অমীমাংসিত – অসীম পাল

Ashim Chandra paul

ইংরাজী ভাষায় নিজের নাম লিখুন ।

 14 total views

সুনির্মল চৌধুরী বয়সে অনেকটা বড় অনিমেষ বাবুর থেকে। তবুও তাদের মধ্যে কর্মের খাতিরে ও একই এলাকার বাসিন্দা হিসেবে অান্তরিকতার সম্পর্ক দীর্ঘদিন থেকেই চলে অাসছে। কোনরকম চড়াই, উৎরাই তাদের সম্পর্ককে মলিন করতে পারেনি, বরং তাদের মধ্যকার বন্ধুত্বের সম্পর্কটিকে অারো মহিমান্বিত ও ত্বরান্বিত করেছে।

চারপুত্র অার এককন্যার বাবা সুনির্মল চৌধুরী। প্রায় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি লম্বা সৌম্যদর্শন মানুষটিকে দেখতে অনিন্দ্যর সবসময়ই খুব অানন্দ লাগতো। অনিন্দ্যর কেবলি মনে হত সে বড় হয়ে তার সুনির্মল জেঠোর মত পরিপাটি ও অাদর্শ একজন মানুষ হবে।

বর্ষার সময় তিনি নিজের বাড়ির সামনে থেকে ছোট একটি লম্বাটে ধরনের হাতে চালিত নৌকা দিয়ে অাসতেন। বর্ষায় যেদিকে দুচোখ যায় শুধু পানি অার পানি। এই অজস্র জলরাশির মধ্যে খুব অলৌকিকভাবে প্রত্যেক গ্রামবাসীর বসতভিটাটুকু এখনও কোনক্রমে তাদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে।

অনিন্দ্য দেখল তাদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে অারো কয়েকজন লোক নিয়ে সুনির্মল জেঠো প্রায় তাদের ঘাটের কাছে চলে এসেছেন। অনিন্দ্য খুব তাড়াতাড়ি উচ্চঃস্বরে বাবা বাবা বলে তাদের বাড়ির দিকে ছুটল অনিমেষ বাবুকে ডেকে অানার জন্য।

অনিন্দ্য দেখতে পেল তার বাবা অনিমেষ বাবু একেবারে তৈরী হয়ে প্রায় নৌকার ঘাটের কাছে চলে এসেছেন। বাড়ির ঘাট পাথর দিয়ে বাঁধানো। প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য ঢেউ ঔই বাঁধানো ঘাটের সুবিন্যস্ত পাথরের উপর অাছড়ে পড়ছে। অনিমেষ বাবু খুব সাবধানতার সাথে নৌকায় উঠে বসলেন। নৌকা ছেড়ে দিল।

অনিন্দ্য তখন শুনতে পেল, সুনির্মল চৌধুরী তার বাবাকে কিছুটা শাসনের সুরে বললেন,তোমাকে অার একটি দিনও সময়মত তৈরী হয়ে নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে দেখলাম না,বদ অভ্যেসটা তোমার কবে যে ঠিক হবে? তোমার জন্য অামাদের প্রতিদিনই অফিসে যেতে দেরী হয়ে যায়।

এই যে সুনির্মল জেঠোর মিষ্টি শাসনের সুরে কথা বলা- এই ব্যাপারটি মাঝেমধ্যেই অনিন্দ্যর কিশোর মনে কৌতুহলের উদ্রেক করত যে তাদের মধ্যকার বোঝাপড়াটা না জানি কতই অান্তরিকতার!

ছোট নৌকাটি তাদেরকে নিয়ে বেশ গতিতেই এগিয়ে চলছিল। বাড়ির ঘাট থেকে সামান্য দূরে যেখানটিতে অনিমেষ বাবুর বাবার মূর্তিশিলা, নৌকাটি তার থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়ে অাখড়ার দিকে এগোতে লাগল।

ছোট নৌকা যখন হিজল-করচের গাছের দিকে এগোচ্ছিল তখন ছোট ছোট কচ্ছপের বাচ্চাগুলো তাদের জীবনকে নিরাপদ রাখার প্রত্যয় নিয়ে গাছ থেকে লাফিয়ে পড়তে অারম্ভ করে । পশুপাখিও তাহলে মানুষকে ভয় করে। তাদের নৌকা থেকে খানিকটা দূরে একটি ঢোড়া সাপ মানুষের অস্তিত্ব অনুধাবন করে তাড়াতাড়ি তার গতিপথ পরিবর্তন করে এগোতে লাগল।

অনিন্দ্য দেখল তাদের নৌকাটি অাখড়ার কাছাকাছি পৌঁছার সাথে সাথেই কোথায় যেন একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল। অাখড়া থেকে সামান্য দূরে গিয়ে নৌকাটি রবিদের বাড়ির সামনের দিক দিয়ে গিয়ে একেবারে নদীর মাঝামাঝি গিয়ে পড়ল। এখানটায় স্রোতের বেগ বেশী হওয়ায় মাঝি সবাইকে একটু সাবধানে বসার কড়া নোটিশ দিল।

বর্ষাকালে নদীর যৌবন অাসে। শীতকালে যে জায়গাটুকু হেঁটে পার হওয়া যায়,এই বর্ষায় তার প্রলয়ংকরী রুপ দেখে কোনভাবেই তাকে তার পূর্বের রূপের সাথে মেলানো যায় না। বর্তমানে যে জায়গাটুকু দিয়ে নৌকা এগিয়ে চলছে সেখানে এলে প্রতিবারই যেন মনটা অজানা এক অাশংকায় অাঁতকে উঠে।

এখানে এসেই সুনির্মল বাবু নৌকার মাঝি রবিউলকে বললেন, রবিউল তুমি সাবধানে নদীর পাড় ঘেঁষে অাস্তে অাস্তে এগিয়ে চল। রবিউল উনার কথামত এগিয়ে চলল।

কিছু দূর এগোনোর পর সোজা উত্তরদিকে সুনির্মল বাবু দেখতে পেলেন শ্মশানের উপর টাঙানো লাল চিকন কাপড়টা মৃদু বাতাসেই বেশ গতিতে এদিক ওদিক ঘোরপাক খাচ্ছে।
নৌকার কেউই সেদিকে তাকালেন না কারন দিনের বেলায়ও কেউ পারতপক্ষে সেদিকে যাওয়ার সাহস করে না।

বীরেন্দ্রনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের নদী দিয়ে একসাথে পনের মিনিট চলার পর ভবের বাজার নামক একটি বাজারের ঘাটে গিয়ে তাদের নৌকা থামল।
নৌকা থেকে নেমে সুনির্মল অার অনিমেষ বাবু হাঁটতে শুরু করলেন। দুজনের হাতেই পুরনো তিন ব্যাটারির বড় টর্চলাইট।
ভবের বাজার সপ্তাহে দুদিন খুব জমজমাট থাকে। শুক্রবার অার সোমবার। এই দুইদিন এই এলাকার মানুষজন চুল কাটা থেকে অারম্ভ করে কেরোসিন তেল পর্যন্ত সবকিছুই এক সপ্তাহের জন্যে যার যার সাধ্যমত কিনে নিয়ে যান।

অাজ বাজারের রাস্তা-ঘাট একেবারেই নীরব। মাঝে মাঝে দু’একটি দোকান খোলা অাছে। ভবের বাজার থেকে তারা চা খেয়ে চুনাপাথরের উপর দিয়ে একসাথে দুজন চলতে অারম্ভ করলেন। বড় বড় পাথরের উপর দিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটা যায় না। কেবলই পা পিছন দিকে টানে।

কিছু দূর হাঁটার পর হাতের ডান পাশে একটি বড় খালের মত চোখে পড়ে। এদিকে মানুষকে কোন সময়ই খুব একটা যাতায়াত করতে দেখা যায় না।
হঠাৎ সুনির্মল বাবু খেয়াল করলেন অনিমেষ বাবু অনেক পিছনে পড়ে অাছেন এবং কার সাথে যেন অালাপ করছেন।
তিনি একটু উচ্চস্বরে অনিমেষ বাবুকে ডাকলেন। তিনি একা একা হাঁটতে হাঁটতে অানমনে অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছিলেন।

সুনির্মল বাবু বয়সে বড় হলেও কিছুটা ভীতু স্বভাবের ছিলেন। তিনি একা একা যে জায়গায় এসে পড়েছিলেন যেখানে সচরাচর মানুষ উপরের রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতো না। অার ঠিক ভরদুপুরে একাকী এই জায়গায় এসে একটি অলিখিত ভয় তাকে কেমন যেন ভাবিয়ে তুলল।

তিনি পকেট থেকে দিয়াশলাই বের করে একটি সিগারেট ধরালেন। অনিমেষ বাবু এখনো উনার কাছ থেকে অনেকটা দূরে রয়েছেন। এখানে একা একা কিছু সময় অতিবাহিত করে সুনির্মল বাবুর কেমন যেন একটু অস্বস্তি হচ্ছিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অনিমেষ বাবু এসে হাজির। অাসার সাথে সাথে সুনির্মল বাবু অনিমেষ বাবুকে একটু অভিমানের স্বরে বললেন, তোমাকে কতদিন না বলছি অামার সাথে সাথে অাসার জন্য, কিন্তু তুমি কেন সবসময় পিছনে পড়ে থাক?

অনিমেষ বাবু তাঁর কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে বললেন, দাদা অারেকটি সিগারেট ধরাও। তারপর সিগারট টানতে টানতে খুব তাড়াতাড়িই অামাদের কর্মস্থলে পৌঁছে যাব। এই কথা শুনে সুনির্মল বাবু একটু ধাতস্থ হলেন এবং একসাথে চুনাপাথরের প্রকল্পের দিকে এগোতে থাকলেন।

সুনির্মল এবং অনিমেষ দুজনেই এভাবে প্রতিদিন একসাথে এসে ডিউটি শেষ করে অাবার একসাথে দুজন বাড়িতে ফিরতেন। এরকমটি অনেক বছর ধরেই চলে অাসছিল।

ছয়মাস পরের কথা-

তখন ছিল শীতকাল। সুনির্মল বাবু তার ডিউটি শেষ করে অনেক সময় ধরে অনিমেষ বাবুর জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। রাত বেশী হয়ে যাওয়ার কারনে তিনি অার একা একা এতটা পথ যাওয়ার সাহস করেননি। তাছাড়া যত দেরীই হোক না কেন একজন অারেকজনকে ফেলে খুব কমই একা একা বাড়ী ফিরেছেন এমনটা বিশ বছরের চাকুরী জীবনে ঠিক কতবার ঘটেছে তা হিসেবে করে বের করা খুব কঠিন ব্যাপার হবে।

অনিমেষ বাবু রাত বারোটা বাজার কিছু অাগে ডিউটি শেষ করে অাসলেন। সুনির্মল বাবু তখনও একা একা অনিমেষ বাবুর জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। তারপর দুজন মিলে অাবারো বাড়ির উদ্দেশ্য হাঁটা অারম্ভ করলেন।

সেদিন ছিল ভরা পূর্ণিমা। টর্চের অালো ছাড়াই কেমন যেন একটি স্বর্গীয় দ্যুতি চারদিকে ছড়াচ্ছিল। চারদিকটা যেন মায়াবী কোন একটা অাবহে অাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। অনিমেষ বাবু সুনির্মল বাবুকে বললেন চল দাদা অাজ অামরা এই রাতে বাড়ি না ফিরে অন্য কোথাও হারিয়ে যাই। সুনির্মল বাবু মনে মনে খুব ভয় পাচ্ছিলেন অার রাত একটার সময় অনিমেষের এমন হেঁয়ালি শুনে তিনি অনেকটা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন এই ভেবে যে, তার অাবার কিছু হল না তো?

সুনির্মল বাবু অনিমেষ বাবুর পেছন পেছন হাঁটছিলেন। রাস্তা একেবারে নিস্তব্ধ। গাছ থেকে একটি পাতা ঝরার শব্দও যেন বুকের ভেতরটা অজানা, অদেখা কোন কিছুর উপস্থিতি টের পেয়ে অাঁতকে উঠে।
রাতের বেলা এত উজ্জ্বল চাঁদের অালো তাদের দুজনকে ক্রমান্বয়ে ভাবিয়ে তুলছিল। হঠাৎ করে অাবার মেঘ জমাট বাঁধলে যেরকম অন্ধকার হয়ে যায় সেরকম নিকষ কালো অন্ধকার অাবার চারদিককে কেমন যেন গিলে খাচ্ছিল। কি যে একটি মায়াবী ভীতিকর পরিবেশ তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

হাঁটতে হাঁটতে তারা দুজনেই শিমুলতলী নামক একটি জায়গায় এসে পৌঁছলেন। এই জায়গাটার উপর দিয়ে রেললাইনের মত সোজা রাস্তা অনেক দূর পর্যন্ত চলে গিয়েছে অার নিচ দিয়ে পায়ে হাঁটার রাস্তা।
মানুষ সবসময়ই উপর দিকটা এড়িয়ে চলে। শিমুলগাছের ডানদিকে একটু ডোবার মতন করে গভীর একটি বড় নালা অাছে যা শুকনার সময়েও ঐই নালাতে বাঁধ দেওয়া থাকে। বাঁধ দেওয়া খালে মাঝে মাঝে দুজন জেলেকে অসময়ে মাছ ধরতে দেখা যায়।

এই জায়গায় অাসার সাথে সাথেই সুনির্মল বাবু দেখলেন হঠাৎ করে অনিমেষ বাবু একা একা তাকে ফেলে রেখে কোন একটি জিনিসের পিছনে দৌঁড়াচ্ছেন।
অনিমেষ বাবু তার কোন কথা না শুনে কেবল এদিক ওদিক দৌঁড়াচ্ছেন। একা একা সুনির্মল বাবু খুব ভয় পাচ্ছিলেন। এই গভীর রাতে এরকম একটি জনমানবহীন রাস্তায় তার সঙ্গীর বিনা কারনে কোনকিছুর প্রতি ছোটাছুটি তাকে একেবারে ঘামিয়ে তুলছিল। তিনি একা একা এই জায়গায় তাকে বারবার ডাকার পরও অনিমেষের এলোমেলো ছুটে চলা তাকে অারও অসহায় করে তুলছিল।

এদিকে অনিমেষ বাবু দেখলেন একটি অপূর্ব সুন্দর খরগোশের বাচ্চা তার পায়ের কাছ দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। অনিমেষবাবু যতই চেষ্টা করছেন খরগোশটিকে ধরতে, ততই খরগোশের বাচ্চাটি একবার ডানে অাবার বামে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছিল। অনিমেষ বাবু যখন বামে যান তখন বাচ্চাটি ডানদিকে দৌড়ে পালিয়ে যায় অাবার তিনি যখন ডানে যান বাচ্চাটিকে ধরার জন্যে, তখন সেটি বামে পালিয়ে যায়। এভাবে অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পর অনিমেষ বাবু খেয়াল করলেন খরগোশের বাচ্চাটি তাকে সুনির্মল বাবুর কাছ থেকে কৌশলে অনেক দূরে পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছে।

হঠাৎ করে অনিমেষ বাবু সম্বিত ফিরে পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে কোন একটি মায়ার পিছনে তিনি দৌড়াচ্ছেন। খরগোশের বাচ্চাটি যে দিকে যেতে চাইছিল অনিমেষ বাবু তাকে সেদিকে যেতে বাঁধা প্রদান করছিলেন। এভাবে অনেক সময় নষ্ট করে অনিমেষ বাবু সুনির্মল বাবুর কাছে ফিরে অাসলেন। তিনি এসে দেখেন সুনির্মল বাবু সেই একই জায়গায় ভয়ার্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে অাছেন তখনও।

খরগোশের বাচ্চাটি শেষ পর্যন্ত বামে যেতে চাইলেও অনিমেষ বাবুর বাঁধার কারণে ডানদিকের বাঁধের উপর দিয়ে হঠাৎ করে কোথাও যেন অদৃশ্য হয়ে যায়।

অনেকক্ষণ এভাবে এলোপাতাড়ি ছুটাছুটি করে অনিমেষ বাবু খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি তখন বিষয়টি নিয়ে সুনির্মল বাবুর সাথে খোলামেলা অালাপ করতে চাইলে ও সুনির্মল বাবু তাকে খানিকটা ভয় ও অভিমান করে সে অালাপটি তখন অার চালিয়ে যেতে চাইছিলেন না।

রাত তখন প্রায় অাড়াইটার কাছাকাছি। দুজনের মুখেই দুটি জ্বলন্ত সিগারেট অার হাতে তিন ব্যাটারির টর্চ লাইট সম্বল করে দুজন নিশ্চুপ হয়ে পাশাপাশি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কারো মুখে তখন কোন কথা হচ্ছিল না শুধু নীরবে পথ চলা ব্যতীত।

এখন তারা তাদের গতিপথ পরিবর্তন করলেন। সোজা রাস্তা দিয়ে গেলে তারা অার তখন নদী পার হতে পারবেন না। কারণ এই ঘাটে এত রাতে তারা অার মাঝি পাবেন না। তাই তাদেরকে এত ভয়ের মধ্যে ও হাওরের মধ্য দিয়ে অাবারও বিপদসংকুল রাস্তাদিয়ে এগিয়ে চলতে লাগলেন।

অনিমেষ বাবু খুব সাহসী হলেও এখন মনে মনে অাগের ঘটনা মনে করে অনেক অস্বস্তি বোধ করছিলেন অার ভিতরে ভিতরে ঘামছিলেন।

কিছু দূর এগোনোর পর তারা শ্মশানের কাছাকাছি এসে পড়লেন। ধীরে ধীরে ভয়টা অারে ঘনীভূত হচ্ছিল। শ্মশান থেকে মৃতের অাত্মা এসে যদি তাদের দুজনের মূল্যবান প্রাণটা কেড়ে নেয় তাহলে এত রাতে কেউ তাদের বাঁচানোর জন্য অাসবেনা এটা মনে করে তারা ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে নিরুপায় হয়ে এই জায়গাটি অতিক্রম করার জন্য তাদের হাঁটার গতি অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।

বাড়ির ঘাটে মাঝিকে তারা বারবার ডেকে ও কোন প্রতুত্তর না পেয়ে অাবার তারা জমশেদপুরের ফেরীর উদ্দেশ্য ছুটতে অারম্ভ করলেন। ঘাটে গিয়ে মাঝির নাম ধরে অনেক ডাকাডাকির পর হঠাৎ যেন তারা একটি প্রতিধ্বনি শুনতে পেলেন যে,অাপনারা অপেক্ষা করুন অামি নৌকা নিয়ে অাসছি।

অনেকক্ষণ পর অনিমেষ বাবুর মনে হল যেন তৃষ্ণায় তার বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে, একটু খাবার পানি পেলে খুব
ভালো হতো, তার প্রাণটা বেঁচে যেত। নদী পার হয়ে অনিমেষ বাবু সুনির্মল বাবুকে তার বাড়ির দিকে খানিকটা এগিয়ে দিয়ে বাড়িতে এসে কাউকে কিছু না বলে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।

পরদিন অনিমেষ বাবুর অফিস ছিল না। সকাল বেলা সবার চিৎকার চেঁচামেচিতে তার ঘুম ভাঙল। তিনি ঘুম থেকে উঠে বাহিরে বের হয়ে দেখলেন একদল লোক হরিনাম কীর্তন করে একটি শবদেহ নিয়ে তাদের বাড়ির উত্তর দিকে নদীর অপর পাড়ের শ্মশানের দিকে এগিয়ে চলছে।

তার বড় ভাই তাকে এসে জানালেন সবাই সুনির্মল বাবুকে নিয়ে শ্মশানের দিকে যাচ্ছে। অাজ নাকি সকালে কোন এক সময় হঠাৎ করে মৃত্যুবরণ করেছেন।

অনিমেষ বাবু গত রাতের ঘটনা অার কাউকে না বলে গলায় একটি গামছা পেঁচিয়ে সবার পেছন পেছন হাঁটছেন অার তার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছিল বন্ধুসম মানুষটিকে হারিয়ে।

০৯/০৩/২০২১ ইং।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *