TAIMUR KHAN

 166 total views

আত্মসংগ্রহ থেকে আত্মসংলাপ: কাব্যময় জীবন

তৈমুর খান

এক

২০০৭ সাল। তখন উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ খুব ঘনঘন যাতায়াত করছি। ‘তবু অভিমান’ পত্রিকার সম্পাদক শঙ্খশুভ্র দে বিশ্বাস উঠতি কবি। খুব আগ্রহ নিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং আমার লেখাও প্রায় প্রতি সংখ্যায় প্রকাশ করেন। তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করলেন একটি আত্মজীবনীমূলক গদ্যের বই হোক। শুনে অবাক হলাম—আমার এই ছেঁড়াখোঁড়া জীবনের কী হবে আত্মজীবনী! শঙ্খশুভ্র জোর দিয়ে বললেন: ‘তা হোক না! দেখা যাক কী হয়!’ সেই সূত্রেই বনগাঁ যাওয়া-আসা বেড়ে গেল। নিজের জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনা নিয়ে বেশ কয়েকটি নিবন্ধও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলি সংগ্রহ করে তাঁকে দিলাম। নাম হলো ‘আত্মসংগ্রহ’। মোট সতেরোটি নিবন্ধ।
শঙ্খশুভ্র দে বিশ্বাসের বাবা একজন শিক্ষক। মা গৃহকর্ত্রী। ছোট খাটো সংসার। গাছপালা ঘেরা নির্ঝঞ্ঝাট একটা বাড়ি। বহরমপুর হয়ে বাস ধরে তাঁর বাড়ি পৌঁছাই। কাব্য-কবিতা লেখাজোখা নিয়ে তাঁর বাবা-মার সঙ্গেও অনেক কথাবার্তা হয়। উঠে আসে নানা প্রসঙ্গ। বনগাঁর ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং বিভূতিভূষণের অনেক কথা জানতে পারি। কত পত্রপত্রিকার জন্ম হয়েছে এখানে সেই ইতিহাসও আলোচনায় উঠে আসে। ইতিপূর্বে ‘কবিতা আশ্রম’ এবং ‘এবং রাহী’র সম্পাদকও আমার পূর্ব পরিচিত। তাঁদের পত্রিকায়ও বহুবার লিখেছি। এখানেই পরিচয় ঘটে তরুণ কবি সব্যসাচী মজুমদার এবং সঞ্জয় ঋষির সঙ্গে। স্বাভাবিকভাবেই একটা অন্তরের টান অনুভব করি। রাত্রে শঙ্খশুভ্রের বাড়িতেই খাওয়া-দাওয়া করে থেকে যাই। কখনও লোকাল ধরে কলকাতাও ঘুরে আসি। পরেরদিন বাড়ি ফিরি।
শঙ্খশুভ্র বয়সের দিক দিয়ে খুবই নবীন, কিন্তু সাহিত্যের মূল্য তিনি অনুধাবন করতে পারেন। আমার গদ্যের প্রতি তাঁর একটা আকর্ষণ ছিল। তাই সেগুলিকে পুস্তকাকারে প্রকাশ করারও ইচ্ছা জেগে ওঠে। আমিও বরাবরই চাইতাম, আমার বই কোনও লিটিল ম্যাগাজিন প্রকাশনা থেকেই প্রকাশ হোক। যে আন্তরিকতা নিয়ে শঙ্খশুভ্র কাজটিতে অগ্রসর হয়েছিল তা কোনওদিন ভুলতে পারব না। তাঁর আগ্রহ না থাকলে হয়তো এগুলি পুস্তকাকারে বের করার কথাও ভাবতেই পারতাম না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, শঙ্খশুভ্রের বাবাকে মাত্র দু বার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তৃতীয়বারে তাঁর বাড়ি গিয়েই জানতে পারি, তিনি হার্টঅ্যাটাকে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। বাবাকে হারিয়ে শঙ্খ বেশ কিছুদিন দিশেহারা হয়ে পড়েন। অভিভাবকহীন একজন উঠতি সাহিত্যিকের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয়। তবুও অদম্য প্রাণশক্তিতে তিনি পিছিয়ে আসেননি। আমার এই গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিলেন। প্রদীপের আলোর সামনে আমাকে বসিয়ে নিজেই ক্যামেরা ধরে বইয়ের প্রচ্ছদের ফটো করেছিলেন। সেই বইটি আজ অন্য প্রকাশনা থেকে তৃতীয় সংস্করণ হতে চলেছে। পাঠকদের উত্তরোত্তর চাহিদায় আমিও অভিভূত। পরবর্তী সংস্করণগুলিতে নিবন্ধের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। পাল্টে গেছে প্রচ্ছদগুলিও।
বইটি উৎসর্গ করেছিলাম প্রিয় কবি জয় গোস্বামীকে। বইটির প্রথম সংস্করণের সমালোচনা লিখেছিলেন আর এক তরুণ কবি ও সম্পাদক ফারুক আহমেদ। কী লিখেছিলেন তিনি?

মোটকথা ১৭ টি নিবন্ধই ফারুকের হৃদয়ে দাগ কাটে তা বলাই বাহুল্য। এক মানবিক পৃথিবীর অনুসন্ধান তিনি দেখতে পান। নিজের জীবনের বেড়ে ওঠা, দারিদ্র্য পিষ্ট হয়েও জীবনের অনুরাগ ও স্বপ্নকে লালন করা, এবং সমাজের কাছে তথা রাষ্ট্রের কাছে হেরে না যাওয়া এক সংগ্রামী উত্থানই গদ্যগুলির মূল বৈশিষ্ট্য। ধর্মের ভেক সরিয়ে মানবিক চৈতন্যের পথে আহ্বান জানানোই গদ্য গুলির মূল দর্শন।

দুই

‘আত্মসংগ্রহ’ গদ্যের বইয়ের সঙ্গে ৩২ পৃষ্ঠার একটি কাব্য সংকলন ‘একটা সাপ আর কুয়াশার সংলাপ'(২০০৭)ও প্রকাশ করেছিলেন শঙ্খশুভ্র। কাব্যটির প্রচ্ছদে এঁকে ছিলেন বাসুদেব মণ্ডল। ১৯৯৮ থেকে ২০০৬ সময়কালে কবিতাগুলি লিখেছিলাম। কাব্যটি উৎসর্গ করেছিলাম শ্রীশঙ্করলাল রায়কে। উৎসর্গ পত্রে লিখেছিলাম: ‘যিনি দুঃখ আর বিষাদের মাঝখানে কবিতায় জীবন খুঁজতে শিখিয়েছিলেন, সেই চিরপ্রণম্য সাহিত্যিক শ্রীশঙ্করলাল রায়কে।’ সময় প্রবাহে নিজেকে একটা বিষণ্ন নদীর মতো মনে হয়েছিল। আর সেই বিষণ্ন নদীতে নিজেই নিজের ছায়ায় ঝুঁকেছিলাম। বকের মতন নিজেকেই ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছিলাম নিজেরই কোনও উপলব্ধির মৎস্য। সমস্ত কবিতাগুলিই আত্মকেন্দ্রিক আত্মবিষণ্ন আত্মবিপর্যয়ের উপলব্ধিময় সাংকেতিক প্রকাশ। সাপ আসলে প্রবৃত্তি যা আদিম প্রহেলিকাময় আত্মস্ফুরণ। কুয়াশা যা অস্পষ্ট অপ্রকাশ্য জটিল সমাধানহীন এক আশ্রয়। কাব্যের নাম কবিতাটি একটা পত্রিকা এভাবেই প্রকাশ করেছিল।

প্রবৃত্তি সেই গার্হস্থ্য জীবন থেকেই তার বিস্তার ঘটায়। এর থেকে আমরা মুক্তি পাই না।🐎

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *