। একটামাত্র দরজা। দাদু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচাতে লাগলেন:
কেউ আছো বাড়িতে? কেউ আছো? কেউ কি আছো?
কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। ভেতরে অদ্ভুত একটা শব্দ হল। কান্নার শব্দ না হাসির শব্দ কিছুই বোঝা গেল না। দাদু আবার ডাকলেন: কেউ আছো সাড়া দাও! আমরা খুব বিপদে পড়েছি!
হঠাৎ দরজা খুলে সামনে দাঁড়ালেন দীর্ঘদেহী এক অন্ধকার মানুষ। তার মুখের চেহারা কিছুই বোঝা গেল না। হাতদুটি এত দীর্ঘ যে হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে আছে। শুধু চোখ দুটি আগুনের ভাটার মতো লাল। এ-কি কোনো মানুষের চোখ? হতেই পারে না। দাদুকে জড়িয়ে ধরেছি ভয়ে। দাদু স্থির হয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন: গ্রামে যাব, রাস্তা ভুলে গেছি; আমাদের রাস্তা দেখিয়ে দাও!
অন্ধকার লোকটি এক অদ্ভুত হাসির শব্দ তুলে বললেন: কোঁন্ রাঁস্তায় যাঁবি? আঁমি দেঁখিয়ে দিঁচ্ছি আঁই!
অগত্যা তার সঙ্গে-সঙ্গে যেতে হল। না গেলে যদি অন্য বিপদ হয়!
সে এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কিছুতেই তার মাটিতে পা পড়ে না। মনে হচ্ছে যেন বাতাসে ভর করে সে উড়ে উড়ে যাচ্ছে। আমরা তার সঙ্গে অত দ্রুত হাঁটতে পারছি না। তবু দাদু আর একটা কথাও বললেন না। ওর পরিচয়ও জানতে চাইলেন না। সেদিন কতদূর এগিয়ে গেলাম তার হিসাব করতে পারিনি। আমাদের সম্বিৎ ফিরল ভোরের আযান ধ্বনিত হওয়ার পর। তখন দেখি অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করেছে। থেকে থেকে পাখিরা ডাকছে। সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে ব্রহ্মাণী নদী। জলপ্রবাহের কুলুকুলু শব্দ কানে আসছে। স্টেশন থেকে পঞ্চাশ কিমি দূরে এক মাঠের মধ্যে এক প্রাচীন এবং এক নবীন প্রজন্ম ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে বসে পড়েছি। সারারাতের এই পরিভ্রমণ স্বপ্নের মতো মনে হল। আলো আর অন্ধকার এই দুইয়ের ভ্রান্তির শিকার আমরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *